সুবল বড়ুয়া, চট্টগ্রাম
প্রকাশ : ০২ এপ্রিল ২০২৩ ১০:৫৫ এএম
আপডেট : ০২ এপ্রিল ২০২৩ ১০:৫৭ এএম
বছরের প্রথম বর্ষণেই শনিবার পানি থইথই করে চট্টগ্রামের নিম্নাঞ্চলে। ভোর থেকে দিনভর থেমে থেমে বৃষ্টিপাতের কারণে নগরীর প্রধান প্রধান সড়ক ও গলিতে হাঁটুপানি জমে। প্রবা ফটো
বছরের প্রথম বর্ষণেই গতকাল শনিবার পানি থই থই করেছে বন্দরনগর চট্টগ্রামের নিম্নাঞ্চলে। এই বর্ষণ মহানগরবাসীকে ফের মনে করিয়ে দিয়েছে, জলাবদ্ধতার দুর্ভোগই বোধ হয় তাদের ললাটলিখন।
চট্টগ্রামের পতেঙ্গা আবহাওয়া অধিদপ্তরের কার্যালয় থেকে জানা গেছে, গতকাল সন্ধ্যা ৬টার আগে ২৪ ঘণ্টায় চট্টগ্রামে বৃষ্টিপাত হয়েছে মাত্র ৩৩ মিলিমিটার। তবে মুষলধারে বৃষ্টি হয়েছে ভোরে। এতেই দেখা দেয় জলাবদ্ধতা। পশ্চিমা লঘুচাপের প্রভাবে আজ রবিবারও বৃষ্টিপাত হতে পারে বলে জানিয়েছেন পতেঙ্গা আবহাওয়া অফিসের পূর্বাভাস কর্মকর্তা মেঘনাদ তঞ্চঙ্গ্যা।
গতকাল শনিবার ভোর থেকে থেমে থেমে দিনভর বৃষ্টিপাতের কারণে চট্টগ্রাম মহানগরীর প্রধান প্রধান সড়ক ও গলিতে হাঁটুপানি জমে। এ ছাড়া মহানগরীর বহদ্দারহাট, বাদুরতলা, ২ নম্বর গেট, মুরাদপুর, জিইসি, ফরিদার পাড়া, চকবাজার, কাপাসগোলা, ষোলশহর, মোগলটুলী, আগ্রাবাদ, ট্রাংক রোড, বাকলিয়া ডিসি রোড, তালতলা, চান্দগাঁও, খতিবের হাট, সিঅ্যান্ডবি কলোনি, চাকতাই, খাতুনগঞ্জ, নাসিরাবাদ হাউজিং সোসাইটি, ঈদগাঁও, কাতালগঞ্জ, শুলকবহর, হালিশহর এলাকাসহ বিভিন্ন এলাকায় দেখা দেয় জলাবদ্ধতা। এতে চরম দুর্ভোগে পড়েন পথচারীরা।
তবে এবার জলাবদ্ধতা হয়নি আগ্রাবাদের মা ও শিশু হাসপাতালে। প্রতিবছর নিয়মিতভাবে এই হাসপাতালের নিচতলায় জলাবদ্ধতা দেখা দিত। বেশ কয়েক বছর পর এবার গতকাল এ হাসপাতালে জলাবদ্ধতা দেখা দেয়নি। মহেশখাল সংস্কারের সুফল পেয়েছে হাসপাতালটি।
এদিকে চট্টগ্রাম সিটি করপোরেশনের মেয়র রেজাউল করিম চৌধুরী চট্টগ্রাম উন্নয়ন কর্তৃপক্ষকে (চউক) জলাবদ্ধতা নিরসন প্রকল্পের কাজ দ্রুত শেষ করতে এবং বিভিন্ন খালের ওপর দেওয়া বাঁধ অপসারণের জন্য তাগাদা দিয়েছেন। গত ২২ মার্চ চট্টগ্রাম সিটি করপোরেশনের সাধারণ সভায়ও বিষয়টি আলোচিত হয়। এরপরও চউক গুরুত্ব না দেওয়ায় মৌসুমের প্রথম বৃষ্টিতেই জলাবদ্ধতা দেখা দিয়েছে চট্টগ্রামে।
বছরের প্রথম বর্ষণে জলাবদ্ধতা সৃষ্টি হওয়ায় ক্ষুব্ধ প্রতিক্রিয়া জানিয়েছেন মেয়র রেজাউল করিম চৌধুরী। তিনি বলেন, ‘চসিকের সমন্বয় সভা থেকে চউক বা সিডিএকে একাধিকবার অনুরোধ জানানো হয়েছে। কিন্তু খালের বাঁধ অপসারণ করা হয়নি। তাই জলাবদ্ধতায় নাগরিক দুর্ভোগ বেড়েছে। রবিবার (আজ) অফিসে গিয়ে বাঁধ অপসারণ করতে চউককে আরেক দফা চিঠি দেব।’
তিনি বলেন, ‘জলাবদ্ধতা নিরসন প্রকল্পটি চউক বাস্তবায়ন করছে। এখানে চসিকের তেমন কিছু করার নেই। আমি চউককে দুই-তিন মাস আগে থেকে খালের ওপর দেওয়া বাঁধগুলো অপসারণ করতে বলেছি। কিন্তু কর্তৃপক্ষ তা গুরুত্ব দেয়নি। তাই এখন মৌসুমের প্রথম বৃষ্টিতেই জলাবদ্ধতা দেখা দিয়েছে। যেসব খালে বাঁধ রয়েছে চউককে তা দ্রুত অপসারণ করতে হবে। খালের ভেতর দিয়ে পানি চলাচলের সুবিধার্থে খালের ওপর স্তূপীকৃত মাটি দ্রুত অপসারণের তাগিদ দেন তিনি। এ প্রসঙ্গে জলাবদ্ধতা নিরসন প্রকল্পের পরিচালক ও সিডিএর প্রকৌশলী আহমদ মঈনুদ্দীনের বক্তব্য পাওয়া যায়নি।
বাদুরতলা এলাকার বাসিন্দা মিনহাজুল ইসলাম এ প্রসঙ্গে বলেন, বাদুরতলার অলিগলি ছাড়িয়ে পানি এবার প্রধান সড়কেও উঠে পড়েছে। হাঁটুপানি সেখানে। অলিগলিতে পানি উঠেছে হাঁটুর ওপর। নিচতলার বাসাবাড়িতে পানি ঢুকে পড়ায় চরম দুর্ভোগ দেখা দিয়েছে। এখনও বর্ষাকাল শুরু হয়নি; একটু বৃষ্টিতেই এই দুরবস্থা। বৃষ্টি বেশি হলে না জানি কী অবস্থা হবে!
চকবাজার ওয়ার্ডের কাউন্সিলর নুর মোস্তফা টিনু বলেন, ‘সামান্য বৃষ্টিতেই চকবাজারের বিভিন্ন অংশে পানি ওঠে। পরে খাল-নালা কিছুটা পরিষ্কার করে দেওয়ার পর পানি কিছুটা কমে। বৃষ্টি বেশি হলে কী অবস্থা হবে, সেটাই এখন চিন্তার বিষয়। মূলত চাকতাই ও হিজরা খালে সিডিএর জলাবদ্ধতা প্রকল্পকাজের জন্য বাঁধ দেওয়ায় পানি চলাচলে সমস্যা হচ্ছে। বৃষ্টি হলেই জলাবদ্ধতা হচ্ছে।
বাকলিয়া ডিসি রোড এলাকার বাসিন্দা নাছির উদ্দিন বললেন, ‘সিডিএ তিন-চার বছর ধরে নালা ও খালে সংস্কারকাজ করছে। এখনও শেষ করেনি। বর্ষায় এলাকাবাসীর কষ্ট চরমে ওঠে। নিচতলার প্রায় সবার বাড়িঘরে এখন পানি ঢুকেছে। পুরো বাকলিয়া এলাকা পানিতে থই থই অবস্থা। জোয়ারে পানি বাড়ে। আমার মনে হচ্ছে চউকের জলাবদ্ধতা নির্মাণ প্রকল্পটি পরিকল্পনা অনুযায়ী হচ্ছে না। এত বছর কাজ করেও কোনো সুফল না আসা দুঃখজনক।’
বর্তমানে চট্টগ্রাম মহানগরীর জলাবদ্ধতা নিরসনে তিনটি সংস্থা ১০ হাজার কোটি টাকা ব্যয়ে চারটি প্রকল্প ছয় বছরের বেশি সময় ধরে বাস্তবায়ন করছে। এর মধ্যে সাড়ে সাত হাজার কোটি টাকায় চউক বা সিডিএ দুইটি এবং ১ হাজার ৬২০ কোটি টাকা ব্যয়ে পানি উন্নয়ন বোর্ড একটি ও প্রায় এক হাজার কোটি টাকা ব্যয়ে চসিক আরেকটি প্রকল্পের কার্যক্রম পরিচালনা করছে। এরপরও চট্টগ্রাম মহানগরীর জলাবদ্ধতার সমস্যা কাটেনি; আদৌ হবে কি না, তা নিয়েও অনেকের সংশয় রয়েছে।