বাগেরহাট প্রতিবেদক
প্রকাশ : ২৮ মার্চ ২০২৩ ২১:০২ পিএম
আপডেট : ২৮ মার্চ ২০২৩ ২১:৫২ পিএম
বাগেরহাটের রামপালে ব্যাটারিচালিত ইজিবাইক চুরির অপবাদে শেখ আব্দুল্লাহ নামে এক যুবককে প্রায় ২২ ঘণ্টা আটকে রেখে নির্যাতন করা হয়েছে। প্রবা ফটো
বাগেরহাটের রামপালে ব্যাটারিচালিত ইজিবাইক চুরির অপবাদে শেখ আব্দুল্লাহ নামে এক যুবককে প্রায় ২২ ঘণ্টা আটকে রেখে নির্যাতন করা হয়েছে। নির্যাতনের সেই ভিডিও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে এরই মধ্যে ভাইরাল হয়েছে।
ভাইরাল হওয়া ২ মিনিট ৪৭ সেকেন্ডের ভিডিওতে দেখা যায়, একটি ঘরের পেছনে আম গাছের সঙ্গে বেঁধে এক যুবককে মারধর করছেন কয়েকজন যুবক। এমনকি স্থানীয় বাইনতলা ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান ফকির আব্দুল্লাহর সামনে ওই যুবকের চোখ তুলে ফেলারও হুমকি দেওয়া হয়। পরে সাদা কাগজে স্বাক্ষর রেখে নির্যাতনের বিষয়টি কাউকে না জানানোর শর্তে ছেড়ে দেওয়া হয় আব্দুল্লাকে। ঘটনাটি ঘটেছে রামপাল উপজেলার ব্রি-চাকশ্রি এলাকায়।
জানা যায়, বৃহস্পতিবার (২৩ মার্চ) দুপুরে রামপাল উপজেলার চাকশ্রি এলাকা থেকে শেখ আব্দুল্লাহকে তুলে নিয়ে যায় শেখ হাসান আলী ও ইউপি চেয়ারম্যান ফকির আব্দুল্লাহর ভাগিনা আবু সালেহসহ কয়েকজন। চুরির অপবাদে প্রায় ২২ ঘণ্টা নির্যাতনের পরে শুক্রবার দুপুর ১২টার দিকে ছেড়ে দেওয়া হয় আব্দুল্লাহকে।
এদিকে ঘটনার পর চার দিন পার হলেও এখনও মামলা হয়নি। তবে নির্যাতনের ভিডিও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ভাইরাল হওয়ায় নড়েচড়ে বসেছে প্রশাসন। ঘটনার তদন্ত শুরু হয়েছে বলে জানিয়েছেন পুলিশ সুপার কেএম আরিফুল হক।
নির্যাতনের শিকার আব্দুল্লাহ বাগেরহাট সদর উপজেলার মুনিগঞ্জ এলাকার শেখ গফুরের ছেলে। তিনি বর্তমানে বাগেরহাট জেলা হাসপাতালে চিকিৎসাধীন রয়েছেন।

নির্যাতনের শিকার আব্দুল্লাহ বলেন, ‘পূর্ব পরিচিত হওয়ায় ব্রি-চাকশ্রি এলাকার শেখ হাসান আলীকে আমি ১ লাখ ২৭ হাজার টাকা ধার দিয়েছিলাম। কিন্তু তিনি আমাকে টাকা ফেরত দিচ্ছেন না। পরে পাওনা টাকার পরিবর্তে হাসান আলী তার মালিকানাধীন ইজিবাইকটি আমার কাছে বিক্রি করে দেন। প্রতিদিন আমাকে ২০০ টাকা জমা দিয়ে ভাড়ায় সে ইজিবাইকটি চালাতে থাকে। কিন্তু কয়েকদিন টাকা দেওয়ার পরে আর টাকা দেয় না। তাই জানুয়ারি মাসের মাঝামাঝি সময়ে আমি ইজিবাইক নিয়ে বিক্রি করে দিই।
কিন্তু হঠাৎ করে গত বৃহস্পতিবার দুপুরে রামপাল থেকে বাগেরহাট আসার পথে হাসান আলী ও চেয়ারম্যানের ভাগিনা আবু সালেহসহ কয়েকজন আমাকে ধরে নিয়ে যায়। হাসান আলী বাড়িতে নিয়ে আমাকে নির্যাতন করে। সন্ধ্যার দিকে আমার বন্ধু প্রাইভেট কারচালক আল-আমিনকে ব্রি-চাকশ্রি আসার জন্য আমাকে দিয়ে ফোন করায়। পরে আল-আমিন গেলে তাকেও আটকে রাখে। সারা রাত আমাকে নির্যাতন করেছে আবুল সালেহ ও হাসানসহ কয়েকজন। বেধড়ক মারপিটের সঙ্গে শরীরে সিগারেটের সেঁকা ও আঙুলে খেজুরের কাটা ঢুকিয়ে দিয়েছে। চোখ উঠিয়ে ফেলার কথা বলেছে। পরে সাদা কাগজে আমার এবং আমার মায়ের স্বাক্ষর রেখে এবং ৩ লাখ টাকা দেওয়ার স্বীকারোক্তি রেখে ছেড়ে দেয়। আমার ওপর হামলাকারীদের কঠিন বিচার চাই।’
শেখ আব্দুল্লাহর মা খালেদা বেগম বলেন, ‘আমার ছেলেকে যেভাবে নির্যাতন করেছে, তা মানুষে করে না। চেয়ারম্যানের কাছে গিয়েও কোনো প্রতিকার পাইনি। আমি আমার ছেলেকে নির্যাতনের বিচার চাই।’
প্রত্যক্ষদর্শী শেখ আব্দুল্লাহর বন্ধু আল-আমিন বলেন, ‘আব্দুল্লাহর ফোন পেয়ে চাকশ্রি বাজারে গেলে হাসান ও আবু সালেহ আমাকেও আটকে রাখে। সারা রাত আব্দুল্লাহকে নির্যাতন করেছে। শুক্রবার দুপুরে আমাদের ছেড়ে দেয়।’
এদিকে অভিযোগ অস্বীকার করে ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান ফকির আব্দুল্লাহ বলেন, ‘তার সামনে কোনো নির্যাতন হয়নি। আবু সালেহ তার ভাগিনা নয়।’
বাগেরহাট জেলা হাসপাতালের তত্ত্বাবধায়ক ডা. অসীম কুমার সমাদ্ধার বলেন, ’আব্দুল্লাহর শরীরের বিভিন্ন স্থানে জখম রয়েছে। জখম গুরুতর কি-না, সে বিষয়ে পরীক্ষা-নিরীক্ষার পর জানা যাবে।’
পুলিশ সুপার কেএম আরিফুল হক বলেন, ‘নির্যাতনের ভিডিওটি আমরা দেখেছি। বিষয়টি তদন্ত চলছে। অপরাধীদের শনাক্ত করে আইনি ব্যবস্থা নেওয়া হবে।’