× ই-পেপার প্রচ্ছদ সর্বশেষ বাংলাদেশ রাজনীতি দেশজুড়ে বিশ্বজুড়ে বাণিজ্য খেলা বিনোদন মতামত চাকরি শিক্ষা আজকের কার্টুন ফিচার সকল বিভাগ ছবি ভিডিও লেখক আর্কাইভ কনভার্টার

সৈনিকের চাকরি ছেড়ে যুদ্ধে যান টাইগার লোকমান

আসাদ জামান, মানিকগঞ্জ

প্রকাশ : ২২ মার্চ ২০২৩ ১৫:১৫ পিএম

আপডেট : ২২ মার্চ ২০২৩ ১৮:০৬ পিএম

লোকমান হোসেন।

লোকমান হোসেন।

মানিকগঞ্জের ঘিওর উপজেলার আশাপুর গ্রামের বাসিন্দা লোকমান হোসেন। সবার কাছে তিনি টাইগার লোকমান নামেই পরিচিত। মুক্তিযুদ্ধের সময় অসীম সাহসিকতার জন্যই সহযোদ্ধারা তাকে এই টাইগার উপাধি দিয়েছিলেন।

প্রতিদিনের বাংলাদেশের এই প্রতিবেদকের সঙ্গে টাইগার লোকমানের আলাপচারিতায় তিনি মুক্তিযুদ্ধে যাওয়ার পূর্ববর্তী ও পরবর্তী সময়ের স্মৃতিচারণ করেন।

মুক্তিযুদ্ধের আগেই মেট্রিক পাস করেন লোকমান হোসেন। মেট্রিক পাসের পর জীবনের প্রথম ঢাকায় বেড়াতে গিয়ে জানতে পারলেন সেনাবাহিনীতে সৈনিক পদে লোক নিচ্ছে। পরে সেখানে গিয়ে পরীক্ষা 

দিলে সেনাবাহিনীর সৈনিক পদে চাকরিটা তার হয়ে যায়। ১৯৬৫ সালে সেনাবাহিনীর সদস্য হয়ে পাকিস্তানের লাহোরে চলে যান তিনি।

১৯৭১ সালের ৭ মার্চ বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের ঐতিহাসিক ভাষণ শুনেই লোকমান হোসেন যুদ্ধে যাওয়ার প্রস্তুতি নেন। সে সময়ে পাকিস্তান সেনাবাহিনীর ইস্ট বেঙ্গল রেজিমেন্টের সৈনিকের চাকরি বাদ দিয়ে মুক্তিযুদ্ধে চলে যান। সব মিলিয়ে ছোটবড় ১২টি সম্মুখযুদ্ধে অংশ নেন তিনি। 

২৯ অক্টোবর মানিকগঞ্জের সিংগাইরের গোলাইডাঙ্গায় অনুষ্ঠিত বড় মুক্তিযুদ্ধের নেতৃত্ব দেন এই বীর মুক্তিযোদ্ধা। ওই যুদ্ধে ৮৩ পাকিস্তানি সেনার প্রায় অর্ধেকই নিহত হয়েছিল লোকমান হোসেনের ব্রাশ ফায়ারে।

জাতির এই সূর্যসন্তান বলেন, ‘আমার সঙ্গে যুদ্ধ করে কাদের নামে একটা ছেলে মারা যায়। তার কথা সব সময় আমার মনে পড়ে। যুদ্ধের সময় দোহার নবাবগঞ্জ থেকে নৌকাযোগে আসতে ছিলাম। সে সময় অনেক বৃষ্টি ছিল। একটা সেতুর নিচ দিয়ে আসতে হয়। ওই সেতুর ওপরে পাকিস্তানিদের টহল ছিল। তখন আমরা পাকিস্তানি বাহিনীর সামনে পড়ে যাই। তারা আমাদের লক্ষ্য করে গুলি করে। আমি ও নৌকার মাঝি পানিতে পড়ে যাই। একটু পরেই দেখি কাদের গুলি খেয়ে কাতরাচ্ছে।’ 

তিনি বলেন, “ওই সময় কাদের বলেছিল, ‘ওস্তাদ যুদ্ধ চালাইয়া যাও, যুদ্ধ বন্ধ কইরো না। আমি কাদের চলে গেলাম কিন্তু এদেশে হাজারো কাদের রয়ে গেল। দেশ এক দিন স্বাধীন হবে। দেশ স্বাধীন হলে ওস্তাদ তুমি আমার মাকে একটা সংবাদ দিও যে তোমার কাদের শহীদ হয়ে গেছে।’ কাদেরের কথা মনে পড়লে আজও শরীর শিউরে ওঠে। অনেক চেষ্টা করেও আমি কাদেরের মায়ের কাছে যেতে পারিনাই। কাদেরের মাকে আমি সংবাদটা দিতে পারিনি যে কাদের শহীদ হয়ে গেছে।”

এক প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, ‘দেশ স্বাধীন হওয়ার পর আমি আবার সেনাবাহিনীতে যোগ দিই। যোগদান করার পর দেখলাম আমার তিন-চার ব্যাচের জুনিয়ররা প্রমোশন পেয়ে সিনিয়র হয়ে গেছে। তখন আমি আমার ওপরের স্যারকে বললাম, স্যার তারাও যুদ্ধ করেছে আমিও যুদ্ধ করেছি, তাহলে আমাকে প্রমোশন দেন। আর আমাকে প্রমোশন না দিলে আমি চাকরি ছেড়ে দেব। আমি এমন বিপ্লবী কথা বলায় তারা আমাকে চাকরি থেকে বাদ দিয়ে দেন। এরপর থেকে আমার জীবনে অন্ধকার নেমে এলো।’

আমি মধ্যবিত্ত পরিবারের সন্তান ছিলাম, তাই আমার কাছে তেমন কোনো টাকা-পয়সা ছিল না। চাকরি চলে যাবার পর বন্ধুবান্ধবের সহায়তায় মানিকগঞ্জ শহরে অল্প টাকা দিয়ে বাসা ভাড়া করে থাকতাম। তখন আমি দুই মেয়ে ও এক ছেলের বাবা। কিছুদিন পর আমার একটা মেয়ে মারা যায়। তখন মেয়েকে দাফন করার জন্য কাফন কেনার টাকাও আমার কাছে ছিল না। পরে মানিকগঞ্জের সেওতা কবরস্থানে কিছু কাফনের কাপড় ও কলাপাতা দিয়ে আমার মেয়েকে দাফন করি। কিছুদিন যাওয়ার পর আমি শহর থেকে গ্রামে চলে গেলাম। তারপর গ্রামে যেয়ে কর্মজীবন শুরু করে দিলাম।

বীর মুক্তিযোদ্ধা টাইগার লোকমান আরও জানান, জীবনের তাগিদে যাত্রাদলে আমি ভিলেনের অভিনয় করেছি। এক বছর যাত্রাদলে ১ হাজার টাকার বিনিময়ে চাকরি করেছি। ভালো অভিনয়ের জন্য এক সময় ১১ হাজার টাকাও বেতন পেয়েছি। এ ছাড়া বর্ষাকালে ভাড়ায় ট্রলার চালিয়েছি। ট্রলার চালাতে চালাতে এক সময় একটা ট্রলার কিনলাম। ৯ টাকা গ্যালন তেল কিনে সারা দিন ট্রলার চালিয়ে এক দেড়শ টাকার মুখ দেখতাম। আস্তে আস্তে আমার অভাব দূর হতে থাকে। বর্তমানে শেখ হাসিনা সরকার প্রতিমাসে ২০ হাজার টাকা করে সম্মানী দিচ্ছেন। তা ছাড়া আমাকে সরকার একটি ঘরও করে দিয়েছেন। আমার ছেলে এখন সরকারি চাকরি করে। আল্লাহর রহমতে পরিবার-পরিজন নিয়ে অনেক ভালো আছি।

২০০৮ সাল থেকে লোকমান হোসেন তার নিজের শোবার ঘর সাজিয়েছেন জেলার বিভিন্ন মুক্তিযোদ্ধার ছবি দিয়ে। ওই ঘরে শোভা পাচ্ছে যুদ্ধের সময়কার ঐতিহাসিক নানা ছবি। তার সংগ্রহশালায় চার শতাধিক মুক্তিযোদ্ধার ছবি স্থান পেয়েছে। যাদের মধ্যে অনেকেই আজ জীবিত নেই।

এ প্রসঙ্গে বীর মুক্তিযোদ্ধা টাইগার লোকমান হোসেন জানান, মুক্তিযোদ্ধারা চিরকাল বেঁচে থাকবেন না। কিন্তু বাংলাদেশ থাকবে। এমন এক সময় আসবে যখন কোনো মুক্তিযোদ্ধাকে আর পাওয়া যাবে না। তখন নতুন প্রজন্ম এই সংগ্রহশালায় এসে বুঝতে পারবে কারা মুক্তিযোদ্ধা ছিলেন। তাদের চেহারাইবা কেমন ছিল। জানবে যুদ্ধের নানা ইতিহাসও।

শেয়ার করুন-

মন্তব্য করুন

Protidiner Bangladesh

সম্পাদক : মারুফ কামাল খান

প্রকাশক : কাউসার আহমেদ অপু

রংধনু কর্পোরেট, ক- ২৭১ (১০ম তলা) ব্লক-সি, প্রগতি সরণি, কুড়িল (বিশ্বরোড) ঢাকা -১২২৯

যোগাযোগ

প্রধান কার্যালয়: +৮৮০৯৬১১৬৭৭৬৯৬ । ই-মেইল: [email protected]

বিজ্ঞাপন (প্রিন্ট): +৮৮০৯৬১১৬৭৭৮১০, +৮৮০১৮৮০৭৪৪৫৮০ | ই-মেইল: [email protected]

বিজ্ঞাপন (অনলাইন): +৮৮০১৮৮০৭৪৪৫৮০, +৮৮০১৭৯৯৪৪৯৫৫৯ । ই-মেইল: [email protected]

সার্কুলেশন: +৮৮০৯৬১১৬৭৭৮০৭, +৮৮০১৮৮০৭৪৪৩৩২ । ই-মেইল: [email protected]

বিজ্ঞাপন মূল্য তালিকা