রংপুর অফিস
প্রকাশ : ১০ মার্চ ২০২৩ ১৭:১৩ পিএম
রংপুরের গঙ্গাচড়ার চরাঞ্চলে উৎপাদিত মিষ্টিকুমড়া রপ্তানির জন্য ছালাপাক বাজারে প্যাকেটজাত করা হচ্ছে। প্রবা ফটো
রংপুরের গঙ্গাচড়া উপজেলার চরাঞ্চলে উৎপাদিত মিষ্টিকুমড়া বিদেশে রপ্তানি করা হচ্ছে। এই ফসলগুলো সরাসরি কৃষকদের কাছ থেকে কেনায় ফড়িয়া ব্যবসায়ীদের এতদিনের ‘লাভের গুড়’ হাতছাড়া হয়েছে। এতে মিষ্টিকুমড়া আবাদে ৩-৪ গুণ বেশি লাভ করছেন বালুচরের কৃষকরা। ফসল উৎপাদনেও তাদের আগ্রহ বেড়েছে।
এতদিন কৃষক ন্যায্যমূল্য থেকে বঞ্চিত হতেন। কোনো কোনো মৌসুমে চাষের খরচও ওঠাতে পারতেন না তারা। বাজারের নিয়ন্ত্রণ ছিল মধ্যস্বত্বভোগীদের হাতে। এবার সরকারি সংস্থা বগুড়া পল্লী উন্নয়ন একাডেমি ও বেসরকারি উন্নয়ন সংস্থা সুইস কন্ট্যাক্টের যৌথ উদ্যোগে মার্কেট ফর চরস (এমফোরসি) প্রকল্পের আওতায় সিঙ্গাপুর-মালয়েশিয়াসহ দেশের বিভিন্ন জেলার পাইকারদের সঙ্গে কৃষকদের সরাসরি যোগাযোগ হয়েছে। গত নভেম্বর মাসে কুমড়া আবাদের শুরুতে এই যোগাযোগ হওয়ার কারণে উৎপাদন মৌসুমে ফসল বিক্রি করাও সহজ হয়েছে।
সরেজমিনে দেখা গেছে, গঙ্গাচড়া উপজেলার চর ছালাপাক, ইচলী, জয়রামওঝাসহ আশপাশের নদীর বুক ভরে গেছে মিষ্টিকুমড়া, ভুট্টা, গম, রসুন, পেঁয়াজসহ নানা ফসলে। তিস্তা নদীর বুকে প্রায় ৪ বর্গকিলোমিটার এলাকার এক হাজার একরেরও বেশি জমিতে বিভিন্ন উন্নত জাতের মিষ্টিকুমড়ার আবাদ করেছেন এলাকার দেড় শতাধিক কৃষক। গজঘন্টা ইউনিয়নের চর ছালাপাক বাজারে মিষ্টিকুমড়া সংগ্রহে ব্যস্ত সময় পার করছেন কৃষকরা। তারা কুমড়া থেকে মাটি পরিষ্কার করে কাগজে মুড়িয়ে বস্তাবন্দি করছেন। রাস্তার দুই পাশে মিষ্টিকুমড়া স্তূপ করে রাখছেন। কুমড়া বড় ট্রাকে তোলা হচ্ছে বিদেশে রপ্তানির জন্য। ছালাপাকের কৃষক হাবিবুর রহমান রতন, লিটন মিয়া কৃষকদের পক্ষ থেকে বিদেশে এ মিষ্টিকুমড়া রপ্তানি করছেন।
রপ্তানিকারক ও কুমড়া চাষি হাবিবুর রহমান রতন বলেন, বগুড়া পল্লী উন্নয়ন একাডেমি ও বেসরকারি উন্নয়ন সংস্থা সুইস কন্ট্যাক্টের মাধ্যমে সিঙ্গাপুর-মালয়েশিয়াসহ দেশের বিভিন্ন জেলার পাইকারদের সঙ্গে আমাদের যোগাযোগ হয়। তাদের চাহিদামতো গঙ্গাচড়ার চরে মাঝারি আকারের কুমড়া আবাদ করেছি। আমরা কৃষকদের কাছ থেকে গড়ে ১৯ টাকা কেজি দরে কিনে দেশের বাজারে প্রতিকেজি ২১ টাকা দরে বিক্রি করেছি। আর মালয়েশিয়া ও সিঙ্গাপুরে পরিবহনসহ অন্যান্য খরচ যুক্ত করে পাঠানো হচ্ছে। চলতি বছরের জানুয়ারি থেকে ফেব্রুয়ারি মাস পর্যন্ত ২০০ টনের অধিক মিষ্টিকুমড়া বিদেশে পাঠানো হয়েছে; যা থেকে আয় হয়েছে প্রায় আড়াই কোটি টাকা। এখনও ২০ কোটি টাকা মূল্যের কুমড়ার চাহিদা পাঠানো হয়েছে।
উৎপাদিত ফসল কোন বাজারে বিক্রি হবে তা আগেই জানা থাকার কারণে কৃষকরা ফসল উৎপাদনের পর বিক্রি করা নিয়ে আর চিন্তিত নয়। তারা তিন মাসের পরিশ্রমের ফসল সময়মতো বিক্রি করতে পারছেন। চাষের খরচসহ ভালো লাভ করছেন। এতে রংপুরের কাউনিয়া, গঙ্গাচড়া ও পীরগাছার চরের কৃষিতে বৈপ্লবিক পরিবর্তন এসেছে।
এমফোরসি প্রকল্পের আওতাধীন সুইস কন্ট্যাক্টের কর্মকর্তা শ্রীপদ সরকার বলেন, এমফোরসি প্রকল্পের অনুঘটক হিসেবে কাজ করছে। আগে কৃষকদের কেউ ঋণ দিত না, ঋণ দেয় এমন সংস্থাকে গ্রামে নিয়ে এসে কৃষকদের গ্যারান্টার হয়েছি। আগে কৃষকরা ভালো বীজ পেত না, এখন স্বনামধন্য বীজ কোম্পানিকে কৃষকদের কাছে নিয়ে যাওয়া হচ্ছে এবং তাদের লোকজনই আধুনিক উৎপাদন কলাকৌশল কৃষকদের শিখিয়ে দিচ্ছেন।
কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের তথ্যমতে, রংপুর জেলার ৮ উপজেলায় চর-সমতল মিলে ৭৫০ হেক্টর জমিতে এবার মিষ্টিকুমড়া চাষ হয়েছে- যার হেক্টরপ্রতি গড় ফলন হয়েছে ৩৮ দশমিক ৬ টন। এর মধ্যে তিনটি উপজেলার বালুচরে প্রায় ২৫০ হেক্টর জমিতে মিষ্টিকুমড়ার চাষ হয়েছে।
রংপুর কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের উপপরিচালক ওবায়দুর রহমান মণ্ডল বলেন, একসময় চর বলতে আমরা বুঝতাম ফসলহীনতা। তিস্তার চরে বর্ষার পানির সঙ্গে পটাশিয়ামবাহী মাটি আসার কারণে যেকোনো ফসলের ভালো উৎপাদন হয়। আমরা কৃষকদের স্যান্ডবার পদ্ধতি শিখিয়ে দিয়েছি। তারা নির্দিষ্ট দূরত্বে বালুচরে গর্ত তৈরি করে জৈবসার দিয়ে মিষ্টিকুমড়া লাগিয়েছেন। অনেক পরিশ্রমের মাধ্যমে প্রতিদিন বালতিতে করে গাছের গোড়ায় পানি দেন। এত কষ্টের ফসল এখন বিদেশে রপ্তানি হচ্ছে। কৃষকরা ভালো দাম পাচ্ছেন। এতে করে দেশে রিজার্ভে সামান্য হলেও বৈদেশিক মুদ্রা যুক্ত হচ্ছে।