এস এম রানা, চট্টগ্রাম
প্রকাশ : ০৬ মার্চ ২০২৩ ০৯:২৮ এএম
আপডেট : ০৬ মার্চ ২০২৩ ১১:৩৫ এএম
সীতাকুণ্ডে অক্সিজেন প্ল্যান্টে বিস্ফোরণ। প্রবা ফটো
বঙ্গোপসাগরের জোয়ার-ভাটা, ভৌগোলিক অবস্থান এবং জলবায়ুর অনন্য বৈশিষ্ট্যের কারণে চট্টগ্রামের সীতাকুণ্ড উপজেলার প্রায় ১৮ কিলোমিটার দীর্ঘ উপকূলীয় এলাকায় গড়ে উঠেছে জাহাজভাঙা শিল্প।
আশির দশকে যাত্রা শুরু করা এই শিল্প প্রসারের সঙ্গে সঙ্গে চট্টগ্রাম অঞ্চলে বিস্তৃতি লাভ করে ইস্পাত শিল্প। এই দুই শিল্পের প্রয়োজনে লিংকেজ শিল্প হিসেবে গড়ে উঠেছে অক্সিজেন কারখানাও। এর বাইরে জুট মিল, ওষুধ ও পোশাক শিল্প, আমদানি-রপ্তানি পণ্য স্থানান্তরের জন্য ডিপোসহ বহু কারখানা স্থাপিত হয়েছে সীতাকুণ্ডে। ফলে সীতাকুণ্ড এখন ভারী শিল্পের উর্বরভূমি।
এসব শিল্প-কারখানায় লক্ষাধিক শ্রমিক কাজে নিয়োজিত। তাদের হাত ধরেই বিকশিত হচ্ছে শিল্পোৎপাদন, এগিয়ে যাচ্ছে দেশের অর্থনীতি, অথচ সেই শ্রমিকদের নিরাপত্তায় নেই কার্যকর কোনো ব্যবস্থা। এ কারণে প্রতিবছরই সীতাকুণ্ডের কারখানাগুলোতে বিস্ফোরণ, অগ্নিকাণ্ড ও দুর্ঘটনায় শ্রমিকের মৃত্যু হচ্ছে। স্থানীয় শ্রমিক নেতারা আক্ষেপ করে বলছেন, এখানে সস্তা শুধু শ্রমিকের জীবন, মৃত্যু ডালভাত। একের পর এক দুর্ঘটনার পরও তাদের নিরাপত্তা নিয়ে কেউ ভাবে না।
এদিকে বিস্ফোরণ, অগ্নিকাণ্ড ও দুর্ঘটনায় শ্রমিক হতাহতের সব ঘটনায় থানায় মামলা পর্যন্ত হয় না। শ্রমিক মৃত্যুর ঘটনায় মালিকপক্ষ নিহত শ্রমিকের পরিবারকে ক্ষতিপূরণ দেওয়ার মাধ্যমে নিষ্পত্তি করতে বেশি আগ্রহী থাকে। ফলে শ্রমিকদের পরিবার বিচার পায় না। আবার বড় কারখানায় অগ্নিদুর্ঘটনায় মৃত্যুর পর পুলিশ মামলা নিলেও সেই মামলা থাকে গতিহীন।
বিস্ফোরণ ও অগ্নিদুর্ঘটনায় সর্বাধিক মৃত্যুর ঘটনা ঘটে গত বছরের ৪ জুন বিএম ডিপোতে। দাহ্য পদার্থ বিস্ফোরণ ও অগ্নিদুর্ঘটনায় সেদিন মারা যান ৫১ জন। আহত হন অন্তত ২০০। সেই ঘটনায় সীতাকুণ্ড থানার উপপরিদর্শক (এসআই) আশরাফ সিদ্দিকী বাদী হয়ে ডিপোর আট কর্মকর্তার বিরুদ্ধে একটি মামলা দায়ের করেছিলেন। তবে মামলায় প্রভাবশালী ও ধনাঢ্য মালিকপক্ষকে আসামি করা থেকে বিরত ছিল পুলিশ। ওই মামলাটি এখন তদন্ত করছেন জেলা গোয়েন্দা পুলিশের পরিদর্শক মোস্তাক আহমদ চৌধুরী।
মামলার তদন্ত তদারক কর্মকর্তা ও গোয়েন্দা পুলিশের পরিদর্শক নূর মোহাম্মদ প্রতিদিনের বাংলাদেশকে বলেন, নিহত সবার ময়নাতদন্ত প্রতিবেদন ও আহত কয়েকজনের মেডিকেল সনদ না পাওয়ায় এখনও তদন্ত শেষ হয়নি। এ ছাড়া পরিচয় শনাক্ত না হওয়ায় আটজনের মরদেহ মর্গে পড়ে আছে। মর্গে থাকা মরদেহগুলোর ডিএনএ রিপোর্ট পেলে স্বজনদের কাছে হস্তান্তর করা হবে।
প্রায় ৯ মাসেও নিহত আট শ্রমিকের পরিচয় শনাক্ত না হওয়ায় যখন শ্রমিকদের মরদেহ হিমঘরে পড়ে আছে, তখনই শনিবার অক্সিজেন কারখানায় বিস্ফোরণের ঘটনায় ছয়জনের প্রাণ গেল। বিএম ডিপো ও সীমা অক্সিজেন কারখানার অবস্থান এক কিলোমিটারেরও কম দূরত্বে।
এ দুটি বড় দুর্ঘটনার বাইরে ধারাবাহিকভাবে শ্রমিক মৃত্যুর ঘটনা ঘটছে শিপইয়ার্ডগুলোতে। আশির দশক থেকে যাত্রা শুরু করা জাহাজভাঙা শিল্পকে সরকার ২০১১ সালে শিল্প ঘোষণা করে। ২০১২ সালে অনুমোদিত ইয়ার্ডের সংখ্যা ছিল ১৬০টি। পরবর্তী সময়ে নানা প্রতিকূলতায় ইয়ার্ডের সংখ্যা কমতে থাকে। তখন ইয়ার্ডগুলোতে শ্রমিকের সংখ্যা ছিল অন্তত ২৫ হাজার। অবশ্য এখন ইয়ার্ড কমে যাওয়ায় শ্রমিকও কমেছে। এসব ইয়ার্ডে প্রতিবছরই দুর্ঘটনায় হতাহতের ঘটনা ঘটে। সরকারি কোনো দপ্তরেই হতাহতের সঠিক পরিসংখ্যান পাওয়া যায় না।
বেসরকারি উন্নয়ন সংস্থা ইয়াং পাওয়ার ইন সোশ্যাল অ্যাকশনের (ইপসা) সমন্বয়ক মোহাম্মদ আলী শাহীন বলেন, ইপসা শ্রমিকদের স্বার্থসংশ্লিষ্ট বিষয় নিয়ে কাজ করে থাকে। সেই ধারাবাহিকতায় সংস্থাটি ২০০৫ সাল থেকে শিপইয়ার্ডে দুর্ঘটনার শিকার হয়ে মৃত শ্রমিকদের হিসাব রাখে। পাশাপাশি শ্রমিক সেবামূলক সার্বিক কার্যক্রম চালায়। ইপসার তথ্য অনুযায়ী, ২০০৫ থেকে ২০২২ সাল পর্যন্ত ১৭ বছরে ইয়ার্ডগুলোতে বিস্ফোরণ ও দুর্ঘটনার শিকার হয়ে মারা গেছেন ২৩৪ শ্রমিক। আর শিপইয়ার্ডে মারা যাওয়া শ্রমিকদের পূর্ণাঙ্গ ঠিকানাসহ তথ্য রাখা হচ্ছে ২০১২ সাল থেকে। সেই তালিকার তথ্য অনুযায়ী, ২০১২ থেকে ২০২২ সাল পর্যন্ত মারা গেছেন ১৬৩ শ্রমিক।
বিস্ফোরণের বড় ঘটনা পর্যালোচনা করে দেখা গেছে, ২০২২ সালে বিএম ডিপোতে বিস্ফোরণের ঘটনায় ডিপোর আট কর্মকর্তার বিরুদ্ধে মামলা হলেও তাদের গ্রেপ্তার করা হয়নি। মামলাটি তদন্তের নামে ‘হিমঘরে’ রাখা হয়েছে। তদন্ত শেষ না হওয়ায় বিচার প্রক্রিয়াই শুরু হয়নি। আর শিপইয়ার্ডগুলোতে ধারাবাহিক মৃত্যুর ঘটনা ঘটলেও সেসব মৃত্যুর ঘটনায় বেশিরভাগ ক্ষেত্রেই মামলা হয় না। মালিকপক্ষ শ্রমিকদের পরিবারের সঙ্গে আপস-মীমাংসায় পৌঁছেন অর্থের বিনিময়ে।
শনিবার সীমা অক্সিজেন প্ল্যান্টে বিস্ফোরণের পর কারখানার ব্যবস্থাপক আবদুল আলীম দাবি করেছেন, বিস্ফোরক অধিদপ্তর, পরিবেশ ও ফায়ার সার্ভিসসহ সব দপ্তর থেকে অনুমোদন নিয়েই কারখানার কার্যক্রম চলছিল। তিনি বলেন, কারখানার মালিকপক্ষ শ্রমিকদের উপযুক্ত ক্ষতিপূরণ দেবেন এবং আহত শ্রমিকদের চিকিৎসার ব্যবস্থা করেছেন।
জাহাজভাঙা শিল্পে নিয়োজিত শ্রমিক গাইবান্ধার আবদুল করিম মণ্ডল প্রতিদিনের বাংলাদেশকে বলেন, আমি একজন মাঝির মাধ্যমে জাহাজভাঙা শিল্পে কাজ পেয়েছি। এখানে কাজ করা ঝুঁকিপূর্ণ। কিন্তু কোনো উপায় নেই। ছেলে-মেয়ে স্কুলে পড়ে। পরিবার চালাতে হলে ঝুঁকি তো নিতেই হয়।
কাজের সময় নিরাপত্তামূলক ব্যবস্থা মেনে চলেন কি না- জানতে চাইলে তিনি বলেন, কারখানায় হেলমেট আছে, বুট আছে। সেগুলো পরি। সচেতন থাকি।
বাংলাদেশ ট্রেড ইউনিয়ন কেন্দ্র চট্টগ্রামের সভাপতি ও জাহাজভাঙা শ্রমিক ট্রেড ইউনিয়নের আহ্বায়ক তপন দত্ত প্রতিদিনের বাংলাদেশকে বলেন, আমরা জেনেছি, জাহাজ থেকে পুরোনো সিলিন্ডার এনে অক্সিজেন কারখানায় ব্যবহার হয়। কারখানার নিরাপত্তার বিষয়গুলোকে সরকারের যেসব সংস্থার দেখার কথা, সেই সংস্থাগুলোর সঙ্গে মালিকপক্ষের সুসম্পর্ক থাকে। তাই শ্রমিকদের মৃত্যুর ঘটনায় মামলা হয় না। শ্রমিকদের পরিবারকে কিছু টাকা দিয়ে ঘটনা চুকিয়ে ফেলে মালিকপক্ষ।
শ্রমিকদের পরিবার কেন মামলা করে নাÑ এমন প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, দরিদ্র শ্রমিক পরিবারের কি এমন সাধ্য থাকে? তিনি বলেন, শ্রমজীবী মানুষের দাম নেই, মৃত্যুরও শেষ নেই। তাদের মৃত্যু এখন ললাটলিখন হয়ে দাঁড়িয়েছে।
ধারাবাহিক মৃত্যুর ঘটনায় শিপইয়ার্ড মালিকদের সংগঠন বাংলাদেশ শিপ ব্রেকার্স অ্যান্ড রিসাইক্লার্স অ্যাসোসিয়েশনের (বিএসবিআরএ) সহকারী সচিব নাজমুল ইসলাম প্রতিদিনের বাংলাদেশকে বলেন, শিপইয়ার্ড ভারী শিল্প। এই শিল্পে নিয়োজিত শ্রমিকরা সরকারি নির্দেশনা অনুযায়ী নিরাপত্তাব্যবস্থা মেনেই কাজ করেন। এখন মালিক ও শ্রমিক উভয়পক্ষের দায়দায়িত্ব আছে। সব পক্ষের সর্বোচ্চ চেষ্টা থাকে যাতে দুর্ঘটনা না ঘটে। এরপরও দৈবদুর্বিপাকে দুর্ঘটনা ঘটলে মালিকপক্ষ হতাহত শ্রমিকদের পক্ষেই থাকেন।