চট্টগ্রাম অফিস
প্রকাশ : ০৪ মার্চ ২০২৩ ১৯:৫০ পিএম
আপডেট : ০৪ মার্চ ২০২৩ ২০:১৪ পিএম
চট্টগ্রামে তালাবদ্ধ ঘর থেকে মুখ ও হাত-পা বাঁধা অবস্থায় অজ্ঞাতপরিচয় ব্যক্তির মরদেহ উদ্ধারের ঘটনার রহস্য উম্মোচনের দাবি করেছে পুলিশ ব্যুরো অব ইনভেস্টিগেশন (পিবিআই)। টাকা ও গোসলের পানি ব্যবহার নিয়ে বিরোধের জেরে ওই ব্যক্তিকে হত্যা করা হয়েছে বলে জানিয়েছে সংস্থাটি। পিবিআই জানিয়েছে, শুক্রবার (৩ মার্চ) রাজধানীর ধানমন্ডি থেকে হত্যাকাণ্ডে জড়িত সন্দেহে একজনকে গ্রেপ্তারের পর এই রহস্য উম্মোচন করা হয়েছে।
গ্রেপ্তার আব্দুর রহমান
চট্টগ্রামের সন্দ্বীপ উপজেলার হরিষপুর ইউনিয়নের বাসিন্দা। তার কাছ থেকে নিহত সালাউদ্দিনের
মোবাইল ফোন উদ্ধার করা হয়েছে।
পিবিআইয়ের (মেট্রো)
বিশেষ পুলিশ সুপার নাইমা সোলতানা প্রতিদিনের বাংলাদেশকে বলেন, ‘গত ২৭ ফেব্রুয়ারি একজনের মরদেহ উদ্ধার করে খুলশী থানা পুলিশ। এই ঘটনায়
পুলিশ অজ্ঞাতপরিচয় আসামির বিরুদ্ধে একটি হত্যা মামলা করে। সেই মামলাটি তদন্তের জন্য
পিবিআই অধিগ্রহণ করে। এরপর ক্লুলেস হত্যাকাণ্ডের বিষয়ে অনুসন্ধান শুরু হয়।’
গ্রেপ্তারের বিষয়ে তিনি
বলেন, ‘একজনকে আটকের পর জেনেছি, ঘটনায় আরও একজন জড়িত।
গ্রেপ্তার আবদুর রহমান মহানগর হাকিম আদালতে হত্যাকাণ্ডের দায় স্বীকার করে জবানবন্দি
দিয়েছেন। পরে আদালত আসামিকে কারাগারে পাঠানোর আদেশ দেয়।’
রহস্য উম্মোচনের বিষয়ে
নাইমা সোলতানা বলেন, ‘মরদেহ উদ্ধারের দিনই পিবিআই নিহতের আঙুলের ছাপ
সংগ্রহ করেছিল। নিহতের নাম মো. সালাউদ্দিন শেখ। তিনি নারায়ণগঞ্জ জেলার বাসিন্দা। বাড়িতে
তার স্ত্রী ও দুই সন্তান রয়েছে। পেশায় ইলেক্ট্রিক মিস্ত্রি সালাউদ্দিন বিভিন্ন স্থানে
মেলার স্টলে বিদ্যুৎ সরবরাহ লাইনের কাজ করেন। এ ছাড়া দিনমজুর হিসেবেও কাজ করেন। কাজের
সুবাদে সিলেটের এক মেলায় সালাউদ্দিনের সঙ্গে স্বপন নামে এক শ্রমিকের ঘনিষ্ঠতা হয়।’
তিনি বলেন, ‘সালাউদ্দিন মহানগরীর আবাহনী মাঠ ও পলোগ্রাউন্ডে বাণিজ্য মেলার কাজ
পাওয়ার পর মাসখানেক আগে স্বপনকে নিয়ে চট্টগ্রামে আসেন। এখানে মাসিক দুই হাজার টাকা
ভাড়ায় তারা ঘর ভাড়া নিয়ে চট্টগ্রামে বসবাস শুরু করেন। বাসা ভাড়া নেওয়ার পর দুজন সকালের
নাস্তা খান আমবাগানের দুলাল সওদাগরের চা দোকানে। সেখানে তাদের পরিচয় হয় আবদুর রহমানের
সঙ্গে। এই পরিচয়ের সুবাদে আবদুর রহমানও ১৫ ফেব্রুয়ারি সালাউদ্দিনের সঙ্গে একই বাসায়
উঠেন। পরে সালাউদ্দিনের সঙ্গে আবদুর রহমানও কাজে যোগ দেন।’
বিরোধের বিষয়ে আবদুর
রহমান জানিয়েছেন, মেলায় সকাল ৯টা থেকে বিকাল ৫টা পর্যন্ত কাজ করলে ৭০০-৮০০ টাকা এবং
রাত ১২টা পর্যন্ত কাজ করলে ১২০০-১৪০০ টাকা করে দিতেন ঠিকাদার। তার সঙ্গে শুধু সালাউদ্দিনের
যোগাযোগ ছিল। তিন জনের টাকা সালাউদ্দিন একা নিতেন এবং পরে ভাগ করতেন। পরে আবদুর রহমান
জানতে পারেন, সালাউদ্দিন প্রতিদিন ৪০০ টাকা হারে কম দিচ্ছেন। এতে তারা ক্ষুব্ধ হন।
এ ছাড়া বাসায় গোসলের পানি বেশি ব্যবহার করতেন সালাউদ্দিন। এই নিয়ে তাদের মধ্যে ক্ষোভ
আরও বাড়ে। পানি ব্যবহার নিয়ে তাদের মধ্যে এক দিন ঝগড়া হয়। সালাউদ্দিন তার দুই সহকর্মী
স্বপন ও আবদুর রহমানকে গালিগালাজ করেন। এরপর তারা দুজন মিলে সালাউদ্দিনকে শায়েস্তা
করার পরিকল্পনা করেন।
মামলার তদন্তকারী কর্মকর্তা
পিবিআই পরিদর্শক কামরুল ইসলাম বলেন, ‘সালাউদ্দিনকে উচিত শিক্ষা দেওয়ার লক্ষ্যে ঘটনার
এক সপ্তাহ আগে একটি ছোরা কিনেন স্বপন ও আবদুর রহমান। ২৪ ফেব্রুয়ারি সালাউদ্দিন বাসায়
ফিরে ঘুমিয়ে পড়েন। ওই সময় স্বপন ও আবদুর রহমান লুডু খেলে ঘুমিয়ে পড়েন। রাত ১টার সময়
স্বপন ও আবদুর রহমান ঘুম থেকে ওঠেন। স্বপন প্রথমে ছোরা দিয়ে সালাউদ্দিনের গলায় আঘাত
করেন। আবদুর রহমান সালাউদ্দিনের দুই হাত চেপে ধরেন। এই সময় স্বপনের হাত থেকে ছোরা দিয়ে
পুনরায় গলায় আঘাত করেন আবদুর রহমান।’
তিনি বলেন, ‘তখন সালাউদ্দিন ছোরা কেড়ে নিতে চান। এই সময় তাদের মধ্যে ধস্তাধস্তি
হয়। একপর্যায়ে সালাউদ্দিনকে উপর্যপুরি আঘাত করা হলে নিস্তেজ হয়ে পড়েন সালাউদ্দিন। পরে
আবদুর রহমান একটি গামছা দিয়ে সালাউদ্দিনের দুই হাত ও স্বপন ওড়না দিয়ে দুই পা বেঁধে
দেন। শেষে কম্বল দিয়ে লাশের মুখ ঢেকে দিয়ে তারা ঘরের দরজায় তালা লাগিয়ে পালিয়ে যান।
হত্যাকাণ্ডের পর সালাউদ্দিনের পকেটে ৩৫০ টাকা পান স্বপন ও আবদুর রহমান। সেই টাকা তারা
দুজনে ভাগ করে নেন।
আসামি গ্রেপ্তারের বিষয়ে পরিদর্শক ইলিয়াস খান বলেন, ‘হত্যাকাণ্ডের পর তারা পালিয়ে নগরীর অলংকার মোড়ে যান। সেখান থেকে ফেনী, কুমিল্লার চান্দিনা হয়ে নরসিংদী পৌঁছেন। পরে সেখান থেকে দুজন আলাদা হয়ে আবদুর রহমান নারায়ণগঞ্জে মামার বাসায় যায়। স্বপন অন্যদিকে পালিয়ে যান। আবদুর রহমান নারায়ণগঞ্জ থেকে পুনরায় কুমিল্লায় শ্বশুর বাড়িতে যান। পরে শ্বশুর বাড়ি থেকে অন্তত ছয় কিলোমিটার দূরে বালি শ্রমিক হিসেবে কাজ নেন। এরই মধ্যে পিবিআই সেখানে অভিযান চালায়। তখন আবদুর রহমান টের পেলে পালিয়ে ধানমন্ডি চলে যান। শেষে ধানমন্ডি থেকে তাকে গ্রেপ্তার করা হয়।’