সুফল চাকমা, বান্দরবান
প্রকাশ : ০২ মার্চ ২০২৩ ১০:০৫ এএম
রুমার আরথাহপাড়া সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয় খোলা থাকলেও ভয়-আতঙ্কে আসছে না কোনো শিক্ষর্থী। প্রবা ফটো
বান্দরবানের রুমা উপজেলার দুর্গম পাহাড়ি এলাকায় গোলাগুলি আতঙ্কে ১২টি সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের শ্রেণিকার্যক্রম বন্ধ রয়েছে। এর মধ্যে রুমায় ১০টি ও রোয়াংছড়িতে ২টি স্কুলের অবস্থান। পাহাড়ে যৌথ বাহিনীর অভিযান চলাকালে সন্ত্রাসীদের সঙ্গে গোলাগুলির আতঙ্কে শিক্ষার্থীরা আসছে না।
ফলে গত ফেব্রুয়ারি থেকে বিদ্যালয়গুলো বন্ধ রয়েছে বলে জানিয়েছেন স্থানীয়রা। এমনিতেই এসব এলাকার শিক্ষার্থীরা নানা কারণে লেখাপড়ায় পিছিয়ে। এর মধ্যে শ্রেণিকার্যক্রম বন্ধ থাকায় শিখন-ঘাটতিতে পড়ছে তারা। যাদের সামর্থ্য আছে তারা ছেলেমেয়েদের লেখাপড়ার জন্য উপজেলা-জেলা শহরে থাকছে।
গত বছরের অক্টোবর থেকে রুমা ও রোয়াংছড়ি উপজেলায় কুকি-চিন ন্যাশনাল ফ্রন্ট (কেএনএফ) ও নতুন জঙ্গি সংগঠন জামাতুল আনসার ফিল হিন্দাল শারক্বীয়ার সদস্যদের বিরুদ্ধে অভিযান চালাচ্ছে সেনা ও র্যাবের যৌথ বাহিনী। মাঝেমধ্যে তাদের মধ্যে গোলাগুলির ঘটনাও ঘটে। মূলত ভয় ও আতঙ্কে শিক্ষার্থীরা না আসায় বিদ্যালয়গুলো বন্ধ রয়েছে বলে জানান স্থানীয়রা।
বন্ধ থাকা বিদ্যালয়গুলো হলো, উপজেলার পাইন্দু ইউনিয়নের মুয়ালপি পাড়া, আরথাহ পাড়া, বাসতাং পাড়া এবং মুননুয়াম পাড়া সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয় এবং রেমাক্রিপ্রাংসা ইউনিয়নের পাকনিয়ার পাড়া ও কেসপাই সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়।
উপজেলা প্রাথমিক শিক্ষা কর্মকর্তা আশীষ চিরান প্রতিদিনের বাংলাদেশকে বলেন, বন্ধ থাকা ছয়টি বিদ্যালয়ের মধ্যে রেমাক্রিপ্রাংসা ইউনিয়নের পাকনিয়ার ও জেসপাই বিদ্যালয়ে গত বছরের ডিসেম্বর থেকেই শিক্ষার্থীদের উপস্থিতি কমে যায়। ফলে বিদ্যালয় দুটি একবার বন্ধ হয়, একবার খোলা হয়, এমন অবস্থার মধ্যে ছিল। জানুয়ারি মাসে নতুন বইও বিতরণ করা হয়েছে। কিন্তু সাম্প্রতিক পরিস্থিতির কারণে একেবারেই বন্ধ হয়ে গেছে।
তিনি আরও বলেন, রেমাক্রিপ্রাংসা ইউনিয়নের এই দুটি বিদ্যালয় বেশ দুর্গম এলাকায়। উচুঁ-নিচু পাহাড় বেয়ে হাঁটার পথই স্কুলে যাওয়ার একমাত্র রাস্তা। পাকনিয়ার বিদ্যালয়ে শিক্ষার্থীর সংখ্যা আগে বেশি ছিল। বর্তমানে মাত্র ১৬-১৭ জনের মতো।
এলাকায় বিরূপ পরিস্থিতির পর শিক্ষার্থীর উপস্থিতি আরও কমে যাওয়ায় বিদ্যালয়টি একেবারেই বন্ধ হয়ে যায়। অন্য চারটি বিদ্যালয় এলাকার পরিস্থতি স্বাভাবিক হলে খোলা হয়, খারাপ হলে আবার বন্ধ হয়ে যায়।
বিদ্যালয় বন্ধের বিষয়ে রুমায় সাপ্তাহিক বাজারের দিনে বেশ কয়েকজনের সঙ্গে কথা হয় এই প্রতিবেদকের। নাম প্রকাশ না করার শর্তে তারা জানান, এলাকায় খারাপ পরিস্থিতির কারণে ছেলেমেয়েদের বিদ্যালয়ে পাঠাতে ভয় পান। বিরূপ পরিস্থিতি হওয়ার পর সামর্থ্যবান কেউ কেউ ছেলেমেয়েদের উপজেলা ও জেলা শহরে নিয়ে লেখাপড়া করাচ্ছে। কিন্তু অধিকাংশ জুমচাষির ছেলেমেয়েকে এলাকার বাইরে পাঠিয়ে লেখাপড়া করানোর সামর্থ্য নেই। এখন তারাই বেশি ক্ষতির সম্মুখীন হচ্ছে।
তারা আরও জানান, এমনিতে দুর্গম এলাকা হওয়ায় ছেলেমেয়েরা নানা কারণে লেখাপড়ায় দুর্বল। এর মধ্যে আবার বিদ্যালয় বন্ধ। এলাকায় রয়েছে চাপা আতঙ্ক। সবকিছু মিলে তারা লেখাপড়ার করার ক্ষেত্রে বড় ধরনের ক্ষতির শিকার হচ্ছে। কোনো বিকল্প উপায় না থাকার বাধ্য হয়ে ক্ষতি মেনে নিতে হচ্ছে। পরিস্থিতি কবে স্বাভাবিক হবে, তাও বলা যাচ্ছে না। অভিযানের আগে কিছু দুর্গম এলাকায় গাড়ি যেত। অভিযানের পর থেকে নিরাপত্তার কারণে যানবাহন না থাকায় বাজারে তিন ঘণ্টার পথ পায়ে হেঁটে আসতে হয় বলেও জানান তারা।
রুমা উপজেলা চেয়ারম্যান উহ্লাচিং মারমা বলেন, এলাকাবাসী তাকে জানিয়েছেন সাম্প্রতিক পরিস্থিতির কারণে শিক্ষার্থীরা বিদ্যালয়ে আসা বন্ধ করে দিয়েছে। মূলত শিক্ষার্থীরা না আসার কারণেই বিদ্যালয়গুলো বন্ধ রয়েছে। উপজেলার মাসিক সমন্বয় সভাতেও ছয়টি সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয় বন্ধ থাকার বিষয়ে আলোচনা হয়েছে।
সভায় শিক্ষা বিভাগের সংশ্লিষ্টরা জানান, সন্ত্রাস ও জঙ্গিবাদের বিরুদ্ধে অভিযান পরিচালিত হচ্ছে। মাঝেমধ্যে যৌথ বাহিনীর সঙ্গে সন্ত্রাসীদের গোলাগুলি হওয়ায় শিক্ষার্থীরা বিদ্যালয়ে আসতে ভয় পাচ্ছে। যার কারণে এই ছয়টি প্রাথমিক বিদ্যালয় বন্ধ রয়েছে।
এদিকে বিদ্যালয়গুলো বন্ধ থাকার বিষয়টি ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষকে জানানো হয়েছে বলে জানিয়েছেন রুমা উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) মোহাম্মদ মামুন শিবলী।
কেএনএফ নামে পাহাড়ের একটি সশস্ত্র দলের তৎপরতার খবর বেশ কয়েক মাস ধরেই আলোচনায় আসছিল। পাহাড়িরা কেএনএফ সংগঠনটিকে ‘বম পার্টি’ নামে চেনে। নিজেদের তারা পার্বত্য চট্টগ্রামের প্রান্তিক অঞ্চলের অনগ্রসর জনজাতিগুলোর প্রতিনিধিত্বকারী হিসেবে তুলে ধরে।
এ সংগঠন ‘কুকি-চীন রাজ্যে’ নামে একটি স্বায়ত্তশাসিত অঞ্চল চায়; যেখানে চাকমা, মারমা ও ত্রিপুরারা থাকবে না, থাকবে বম, খিয়াং, পাংখুয়া, লুসাই, খুমি ও ম্রোরা।
এ ছাড়া বান্দরবান জেলায় কেএনএফ সংগঠনটি অর্থের বিনিময়ে নতুন জঙ্গি সংগঠন জামাতুল আনসার ফিল হিন্দাল শারক্বীয়ার সদস্যদের সামরিক প্রশিক্ষণ দিচ্ছে বলে গত বছরের অক্টোবরে সংবাদ সম্মেলন করে জানায় র্যাব।
এ তথ্য পাওয়ার পর থেকে জঙ্গি ও কেএনএফ সদস্যদের বিরুদ্ধে রোয়াংছড়ি ও রুমা উপজেলায় যৌথ অভিযান চালাচ্ছেন র্যাব ও সেনাসদস্যরা। পরে এ অভিযান চালানো হয় থানচি উপজেলাতেও। যৌথ বাহিনীর এ অভিযানে পার্বত্য চট্টগ্রাম এলাকা থেকে এ পর্যন্ত শারক্বীয়ার ৩৫ এবং কেএনএফের ১৭ সদস্যকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে।
এদিকে অভিযানের পর থেকে বান্দরবানের রুমা, রোয়াংছড়ি, থানচি ও আলীকদম চারটি উপজেলায় দেশি-বিদেশি পর্যটক ভ্রমণে নিষেধাজ্ঞা দেয় স্থানীয় প্রশাসন। দফায় দফায় মেয়াদ বাড়ানোর পর তিনটি উপজেলা থেকে নিষেধাজ্ঞা তুলে নেওয়া হলেও রুমা উপজেলায় এখনও অনির্দিষ্টকালের নিষেধাজ্ঞা রয়েছে।