বরিশাল সংবাদদাতা
প্রকাশ : ২৩ জুন ২০২২ ২১:৩৫ পিএম
আপডেট : ২৪ জুন ২০২২ ২০:১৬ পিএম
পদ্মা সেতু
পদ্মা সেতুকে ঘিরে দক্ষিণাঞ্চলের ব্যবসায়ীরা ব্যাপক উচ্ছ্বসিত। একদিন বাদেই চালু হচ্ছে স্বপ্নের সেতু। তবে তার আগেই জেগে উঠা শুরু করেছে বরিশাল বিভাগের ছয়টি জেলার ব্যবসা-বাণিজ্য। সেতুকে কেন্দ্র করে ঢাকা ও চট্রগ্রামের শিল্প মালিকরা এই অঞ্চলের বিভিন্ন স্থানে শিল্প অবকাঠামো তৈরি করা শুরু করেছেন।
কারখানা স্থাপনের জন্য পোশাক শিল্প মালিকরা ঢাকা-বরিশাল-কুয়াকাটা মহাসড়কের পাশে জমি কিনেছেন, অনেকে এখনও কিনছেন। এতে বিপুল সংখ্যক মানুষের কর্মসংস্থানের সুযোগ হচ্ছে।
রাজধানীর সঙ্গে দক্ষিণাঞ্চলের সড়ক যোগাযোগে শুরু হচ্ছে, যা এই অঞ্চলের মানুষের জন্য নতুন দিগন্ত। ফেরি পারাপারের বিড়ম্বনা এড়িয়ে মাত্র তিন-চার ঘণ্টায় ঢাকায় পৌঁছে যাবে বরিশাল বিভাগের মানুষ। ফলে দক্ষিণের গোটা আর্থ-সামাজিক ক্ষেত্রে বৈপ্লাবিক পরিবর্তনের ছোঁয়া লাগছে।
বরিশাল বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য ও বিশ^বিদ্যালয়টির বিজনেস স্টাডিজ অনুষদের ডিন অধ্যাপক ছাদেকুল আরেফিন বলেন, পদ্মা সেতু বরিশাল তথা দক্ষিণাঞ্চলকে শিল্প-বাণিজ্যের অন্যতম কেন্দ্রবিন্দুতে পরিণত করবে। পদ্ম সেতু যোগাযোগ ব্যবস্থাকে সহজ করে তুলবে। প্রসার ঘটবে চলমান ব্যবসা-বাণিজ্যের। শিল্প-কারখানা স্থাপনে এগিয়ে আসবেন নতুন নতুন বিনিয়োগকারীরা। এতে কর্মসংস্থান সৃষ্টির পাশাপাশি দক্ষিণের অর্থনীতি হবে আরও সমৃদ্ধ ও গতিশীল। জিডিপিতে বিশেষ অবদান রাখতে পারবে বরিশাল বিভাগ।
তিনি আরও বলেন, ভোলার গ্যাস বরিশালে সরবরাহ করা হলে, পায়রা তাপ বিদ্যুৎ কেন্দ্রের বিদুৎ বিতরণ শুরু হলে এবং পায়রা বন্দরের কার্যকরিতা যথাযথ করা হলে বিদেশি বিনিয়োগকারীরা ছুটে আসবেন বরিশালে।
বাংলাদেশ অর্থনীতি সমিতির কেন্দ্রীয় সদস্য ও বরিশাল ব্রজমোহন কলেজের (বিএম) অর্থনীতি বিভাগের সহযোগী অধ্যাপক আখতারুজ্জামান বলেন, দক্ষিণাঞ্চলের কৃষি অর্থনীতিকে গতিশীল করবে পদ্মা সেতু। উৎপাদিত কৃষিপণ্য সহজ ও সাশ্রয়ী ভাড়ায় রাজধানীতে দ্রুত বাজারজাতকরণের সুযোগ সৃষ্টি হবে। ফলে দক্ষিণের কৃষি অর্থনীতির চাকা ঘুরবে দ্রুত। এ অঞ্চলে জমি আছে, শ্রমিক আছে। যে কারণে বিনিয়োগকারীরা এগিয়ে আসবেন। এ জন্য ব্যাপক শিল্পায়নের সম্ভবনা সৃষ্টি হয়েছে। এতে বাড়বে কর্মসংস্থান। এখন দেশি-বিদেশি বিনিয়োগকারীদের আরও আকৃষ্ট করতে দক্ষিণাঞ্চলে প্রয়োজন বিশেষ অর্থনৈতিক অঞ্চল এবং রপ্তানি প্রক্রিয়াকরণ অঞ্চল (ইপিজেড)।
বরিশাল চেম্বার অব কমার্সের সভাপতি সাইদুর রহমান রিন্টু বলেন, পদ্মা সেতুকে ঘিরে বরিশাল বিভাগের ব্যবসায়ীরা উচ্ছ্বসিত। তারা ব্যবসা-বাণিজ্যে নবদিগন্ত সৃষ্টির স্বপ্নে বিভোর। ঢাকা-চট্টগ্রামের শিল্প মালিকরা বরিশালে আসতে শুরু করেছেন।
বরিশালের পাশের শহর ঝালকাঠি। প্রসিদ্ধ বাণিজ্যিক কেন্দ্রের কারণে একসময়ে ঝালকাঠীকে বলা হতো ‘দ্বিতীয় কলকাতা’। কয়েক যুগ আগে ব্যবসা-বাণিজ্যের সেই জৌলুস হারিয়েছে ঝালকাঠি। তবে পদ্মা সেতু চালু হওয়ার পর হারানো গৌরব আবার ফিরে আসবে বলে মনে করেন এই জেলার ব্যবসায়ী নেতারা।
ঝালকাঠি চেম্বার অব কমার্সের সাবেক সভাপতি সালাউদ্দিন সালেক প্রতিদিনের বাংলাদেশকে বলেন, ‘ঝালকাঠি একসময় ব্যবসা-বাণিজ্যের জন্য দ্বিতীয় কলকাতা ছিল। পদ্মা সেতু চালু হলে এখানে ভারি শিল্প স্থাপন করে আমরা ঝালকাঠিকে সিঙ্গাপুরে পরিণত করতে চাই।’
তিনি আরও বলেন, আমরা ভোজ্যতেল ও ভোগপণ্যের শিল্প গড়ে তুলতে চাই ঝালকাঠিতে। এজন্য ভোলার গ্যাস প্রয়োজন। লবণশিল্পের জন্য বিখ্যাত জেলা ঝালকাঠি। এ জেলায় ১১টি মিলে উৎপাদিত হচ্ছে লবণ। ঝালকাঠি লবণ মিল মালিক সমিতির সাধারন সম্পাদক মো. জামাল শরীফ বলেন, আমরা এতদিন পদ্মার পশ্চিম তীরের জেলাগুলোতে লবণ বাজারজাত করতাম। পদ্মা সেতু খুলে দেওয়ার পর রাজধানী ঢাকা ও আশপাশের জেলাগুলোতে সহজে, কম খরচে লবণ বাজারজাত করা সম্ভব হবে। তিন ঘণ্টায় ঢাকায় পৌঁছে যাবে ঝালকাঠির লবণ। এতে ঝালকাঠির লবণ শিল্পে নতুন সম্ভবনার দুয়ার খুলবে।
পটুয়াখালী চেম্বার অব কমার্সের সভাপতি গিয়াস উদ্দিন বলেন, পদ্মা সেতু পায়রা সমুদ্র বন্দরের গুরুত্ব বাড়িয়ে দিয়েছে বহু গুণ। পায়রা বন্দরে কার্যকরিতা বাড়লে পটুয়াখালীতে হবে ইপিজেড। কুয়াকাটার পর্যটন ব্যবসা সমৃদ্ধ হবে। কৃষি ভিত্তিক শিল্প এবং সংরক্ষনাগার গড়ে উঠবে। সৃষ্টি হবে কর্মসংস্থানের অপার সুযোগ।
বরগুনা চেম্বার অব কমার্সের সভাপতি জাহাঙ্গীর কবির বলেন, মাছ এবং কৃষিপণ্য উৎপাদনে বরিশাল বিভাগের অন্যতম জেলা বরগুনা। ব্যবসায়িরা ঢাকা ও চট্রগ্রামের সঙ্গে যোগাযোগে যুগ যুগ ধরে দূর্ভোগ পোহাচ্ছিলেন। এই দূর্ভোগ লাঘব করবে পদ্মা সেতু। বরগুনায় মৎস্য ও কৃষি ভিত্তিক শিল্প প্রতিষ্ঠার বিপুল সম্ভবনার ক্ষেত্র সৃষ্টি হয়েছে। ধান-চালের ব্যবসায়িরা পণ্য নিয়ে বরগুনা থেকে দ্রুত ঢাকায় যেতে পারবেন।
বরগুনা জেলা বাস মালিক গ্রুপের সভাপতি গোলাম মোস্তফা কিসলু বলেন, নৌপথে বরগুনার মালিকদের ঢাকা যেতে ১৮ থেকে ২০ ঘণ্টা সময় লাগে। পদ্মা সেতু চালু হলে বরগুনার মানুষ সড়কপথে চার-পাঁচ ঘণ্টায় ঢাকায় যেতে পারবেন। জেলার বাস মালিকরা প্রায় অর্ধশত নতুন বাস তৈরি করছেন সুগম সড়কপথে যাত্রী পরিবহনের জন্য। বিভিন্ন পরিবহন কোম্পানির কাউন্টার খোলা হয়েছে বরগুনায়। সড়কপথে বরগুনা থেকে ঢাকায় যেতে নতুন যে দ্বার উম্মোচিত করবে পদ্মা সেতু, তাতে পরিপূর্ণতা দিতে বরগুনা-বাকেরগঞ্জ সড়ক প্রশস্ত করা প্রয়োজন বলে মনে করেন তিনি।
পিরোজপুর জেলা ব্যবসায়ি সমিতির সাধারন সম্পাদক ও জেলা চেম্বারের সহ সভাপতি গোলাম মোস্তফা নকিব বলেন, পিরোজপুরের ব্যবসায়িরা রাজধানী ও উত্তরবঙ্গ থেকে পণ্য আনতে চরম ফেরী বিরাম্বনায় পড়তেন। সেই দূর্ভোগ আর থাকছে না। পদ্মা সেতু খুলে দেয়ার পর সকালে ঢাকায় গিয়ে পণ্য কিনে ব্যবসায়িরা রাতেই আবার পিরোজপুর ফিরতে পারবেন। এতে সময় এবং অর্থ দুটিই বাঁচবে। কাচামাল ব্যবসায়িদেও ফেরি আতঙ্ক ও সংকট কেটে যাবে। তিনি আরও বলেন, রাজধানীর সঙ্গে যোগাযোগ ভাল না থাকায় পিরোজপুরে কোন শিল্প কারখানা গড়ে উঠেনি। এ জেলায় জমির দাম এবং শ্রমিক মজুরি কম। তাই পিরোজপুরে শিল্প স্থাপনে আগ্রহী হবেন বিনিয়োগকারীরা। জেলার নাজিরপুর উপজেলায় বিপুল পরিমাণ সবজি উৎপাদিত হয়। স্থানীয় চাহিদা মিটিয়ে এই সবজি চাষীরা সহজে ঢাকায় বাজারজাত করে অধিক লাভবান হবেন। এছাড়া গবাদীপশুর খামার স্থাপনের উজ্জল সম্ভাবনা রয়েছে পিরোজপুরে।