কালিয়াকৈর (গাজীপুর) প্রতিবেদক
প্রকাশ : ১৬ ফেব্রুয়ারি ২০২৩ ১১:৪৪ এএম
আপডেট : ১৬ ফেব্রুয়ারি ২০২৩ ১৪:৫৭ পিএম
গাজীপুরের কালিয়াকৈরের উল্টাপাড়া এলাকায় পাল সম্প্রদায়ের শতাধিক পরিবার বংশপরম্পরায় ধরে রেখেছে এই শিল্পটি। প্রবা ফটো
পাল সম্প্রদায়ের মানুষের সম্পর্ক মাটির সাথে। তাদের আচারণও মাটির মতো কোমল। নরম কাদামাটির মণ্ড চাকায় বসিয়ে দুই হাতের নিপুণ ছোঁয়ায় গড়ে তোলেন মাটির তৈজস। গাজীপুরের কালিয়াকৈর উল্টাপাড়া এলাকায় বেশ কিছু পাল সম্প্রদায়ের মানুষের বসবাস রয়েছে। প্রায় শতাধিক পরিবার বংশপরম্পরায় এ কাজের সাথে জড়িত আছেন। আধুনিক আসবাবপত্রের যুগেও তারা ধরে রেখেছেন মৃৎশিল্প।
যতই পরিবেশ সম্মত হোক- বর্তমান বিশ্বে মাটির পাত্রের চাহিদা নেই। তবে মাটির ব্যাংক এখনও মানুষকে আকর্ষণ করে। তবে এটুকু দিয়ে পাল বাড়ির খোরাকি চলে না। বিগত বছরে বৈশ্বিক কোভিড মহামারি ও দ্রব্যমূল্যের ঊর্ধ্বগতি থাকায় জীবনযুদ্ধে টিকে থাকা এ সম্প্রদায়ের জন্য কঠিন হয়ে পড়েছে। দাদন ব্যবসায়ী ও মধ্যস্বত্বভোগীদের দাপটে দিনরাত পরিশ্রম করেও ভাগ্য ফেরাতে পারছেন না তারা।
মাটির ব্যাংক তৈরির প্রয়োজনীয় কাঁচামালের দাম, কারিগর ও শ্রমিকদের খরচ বেড়ে যাওয়ায় বিপাকে পড়েছে পাল বাড়ির ভাগ্য। এখন এই শিল্পকে টিকিয়ে রাখতে হলে সরকারের সহযোগিতার প্রয়োজন বলে জানান সংশ্লিষ্টরা। এখানকার উৎপাদিত ব্যাংকের গুণগত মান, আকার আকৃতি ও ধরন ভালো হওয়ায় ঢাকাসহ সারা দেশে মাটির ব্যাংকের চাহিদা রয়েছে। তবে বাজার ব্যবস্থাপনা ও আর্থিক প্রণোদনাসহ সার্বিক সহযোগিতা না পেলে হারিয়ে যাবে মৃৎশিল্প।
উপজেলার ঢালজোড়া ইউনিয়নের উল্টাপাড়া গ্রামে সরেজমিনে দেখা গেছে, দিনরাত চলে মাটির ব্যাংক তৈরির কাজ। সূর্যোদয়ের আগ থেকে সূর্যাস্ত পর্যন্ত এ কাজ চলতে থাকে। কখনও কাজের চাপে কাদামাখা শরীরে খাওয়ার কথা মনেই থাকে না। বিনোদন মানে তাদের মাটির সাথে খেলা করা। নরম কাদামাটি দিয়ে মণ্ড বানানো হয়, তারপর চাকায় বসিয়ে হাতের নিপুণ ছোঁয়ায় গড়ে তোলা হয় মাটির ব্যাংক। রোদে শুকিয়ে বিশেষ চুল্লিতে আগুনে পোড়ানো হয়। মনের মাধুরী দিয়ে ক্রেতাদের চাহিদার কথা বিবেচনায় নিয়ে নানা রঙে রাঙিয়ে বিক্রয় উপযোগী করে তুলতে হয়। এভাবে প্রতিটি মাটির ব্যাংকে কারিগরদের আনন্দ বেদনা লুকিয়ে থাকে।
মাটির ব্যাংক তৈরির কারিগর অর্জুন পাল জানান, শুনেছি আমাদের গ্রামে মাটি দিয়ে বিভিন্ন রকমের মাটির তৈজসপত্র তৈরি করতেন পূর্বপুরুষেরা। আধুনিকতার কারণে মাটির তৈজসপত্রের ব্যবহার কমে গেছে। এখন শুধু কিছু বাড়িতে মাটি দিয়ে ব্যাংক তৈরির কাজ করা হয়। আগে মাটির ব্যাংক তৈরি করে ভালোই চলত সংসার। বর্তমানে সংসার চালানো দায় হয়ে পারেছে। আমাদের আয়ের চেয়ে বাজারের নিত্যপ্রয়োজনীয় জিনিসের দাম বেশি। মাটির ব্যাংক তৈরি করে যদি ভালো লাভ হতো তাহলে হয়তো ছেলে-মেয়েদের এ শিল্পের সাথে জড়িয়ে রাখতাম।
প্রনপ পাল জানান, ছেলে-মেয়েরা স্কুলে পড়াশোনার পাশাপাশি পরিবারের সবাই এ কাজ করে। অন্য কাজ তো শিখিনি, তাই মাটির কর্ম ছাড়া উপায়ও নেই। ভিটেবাড়ি ছাড়া কোনো কৃষিজমিও নেই। অনেক আগে গ্রামের সবাই ব্যাংক তৈরি করত। তখন আমার বাবাও এ কাজ শিখে নেয়। আমি বাবার সাথে কাজ শিখে ফেলি। এখন এ কাজ করে সংসার চলে না, খেয়ে না খেয়ে থাকতে হয়।
ঢাকা কচুক্ষেত থেকে আগত এক পাইকারি বিক্রেতা সোলাইমান মিয়া জানান, ওই গ্রামের শতাধিক পরিবার মাটির ব্যাংক তৈরি করে সংসার চালায়। বর্তমান বাজারে এ পেশায় তাদের সংসার ঠিকঠাক চলে না। কারিগররা দাদন বা অগ্রিম টাকা নিয়েও চলতে পারছেন না। সরকারিভাবে অল্প সুদে যদি তাদের ঋণ দেওয়া যায় তবে খেটে খাওয়া মানুষগুলো একটু ভালো মতো চলতে পারত। প্রায় কমে যাওয়া মৃৎশিল্পের পেশাটিও টিকে থাকত।
কালিয়াকৈর উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা তাজওয়ার আকরাম সাকাপি ইবনে সাজ্জাদ জানান, কালিয়াকৈরর তৈরি মাটির ব্যাংকের সুনাম রয়েছে অনেক। প্রাচীন ঐতিহ্যকে ধরে রাখতে সরকারিভাবে ভালো মানের প্রশিক্ষণ দরকার। পাশাপাশি বিভিন্ন বেসরকারি সংস্থাগুলো স্বল্প সুদে ঋণ দিয়ে এগিয়ে এলে মৃৎশিল্প টিকে থাকবে।