জয়পুরহাট প্রতিবেদক
প্রকাশ : ১৩ ফেব্রুয়ারি ২০২৩ ০৯:০৯ এএম
প্রতীকী ছবি
দেশের সর্বশেষ জনশুমারির তথ্য অনুযায়ী, বিবাহবিচ্ছেদে দেশের মধ্যে শীর্ষে রয়েছে রাজশাহী বিভাগ। সেখানে এর হার দশমিক ৬১ শতাংশ। অথচ এই বিভাগের একটি জেলা জয়পুরহাটেই গত বছর গড়ে দিনে ১৪টি বিবাহ নিবন্ধিত হলেও তালাকের ঘটনাই ঘটেছে ১০টি। অর্থাৎ বিবাহের তুলনায় ৭১ শতাংশ তালাকের ঘটনা ঘটেছে। এর মধ্যে কন্যার দিক থেকে তালাকের সংখ্যা বেশি।
বিবাহবিচ্ছেদ বেড়ে যাওয়ার পেছনে মোবাইল ফোনে পরকীয়া, সন্দেহ, মানসিক অবসাদ, যৌতুক, দাম্পত্য কলহসহ নানামুখী চাপের পাশাপাশি পারিবারিক ও সামাজিক বন্ধন এবং যোগাযোগ কমে যাওয়াকে অন্যতম কারণ বলে মনে করছেন সমাজবিজ্ঞানীরা।
জেলা রেজিস্ট্রার কার্যালয় সূত্র জানায়, ২০২২ সালের জানুয়ারি থেকে ডিসেম্বর পর্যন্ত জেলার পাঁচটি উপজেলায় মোট পাঁচ হাজার ২৬০টি বিবাহ নিবন্ধিত হয়েছে। একই সময়ে আবার তিন হাজার ৭৩৬টি তালাক হয়েছে। এর মধ্যে বরপক্ষ থেকে তালাক ৭৭৩টি, কনেপক্ষ থেকে ১ হাজার ৪৭১টি এবং উভয় পক্ষ আপসরফায় তালাক হয়েছে ১ হাজার ৪৯২টি। বরপক্ষ থেকে তালাকের প্রায় দ্বিগুণ কন্যাপক্ষ থেকে।
জয়পুরহাট জেলায় ৩২টি ইউনিয়ন পরিষদ ও ৫টি পৌরসভা রয়েছে। প্রতিটি ইউনিয়ন ও পৌরসভাতে নিকাহ রেজিস্ট্রার রয়েছে। আইন মন্ত্রণালয়ের নিয়োগপ্রাপ্ত ৩৭ জন কাজী জেলায় বিবাহ ও তালাকনামা নিবন্ধন করছেন।
জয়পুরহাট জেলা রেজিস্ট্রার সহকারী আব্দুল খালেক বলেন, ‘২০২২ সালে বিবাহের তুলনায় ৭১ শতাংশ বিবাহবিচ্ছেদ হয়েছে। যা ২০১৯, ২০২০ বা ২০২১ সালেও এমন ছিল না। সে সময় ৪৫ থেকে ৫১ শতাংশ তালাক হয়েছে। তাই, গত এক বছরের বিবাহবিচ্ছেদের হার এ জেলার জন্য উদ্বেগজনক।’
জয়পুরহাট জেলা রেজিস্ট্রার শরীফ তোরাফ হোসেন প্রতিদিনের বাংলাদেশকে বলেন, ‘বছরে যে পরিমাণ বিবাহ হচ্ছে, তার চেয়ে তুলনামূলক তালাকই বেশি হচ্ছে। এ জেলায় যৌতুকের প্রথা বেশি। তা ছাড়া মোবাইল ফোনে অন্যত্র কথা বলা, সন্দেহ, আর্থিক বিষয়সহ নানা কারণে বিবাহবিচ্ছেদের ঘটনা ঘটছে।’
ব্র্যাকের জয়পুরহাট সদর অফিসের অ্যাসোসিয়েট অফিসার সন্ধ্যা তপ্ন বলেন, ‘আমরা কখনই বিবাহবিচ্ছেদের পক্ষে নই। নবদম্পতিকে আমরা গ্রুপের মাধ্যমে কাউন্সেলিং করি, যাতে তারা সংসার শুরু থেকে একে অপরের সঙ্গে কলহে না জড়ায়।’
ক্ষেতলাল উপজেলার সরকারি ছাঈদ আলতাফুন্নেছা কলেজের সমাজবিজ্ঞান বিভাগের প্রভাষক তানজির আহমেদ সাকিব বলেন, ‘সাম্প্রতিক সময়ে বিবাহবিচ্ছেদের অন্যতম কারণ হচ্ছে বাল্যবিবাহ। এই বয়সে মেয়েরা সংসারে নিজেদের সঙ্গে মানিয়ে চলতে পারে না। এ ছাড়া সামাজিক মাধ্যম, মোবাইল ফোন তাদের রঙিন জগতের স্বপ্ন দেখায়। এমন সব ফাঁদে পা দিয়ে তারা বিবাহবিচ্ছেদের মতো সিদ্ধান্ত নিয়ে ফেলে।’
জয়পুরহাট সরকারি মহিলা কলেজের সমাজবিজ্ঞানের প্রভাষক তাসলিমা খাতুন প্রতিদিনের বাংলাদেশকে বলেন, ‘নারীরা এখন ইমোশনালি অনেকটা স্বাধীন। বিবাহের পর তারা স্বামীর পরিবারের অনেক বিষয় মেনে নিতে পারে না। তা ছাড়া এই ডিজিটাল যুগে খুব সহজে অন্যের সঙ্গে কানেক্টিভ হওয়া যায়। সে সময় নারী বা পুরুষ ভবিষ্যতের চিন্তা করে না। টাইম পাস বা সাময়িক সুখ লাভের আশায় তারা অন্যের সঙ্গে যোগাযোগ করা শুরু করে। এটা তার পার্টনার (স্বামী বা স্ত্রী) মেনে নিতে পারে না। তখন তারা ডিভোর্সের সিদ্ধান্ত নেয়।
‘এ ছাড়া সমাজে যৌতুকপ্রথা কমে গেলেও সেটির সিস্টেম চালু আছে। যৌতুক না নিয়ে কিছু উপহার চেয়ে বসে। আর এটি ঘুরেফিরে যৌতুক হয়ে যায়। আবার অনেক ক্ষেত্রে যখন বাল্যবিবাহ হয়ে থাকে বিবাহের কিছু পরে স্বামী-স্ত্রীর মধ্যে একটা কলহের সৃষ্টি হয়, আর তা থেকেই ডিভোর্স।’
রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের সমাজবিজ্ঞান বিভাগের সভাপতি অধ্যাপক বিজয় কৃষ্ণ বণিক বলেন, ‘বর্তমানে বিবাহবিচ্ছেদের অন্যতম কারণ সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের অতিরিক্ত ব্যবহার। দিন দিন সামাজিক প্রেক্ষাপট চেঞ্জ হচ্ছে। মানুষ অর্থের পেছনে ছুটছে। অদৃশ্যশক্তির পেছনে দৌড়াচ্ছে। আগের দিনে মানুষ বিষণ্নতায় থাকত। কিন্তু এখন সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম সেটি করতে দেয় না।
‘মানুষ চায় সারা দিন ব্যস্ত থাকতে, পরিবারে সময় দিতে চায় না। আগের দিনে বিবাহবিচ্ছেদের কথা পরিবারকে জানাতে হতো, গ্রাম্য সালিশ হতো। সেটি মীমাংসাও হতো। অনেক পরে ডিভোর্সের চিন্তা হতো। এখন কিছু হলেই তালাকের সিদ্ধান্ত। কারও প্রতি কারও দায়বদ্ধতা নেই।’