× ই-পেপার প্রচ্ছদ সর্বশেষ বাংলাদেশ রাজনীতি দেশজুড়ে বিশ্বজুড়ে বাণিজ্য খেলা বিনোদন মতামত চাকরি শিক্ষা আজকের কার্টুন ফিচার সকল বিভাগ ছবি ভিডিও লেখক আর্কাইভ কনভার্টার

টানেল ঘিরে দখলের উৎসব

এস এম রানা, চট্টগ্রাম

প্রকাশ : ০২ ফেব্রুয়ারি ২০২৩ ১২:৪৫ পিএম

আপডেট : ০২ ফেব্রুয়ারি ২০২৩ ১৩:৫৮ পিএম

আনোয়ারা প্রান্তে উড়াল সড়কের নিচের জমি ভরাট ও খুঁটি পুঁতে সীমানা নির্ধারণ করছেন উপজেলা আওয়ামী লীগের অর্থ সম্পাদক আনোয়ার হোসেন। প্রবা ফটো

আনোয়ারা প্রান্তে উড়াল সড়কের নিচের জমি ভরাট ও খুঁটি পুঁতে সীমানা নির্ধারণ করছেন উপজেলা আওয়ামী লীগের অর্থ সম্পাদক আনোয়ার হোসেন। প্রবা ফটো

অপেক্ষার পালা ফুরাচ্ছে। করোনা মহামারিসহ নানা প্রতিবন্ধকতা পেরিয়ে চট্টগ্রামের কর্ণফুলী নদীর তলদেশে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান টানেলের নির্মাণকাজ শেষের পথে। আগামী মার্চ নাগাদ টানেল চালুর লক্ষ্যে চলছে শেষ পর্যায়ের কর্মযজ্ঞ।

দেশের যোগাযোগব্যবস্থায় এই টানেল যুক্ত করবে নতুন মাত্রা। বাণিজ্যিক ও অর্থনৈতিক গুরুত্বের কারণে দেশের প্রথম টানেল নিয়ে আগ্রহ-উচ্ছ্বাস দেশজুড়ে। তবে চট্টগ্রামের আনোয়ারা উপজেলার মানুষের কাছে বঙ্গবন্ধু টানেলের মাহাত্ম্য অন্যদের চেয়ে আরও অনেক বেশি। কারণ সড়কপথে সংযুক্তির অভাবে বন্দরনগরী লাগোয়া এই অঞ্চলটি উন্নয়নের আড়ালে পড়ে ছিল সব সময়।

টানেল চালুর পর আনোয়ারার মানুষের সেই আক্ষেপ ঘুচবে- বর্ধিত হবে বন্দরনগরীর পরিধি, ব্যবসা-বাণিজ্যের নতুন প্রাণকেন্দ্র হয়ে উঠবে আনোয়ারা। তাই এ উপজেলা ঘিরে বাড়ছে অর্থনৈতিক ও বাণিজ্যিক কর্মকাণ্ড। গড়ে উঠছে বাণিজ্যিক স্থাপনা, ভারী শিল্পকারখানা। সেই সূত্রে আনোয়ারার জমির দাম ও চাহিদা বাড়ছে প্রতিনিয়ত। 

এই সুযোগ কাজে লাগিয়ে আনোয়ারায় জমি দখলের প্রতিযোগিতায় নেমেছে প্রভাবশালী কয়েকটি চক্র। এসব চক্রে আছেন ক্ষমতাসীন দলের স্থানীয় পর্যায়ের নেতা, ব্যবসায়ী-শিল্পপতিসহ অনেকেই। খাস জমি থেকে শুরু করে সরকারি বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের জমি; এমনকি সমুদ্রসৈকতও রক্ষা পাচ্ছে না দখলদারদের হাত থেকে। বিশেষ করে পানি উন্নয়ন বোর্ডের জমির দিকেই দখলদারদের নজর বেশি।

দখল করা জমিতে গড়ে উঠছে বিনোদন পার্ক, মাছের ঘেরসহ আবাসিক ও বাণিজ্যিক বহু স্থাপনা। সবার চোখের সামনেই চলছে দখলদারের দৌরাত্ম্য, অথচ প্রশাসনিক পর্যায়ে তা ঠেকানোর কোনো তৎপরতা নেই। সরকারি পর্যায়ে বাধা না পেয়ে দখলদারেরা হয়ে উঠছেন আরও বেপরোয়া। দখল করা জমি বেশি দামে বিক্রির পাঁয়তারা চালাচ্ছেন অনেকে। কেউ কেউ দখল করেই ক্ষান্ত হননি; দখলি জমির মাটি কেটে বিক্রিও করছেন। আবার কর্তৃত্ব পোক্ত করতে প্রাচির দিয়ে সমুদ্রসৈকত ঘিরে ফেলেছেন অনেক দখলদার। প্রতিদিনের বাংলাদেশের অনুসন্ধানে যে চিত্র উঠে এসেছে, তা দেখে মনে হয় আনোয়ারা ঘিরে যেন দখলের উৎসব চলছে। 

বিষয়টি নিয়ে আলাপকালে কয়েকজন দখলের বিষয়টি স্বীকারও করেছেন। তারপরও তাদের বিরুদ্ধে প্রশাসনিক ব্যবস্থা কেন নেওয়া হচ্ছে না জানতে চাইলে আনোয়ারা উপজেলার সহকারী কমিশনার (ভূমি) ও নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেট মুহাম্মদ আবদুল্লাহ আল মুমিন প্রতিদিনের বাংলাদেশকে বলেন, ‘কোথায় দখল হচ্ছে সেই তথ্য সুনির্দিষ্টভাবে দিন। সুনির্দিষ্ট তথ্য পেলে দখলদারদের বিরুদ্ধে অবশ্যই আইনি ব্যবস্থা নেওয়া হবে।’ 

দখলে দৌরাত্ম্য যাদের

আনোয়ারা প্রান্তে বঙ্গবন্ধু টানেল থেকে বেরিয়ে মূল সড়কে ওঠার জন্য নির্মাণ করা হয়েছে ৭০০ মিটার দীর্ঘ একটি ফ্লাইওভার। এই ফ্লাইওভারের নিচের জমি দখল করে সাইনবোর্ড টানিয়েছেন আনোয়ার হোসেন নামে এক ব্যক্তি। তিনি আনোয়ারা উপজেলা আওয়ামী লীগের অর্থ সম্পাদক। ফ্লাইওভারের নিচে বন্দর পুলিশ ফাঁড়ির পাশে পানি উন্নয়ন বোর্ডের (পাউবো) জমিও মাটি কেটে দখলে নিয়েছেন। জমিতে টানানো সাইনবোর্ডের তথ্য অনুযায়ী, বায়না সূত্রে আনোয়ার এখানকার ১২৩ শতক জমির মালিক। অথচ দখল করা জমিসহ পুরো এলাকায় তিনি এখন ঘেরবেড়া নির্মাণ করছেন। 

দখলের ব্যাপারে জানতে চাইলে আওয়ামী লীগ নেতা আনোয়ার হোসেন অবলীলায় তা স্বীকার করেছেন। প্রতিদিনের বাংলাদেশকে তিনি বলেন, ‘আমি সেখানে জমি ক্রয় করেছি। এর পাশে মাত্র ১০ গণ্ডার মতো জমি পানি উন্নয়ন বোর্ডের। এখানে অনেকেই জমি দখল করেছেন। সরকার যখন অন্য দখলদারদের উচ্ছেদ করবে, তখন আমিও দখল ছেড়ে দেব।’ 

পুলিশ ফাঁড়ির জায়গা দখলের পরও প্রশাসন কেন নির্বিকার- এ প্রশ্নের সরাসরি কোনো জবাব মেলেনি চট্টগ্রাম মহানগর পুলিশের কাছে। তবে নাম প্রকাশ না করার শর্তে সংশ্লিষ্ট একজন কর্মকর্তা জানান, ফাঁড়ির কাছে জমি দখলের পর আনোয়ারকে মৌখিকভাবে নিষেধ করা হলে তিনি সীমানা কিছুটা সরিয়ে নেন। এই কর্মকর্তা আরও জানান, ওই জমির মালিক পাউবো। তারা আইনি ব্যবস্থা না নেওয়ায় পুলিশের এ ব্যাপারে কিছু করার নেই। 

কর্মকর্তাদের নীরব ভূমিকায় পানি উন্নয়ন বোর্ডের জমির ব্যাপারে দখলদারদের আগ্রহের অন্ত নেই। বঙ্গোপসাগরের তীরে পার্কি সমুদ্রসৈকতের কাছে বেড়িবাঁধ নির্মাণ করেছে পাউবো। বাঁধের মুখে মাটি কেটে আলাদা বাঁধ বানিয়ে মাছের খামার বানিয়েছেন সিপিডিএল নামে চট্টগ্রামের একটি আবাসন প্রতিষ্ঠানের চেয়ারম্যান ইফতেখার হোসেন। এর আগে সেখানে কিছু জায়গাও কিনেছেন তিনি। এরপর মাছের ঘের বানানোর নাম করে সাগর তীরের জমি দখলে নিয়ে প্রাচীর দিয়ে ঘিরে দিয়েছেন তিনি। ইফতেখারের মাছের খামারের উত্তর পাশে আরেকটি বাঁধ বানিয়েছেন জাইম আহমেদ নামে এক ব্যক্তি। এই বাঁধ নির্মাণের জন্য বঙ্গোপসাগর থেকে মাটি ও সৈকত থেকে বালু উত্তোলন করেছেন তিনি। বালু উত্তোলন করায় কিছুদিন আগেই উপজেলা প্রশাসনের পক্ষ থেকে জাইম আহমেদকে ৫০ হাজার টাকা জরিমানাও করা হয়। 

চট্টগ্রামের আনোয়ারা উপজেলায় বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান টানেলের অদূরে পার্কিং সমুদ্রসৈকত এলাকায় বঙ্গোপসাগরের তীর দখল করে গড়ে তোলা হয়েছে স্থাপনা ও মাছের ঘের। প্রবা ফটো

সাগরের তীর দখলের বিষয়ে জানতে ইফতেখার হোসেনের মোবাইল ফোনে ও হোয়াটসঅ্যাপে বারবার কল ও বার্তা পাঠিয়েও সাড়া মেলেনি। জাইম আহমেদ বিদেশে থাকায় তার বক্তব্য পাওয়া যায়নি। তার জমি চাষাবাদ করেন স্থানীয় চাষি নুরুল আনোয়ার। প্রতিদিনের বাংলাদেশকে তিনি বলেন, ‘এখানে জাইম আহমেদের জমি ছিল ৪০ কানি। সাগরে বিলীন হওয়ার পর অবশিষ্ট আছে আনুমানিক ১৩ কানি।’ সৈকত থেকে বালু উত্তোলনের বিষয়ে জানতে চাইলে নুরুল বলেন, তিনি জানতেন, সাগরের দিকে অনেক দূর পর্যন্ত জাইম আহমেদের মালিকানাভুক্ত জমি রয়েছে। সাগর থেকে বালু তোলা যায় না এটা তার জানা ছিল না। 

গত কয়েক দিন আনোয়ারা উপজেলায় সরেজমিন অনুসন্ধান চালিয়ে এবং স্থানীয়দের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, টানেলের মুখ থেকে পার্কি সমুদ্রসৈকত পর্যন্ত অন্তত তিন কিলোমিটার এলাকাজুড়ে দখলের উৎসব চলছে। খাস জমি থেকে শুরু করে সাগরের বাঁধের জমিও দখলদারের হাত থেকে রেহাই পাচ্ছে না। ফুলতলী, রাঙ্গাদিয়া, মাঝের চর ও পশ্চিম তুলাতলী মৌজার অন্তত দুই হাজার একর খাস জমি দখলে চলছে নানা পাঁয়তারা। শুধু জমি দখল নয়, জমি থেকে মাটি কেটেও বিক্রি করছেন অনেকে। 

জাইম আহমেদের জমির পাশেই লুসাই পার্ক নামে একটি বিনোদনকেন্দ্র নির্মাণ করা হয়েছে। যৌথ বিনিয়োগের মাধ্যমে এ পার্ক নির্মাণ করছেন আনোয়ারা উপজেলা আওয়ামী লীগের সদস্য ও বারশত ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান এমএ কাইয়ুম শাহ। তার পার্কের ভেতরেও রয়েছে পানি উন্নয়ন বোর্ডের জমি। বিষয়টি অস্বীকার করেননি কাইয়ুম নিজেও।

প্রতিদিনের বাংলাদেশকে তিনি বলেন, ‘ওই এলাকায় পানি উন্নয়ন বোর্ডের জমি কমবেশি অনেকেই দখল করেছেন। সেই হিসেবে লুসাই পার্কের ভেতরেও কিছু জমি আছে।’ 

লুসাই পার্কের অদূরে টানেলের সার্ভির এরিয়ার পাশে ৮৬ গণ্ডা জমি কিনেছেন আনোয়ারা উপজেলা আওয়ামী লীগের সাবেক সাধারণ সম্পাদক এমএ আবদুল মালেক ও সদস্য মোজাম্মেলসহ কয়েকজন। তাদের সঙ্গে যুক্ত আছে পুলিশের একজন সদস্যও। এখানে কাইয়ুম শাহেরও কিছু জমি রয়েছে। এই চক্রটি কেনা জমির পাশের আরও কয়েক কানি দখল করে বাঁধ নির্মাণ করছেন। এরপর সাগর থেকে বালু তুলে সেই জায়গা ভরাটের চিন্তা রয়েছে তাদের। 

এ ব্যাপারে জানতে চাইলে কাইয়ুম শাহ বলেন, ‘সেখানে আমি নিজের নামে জমি ক্রয় করিনি। ভাগিনা গিয়াস উদ্দিনের নামে ক্রয় করেছি। কয়েকজন মালিক আছেন ওই জমিতে। এখন যেখানে বাঁধ নির্মিত হচ্ছে, সেখানে কিছু খাস জমি থাকতে পারে।’ 

এ ছাড়া কোরিয়ান ইপিজেড গেট-সংলগ্ন কর্ণফুলী তীরে ড্রেজার বসিয়ে নদীর বালু ও মাটি কেটে বিক্রি করছেন মেসার্স হাসান বিল্ডার্স নামে একটি প্রতিষ্ঠান। তবে ওই প্রতিষ্ঠানের মালিক মোহাম্মদ হাসানের দাবি, তিনি মাটি বিক্রির সঙ্গে জড়িত নন। তার একটি ড্রেজার রয়েছে। সেটি দিয়ে চট্টগ্রাম বন্দর চ্যানেলের বালু এক জায়গায় স্তূপ করা হয়।

এভাবে জমি দখল হয়ে যাওয়ার পরও উদ্ধারের উদ্যোগ না নেওয়ার বিষয়ে জানতে চাইলে চট্টগ্রাম পানি উন্নয়ন বোর্ড-১-এর নির্বাহী প্রকৌশলী নূরুল আবছার আজাদ প্রতিদিনের বাংলাদেশকে বলেন, তিনি মাত্র এক মাস আগে এখানে যোগ দিয়েছেন। আপাতত ঢাকায় আছেন। এ বিষয়ে বিস্তারিত না জেনে মন্তব্য করতে পারবেন না। 

পাউবোর বেঁড়িবাধ এলাকা তদারকির দায়িত্বে থাকা কয়েকজন কর্মকর্তা জানান, তারা একবার দখলদারদের উচ্ছেদের উদ্যোগ নিয়েছিলেন। এ বিষয়ে স্থানীয় রাজনৈতিক মহলের সহায়তা চাওয়া হলে কর্মকর্তাদের বলা হয়, এ ছাড়া কী তাদের আর কোনো কাজ নেই? মূলত এরপর থেকে দখল উচ্ছেদের উদ্যোগ কার্যত বন্ধ হয়ে গেছে। এখন আর কর্মকর্তারা এ নিয়ে মাথা ঘামান না। 

শেয়ার করুন-

মন্তব্য করুন

Protidiner Bangladesh

সম্পাদক : মারুফ কামাল খান

প্রকাশক : কাউসার আহমেদ অপু

রংধনু কর্পোরেট, ক- ২৭১ (১০ম তলা) ব্লক-সি, প্রগতি সরণি, কুড়িল (বিশ্বরোড) ঢাকা -১২২৯

যোগাযোগ

প্রধান কার্যালয়: +৮৮০৯৬১১৬৭৭৬৯৬ । ই-মেইল: [email protected]

বিজ্ঞাপন (প্রিন্ট): +৮৮০৯৬১১৬৭৭৮১০, +৮৮০১৮৮০৭৪৪৫৮০ | ই-মেইল: [email protected]

বিজ্ঞাপন (অনলাইন): +৮৮০১৮৮০৭৪৪৫৮০, +৮৮০১৭৯৯৪৪৯৫৫৯ । ই-মেইল: [email protected]

সার্কুলেশন: +৮৮০৯৬১১৬৭৭৮০৭, +৮৮০১৮৮০৭৪৪৩৩২ । ই-মেইল: [email protected]

বিজ্ঞাপন মূল্য তালিকা