সিলেট সিটি নির্বাচন
চয়ন চৌধুরী, সিলেট
প্রকাশ : ১৮ জানুয়ারি ২০২৩ ২২:৩৪ পিএম
আরিফুল হক চৌধুরী।
চলমান সরকারবিরোধী আন্দোলনের অংশ হিসেবে কুমিল্লার পর রংপুর সিটি নির্বাচন বর্জন করেছে বিএনপি। চলতি বছরের জুলাই-আগস্টে সিলেট সিটি করপোরেশন (সিসিক) নির্বাচন হওয়ার কথা রয়েছে। হঠাৎ করে রাজনৈতিক অবস্থান পরিবর্তন না হলে আগামী অক্টোবরে মেয়াদোত্তীর্ণ হতে চলা সিসিক নির্বাচনও বর্জন করবে বিএনপি। এতে দলটির জাতীয় নির্বাহী কমিটির সদস্য আরিফুল হক চৌধুরীর সিসিক মেয়র হওয়ার হ্যাটট্রিক মিশন অনিশ্চয়তায় পড়েছে। বিরূপ পরিস্থিতির মধ্যে টানা দুবারের মেয়র আরিফ আসন্ন নির্বাচনে কী করবেন, তা নিয়ে স্থানীয় রাজনীতির মাঠে ব্যাপক আলোচনা রয়েছে। দলীয় সিদ্ধান্তের বাইরে গিয়ে মেয়র পদে তার প্রার্থিতার সম্ভাবনা নিয়ে আওয়ামী লীগেও নানা হিসাব-নিকাশ চলছে।
২০১৩ সালে ‘পরিবর্তনের’ স্লোগান তুলে সিসিকের ‘জননন্দিত’ প্রথম মেয়র বদর উদ্দিন আহমদ কামরানকে পরাজিত করে আরিফ প্রথমবার চমক দেখান। ২০১৮ সালে আওয়ামী লীগ নেতা (প্রয়াত) কামরানকে ৬ হাজারেরও বেশি ভোটে পরাজিত করে টানা দ্বিতীয়বারের মতো মেয়র হন তিনি। ওই নির্বাচনে দলীয় বিদ্রোহী প্রার্থীর পাশাপাশি জোট শরিক জামায়াতের প্রার্থিতাও মেয়র আরিফের বিজয়রথে কাঁটা হতে পারেনি। এই সুবাদে জাতীয় রাজনীতির আলোচনায় উঠে আসেন আরিফ। মর্যাদাপূর্ণ সিলেট-১ (সদর-নগর) আসনের সেই সময়ের এমপি, সাবেক অর্থমন্ত্রী আবুল মাল আবদুল মুহিতের সঙ্গে তার সম্পর্কও নজর কাড়ে। প্রয়াত মুহিতের ছোটভাই বর্তমান পররাষ্ট্রমন্ত্রী ড. এ কে আব্দুল মোমেনের সঙ্গেও মেয়রের ‘বোঝাপড়া’ ভালো।
‘অপরিকল্পিত উন্নয়নের’ অভিযোগ থাকলেও সরকারের বিপুল বরাদ্দে নগরীতে নানা উন্নয়ন কর্মকাণ্ডের মাধ্যমে নিজের আলাদা অবস্থান গড়ে তুলেছেন মেয়র আরিফ। ফলে বিএনপির আরও কয়েকজন নেতা আগামীতে মেয়র পদে প্রতিদ্বন্দ্বিতার স্বপ্ন দেখলেও সম্ভাবনায় আরিফ এগিয়ে রয়েছেন বলে স্থানীয় আওয়ামী লীগের নেতারাই মানছেন। মহানগর আওয়ামী লীগের সম্পাদকমণ্ডলীর একজন সদস্য বলেছেন, নির্বাচন নিয়ে বিরোধী দলগুলো নানা অভিযোগ তোলে। কিন্তু সিলেটে আরিফ দুই দফা বিজয়ী হয়েছেন, যা তাদের অভিযোগকে মিথ্যা প্রমাণ করে। মেয়র আরিফের জনপ্রিয়তার কথা স্বীকার করে ওই নেতা বলেন, আওয়ামী লীগে নতুন কেউ মনোনয়ন পাবেন। আরিফ প্রতিদ্বন্দ্বিতা করলে একরকম, না করলে আরেকরকম হবে।
গত ১১ জানুয়ারি বিএনপির স্থায়ী কমিটির সদস্য গয়েশ্বর চন্দ্র রায় সিলেটে দলের গণঅবস্থান কর্মসূচিতে দাবি আদায় না হওয়া পর্যন্ত নির্বাচন বর্জনের কথা পুনর্ব্যক্ত করেন। একই অনুষ্ঠানে মহানগর বিএনপির সদস্য সচিব মিফতাহ সিদ্দিকী বলেন, ‘বিএনপির চলমান আন্দোলনের মূল দাবি নিরপেক্ষ সরকারের অধীনে জাতীয় সংসদ নির্বাচন। এই দাবি পূরণ না হওয়া পর্যন্ত দল কোনো নির্বাচনে যাবে না। এখন পর্যন্ত সিলেট সিসিক নির্বাচন নিয়ে আনুষ্ঠানিকভাবে আলোচনা হয়নি। তবে নির্বাচনে অংশ নিলে অনেকেই মনোনয়ন চাইবেন। বর্তমান পরিস্থিতিতে দলীয়ভাবে নির্বাচনে অংশ নেওয়ার সুযোগ নেই। এখন কেউ নির্বাচন করতে চাইলে নিজস্বভাবে করতে হবে। যতটুকু জানি, দল নির্বাচনে না গেলে বা কাউকে মনোনয়ন না দিলে মেয়র পদে কেউ প্রার্থী হবেন না।’
অবশ্য দলীয়ভাবে সিসিক নির্বাচনে অংশ নিলে সিলেট বিএনপিতেও সম্ভাব্য প্রার্থীর অভাব হবে না! আরিফের পাশাপাশি বিএনপির হয়ে নির্বাচন করতে আগ্রহী প্রার্থীর সংখ্যা হাফ ডজনেরও বেশি। এদের মধ্যে মহানগর বিএনপির আহ্বায়ক আবদুল কাইয়ুম জালালী পংকি, যুগ্ম আহ্বায়ক রেজাউল হাসান লোদী কয়েস ও ফরহাদ চৌধুরী শামীম, সদস্য সচিব মিফতাহ সিদ্দিকী মনোনয়নপ্রত্যাশী হিসেবে আলোচনায় রয়েছেন। ২০১৮ সালের সর্বশেষ নির্বাচনে মেয়র পদে প্রার্থী হয়েছিলেন মহানগরের সাবেক সাধারণ সম্পাদক বদরুজ্জামান সেলিম। শেষ পর্যন্ত দলের চাপে আরিফকে সমর্থন দিয়ে প্রচারণা বন্ধ রাখলেও সময়মতো মনোনয়ন প্রত্যাহার না করায় ব্যালটে তার নাম ছিল। এ ছাড়া মহানগরের সাবেক সভাপতি নাসিম হোসাইনও মনোনয়ন চাইবেন।
২০১৮ সালের ৮ অক্টোবর দ্বিতীয় মেয়াদে মেয়রের দায়িত্ব নেওয়ার আগে যুক্তরাজ্য সফরে গিয়ে বিএনপির ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান তারেক রহমানের সঙ্গে সাক্ষাৎ করেন আরিফ। সর্বশেষ গত বছরের মে মাসে আবারও তারেকের সঙ্গে যুক্তরাজ্যে সাক্ষাৎ করেন তিনি। সিসিক নির্বাচনকে সামনে রেখে তাদের মধ্যে কথা হয় বলে স্থানীয় বিএনপিতেও নানা আলোচনা হয়। যদিও সেই সময়ের মতো এখনও আসন্ন সিসিক নির্বাচন নিয়ে ‘আপাতত’ কোনো মন্তব্য করছেন না আরিফ। দলীয় সিদ্ধান্ত অনুযায়ী সময়মতো সবকিছু পরিষ্কার হবে বলে প্রতিদিনের বাংলাদেশকে জানিয়েছেন তিনি। তবে দল নির্বাচনে অংশ না নিলে তিনি প্রতিদ্বন্দ্বিতা করবেন না বলে মেয়রের ঘনিষ্ঠ একজন বিএনপি নেতা জানিয়েছেন।