× ই-পেপার প্রচ্ছদ সর্বশেষ বাংলাদেশ রাজনীতি দেশজুড়ে বিশ্বজুড়ে বাণিজ্য খেলা বিনোদন মতামত চাকরি শিক্ষা আজকের কার্টুন ফিচার সকল বিভাগ ছবি ভিডিও লেখক আর্কাইভ কনভার্টার

জালের প্রতিটি পাকে মিশে আছে শিশুর কষ্ট

নোয়াখালী প্রতিবেদক

প্রকাশ : ০৭ জানুয়ারি ২০২৩ ১৪:৫০ পিএম

আপডেট : ০৯ জানুয়ারি ২০২৩ ১১:১১ এএম

জাল হাতে মাছ ধরছে শিশু হৃদয়। ছবি : প্রবা

জাল হাতে মাছ ধরছে শিশু হৃদয়। ছবি : প্রবা

যে হাতে থাকার কথা ছিল বই-খাতা, সে হাতে মাছ ধরার জাল। যে হাতে ছবি আঁকার কথা ছিল, সে হাতে ধরতে হচ্ছে বৈঠা। যে চোখ স্বপ্ন দেখত রুপালি আগামীর, সে চোখই এখন জেলে হওয়ার স্বপ্নে বিভোর। জালের প্রতিটি পাকে মিশে আছে শিশুর কষ্ট।

হেসেখেলে আনন্দ-উল্লাসে যাদের দিন কাটার কথা আজ তারাই হাল ধরছে সংসারের। এতে শিক্ষা ও অধিকার থেকে বঞ্চিত হচ্ছে তারা। অর্থাভাবে জেলে হওয়ার স্বপ্ন দেখছে নোয়াখালীর দ্বীপ উপজেলা হাতিয়ার প্রান্তিক শিশুরা।

হাতিয়ার চেয়ারম্যান ঘাটে কথা হয় ১২ বছরের শিশু আবদুল্লাহর সঙ্গে। বর্তমানে কোন শ্রেণিতে থাকার কথা তা তার জানা নেই। সে বলে, ‘আমি কোন ক্লাসে পড়তাম জানি না। মাছ ধরে আমার সংসার চলে। গরিব মানুষ ভাই, নৌকা ছাড়া আর কিছু বাইতে জানি না, পড়ালেখা করতে জানি না।’

হৃদয় নামে ১৪ বছরের এক কিশোর বলে, ‘আমি মাদ্রাসায় পড়ালেখা করেছি। এখন যদি পড়তাম তাহলে দশম শ্রেণিতে থাকতাম। পেটের দায়ে নদীতে এসেছি। পড়ালেখা করে কী লাভ! আগে তো পেট বাঁচাতে হবে। আমার সংসারে আমি বড় ছেলে। বাবা নাই, তাই চার সদস্যের সংসার আমাকে দেখতে হয়। আমি মাছ ধরে যে টাকা পাই তা দিয়েই সংসার চলে।’

হৃদয়ের চাচা মনু মাঝি বলেন, ‘সংসারে অভাব দেখে হৃদয় পড়ালেখা বাদ দিয়ে মাছ ধরে। ওর বাবা ওদের ফেলে চলে গেছে। তাই পড়ালেখা না করে মাছ ধরতে হয়।’

আট বছরের শরিফুল জানায়, তার পড়ালেখা করতে ভালো লাগে না। কাজ করতে ভালো লাগে, মাছ ধরতে ভালো লাগে। তাই স্কুলে না গিয়ে মাছ ধরে।

১২ মাস নদীতে বসবাস করেন জরিমন বেগম। দুই ছেলে, এক মেয়ে নিয়ে নদীতে মাছ ধরে জীবিকা নির্বাহ করতে হয় তার। বড় ছেলে পিন্টু বলে, ‘বানতুফানে আমরা নদীতে বাস করি। বাড়িতে থেকে পড়ালেখা করব এমন ঠাঁই আমাদের নাই। যত ঝড়বৃষ্টিই আসুক নদীতে থেকেই জীবন চালাতে হয় আমাদের।’

জরিমন বেগম বলেন, ‘আজীবন আমাদের কষ্টে কষ্টে দিন যাইতেছে। আমাদের কোনো সুখ নাই। কালকে আমাদের পোলাপান হইলেও সেই পোলাপান নিয়ে আমরা গাঙ্গে বাস করি। নদী ভেঙে যাদের ঘরবাড়ি চলে যায় আমরা তাদের থেকেও খারাপ। আমাদের পোলাপানরে পড়াইতে পারি না। খাইতে লইতে পারি না আবার পোলাপাইন পড়ামু কেমনে? পড়ালেখা করানোর তৌফিক আমাদের নাই।’

হাতিয়া উপজেলার উপকূলীয় এলাকার অধিকাংশ শিশু মাছ ধরার পেশায় জড়িত। পরিবারের অভাবের কারণেই শিশুরা এ পেশায় যুক্ত হচ্ছে। যে সময় শিশুদের স্কুলে থাকার কথা, সে সময় তারা নদী কিংবা সাগরে মাছ ধরতে ব্যস্ত। প্রশাসনের পক্ষ থেকে বলা হচ্ছে, এসব শিশুকে স্কুলে ফেরাতে সরকারের পক্ষ থেকে উপবৃত্তিসহ নানা ব্যবস্থা রয়েছে। তবে মাছ ধরার কাজে জড়িত শিশুদের কোনো পরিসংখ্যান নেই উপজেলা মৎস্য অফিসে।

সাইফুল ইসলাম নামে এক জেলে বলেন, ‘আমাদের এখানে স্কুল কম। স্কুল কম হওয়ায় কিছু ছেলে যায় আবার কিছু যায় না। কয়েকদিন গেলে টাকাপয়সার জন্য নদীতে চলে আসে। নদীতে আসলে দিনে ২০০ টাকা করে হলেও মাসে ৬ হাজার টাকা। সংসার চলে এই টাকায়।’

বেলাল নামে আরেক জেলে বলেন, ‘পরিবারে কর্ম করার কেউ নাই। অভাবের সংসার, গরিব মানুষ তাই সংসার চালাতে হবে। বাধ্য হয়ে নদীতে বাইতে শিখছে। যদি অভাব না থাকত তাহলে উপরে থাকত। নদীতে আসতে হইত না।’

নিঝুমদ্বীপ ইউনিয়নের শতফুল সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের সহকারী শিক্ষক মোজাক্কের হোসেন রতন প্রতিদিনের বাংলাদেশকে বলেন, ‘যে বয়সে ছাত্রছাত্রীরা বা ছোট বাচ্চারা বই-খাতা নিয়ে প্রাইমারি স্কুলে বা পড়ালেখার জায়গায় থাকবে সেই বয়সে তারা জাল-নৌকাসহ জীবনের ঝুঁকি নিয়ে মাছ ধরে জীবিকা নির্বাহ করার চেষ্টা করে। তখন তাদের জীবন নিম্নগামী হয় এবং ভবিষ্যৎ বলতে কিছু থাকে না।'

হরণী ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান মো. আখতার হোসাইন বলেন, ‘যে ছেলেরা প্রাইমারি অথবা নুরানি মাদ্রাসায় লেখাপড়ার কথা ছিল তারা এখন জেলের কাজে জড়িত হয়ে গেছে। কেউ ভাত রান্না করে, কেউ জালের আবর্জনা পরিষ্কার করে। দারিদ্র্য ও পেটের ক্ষুধার কারণে এসব মাসুম বাচ্চা জেলের কাজে আসছে। আমাদের অনেক জায়গা নদীগর্ভে বিলীন হয়ে গেছে। ঘরবাড়ি-স্কুলসহ গুরুত্বপূর্ণ নানান স্থাপনা বিলীন হয়ে গেছে। ফলে তারা বেড়ির কূলে যাযাবর জীবনযাপন করছে। এসব পরিবারের শিশুরা জেলেকাজে জড়িত হচ্ছে।’

হাতিয়া উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা মো. সেলিম হোসেন বলেন, ‘সবাই যেন শিক্ষার আওতায় আসে সেজন্য জাতির জনক বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের কন্যা মাননীয় প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার উপবৃত্তিসহ নানান কর্মসূচি রয়েছে। এমনকি আমাদের হাতিয়া উপজেলায় প্রাথমিকে শতভাগ উপবৃত্তি দেওয়া হয়; যা দেশের অনেক উপজেলায় নেই।’

তিনি আরও বলেন, ‘আমরা খবর পেয়েছি অনেক শিক্ষার্থী ঝরে পড়েছে এবং শিশুশ্রমে যুক্ত হয়েছে। জনপ্রতিনিধিসহ সংশ্লিষ্টদের সঙ্গে কথা বলে যারা মাছ ধরার কাজে রয়েছে তাদের বিদ্যালয় ফেরাতে চেষ্টা করব। সবাইকে উপবৃত্তির আওতায় নিয়ে আসব। পাশাপাশি আমি কথা দিচ্ছি, উপজেলা প্রশাসন থেকেও যাদের আর্থিক সমস্যা রয়েছে সে সমস্যা সমাধানের চেষ্টা করা হবে। আশা করি, এতে হাতিয়ায় ঝরে পড়া শিক্ষার্থী ও শিশুশ্রম শূন্যের কোঠায় চলে আসবে।’

জেলা প্রাথমিক শিক্ষা অফিসার ফেরদৌসী বেগম বলেন, ‘শিক্ষার সঙ্গে শিশুদের সম্পৃক্ত রাখতে সরকারের নানামুখী কর্মসূচি রয়েছে। তবে এসব বাস্তবায়নে নদী ভাঙন ও দুর্গম চরাঞ্চল এলাকায় আমাদের কিছু সীমাবদ্ধতাও রয়েছে। ভাঙনকবলিত এলাকার শিশুরা পরিবারের অভাবের কারণে বিদ্যালয়ে আসার সুযোগ হয় না। সেখানে এনজিওসহ বেসরকারি কিছু কর্মসূচি রয়েছে। অভিভাবকদের সচেতনতার পাশাপাশি সরকারের “সবার জন্য শিক্ষা” বাস্তবায়নে প্রণোদনা দেওয়া যায় কি না দেখা উচিত।’

শেয়ার করুন-

মন্তব্য করুন

Protidiner Bangladesh

সম্পাদক : মারুফ কামাল খান

প্রকাশক : কাউসার আহমেদ অপু

রংধনু কর্পোরেট, ক- ২৭১ (১০ম তলা) ব্লক-সি, প্রগতি সরণি, কুড়িল (বিশ্বরোড) ঢাকা -১২২৯

যোগাযোগ

প্রধান কার্যালয়: +৮৮০৯৬১১৬৭৭৬৯৬ । ই-মেইল: [email protected]

বিজ্ঞাপন (প্রিন্ট): +৮৮০৯৬১১৬৭৭৮১০, +৮৮০১৮৮০৭৪৪৫৮০ | ই-মেইল: [email protected]

বিজ্ঞাপন (অনলাইন): +৮৮০১৮৮০৭৪৪৫৮০, +৮৮০১৭৯৯৪৪৯৫৫৯ । ই-মেইল: [email protected]

সার্কুলেশন: +৮৮০৯৬১১৬৭৭৮০৭, +৮৮০১৮৮০৭৪৪৩৩২ । ই-মেইল: [email protected]

বিজ্ঞাপন মূল্য তালিকা