মাদারীপুর সংবাদদাতা
প্রকাশ : ০৩ জানুয়ারি ২০২৩ ১৭:১৩ পিএম
আপডেট : ০৩ জানুয়ারি ২০২৩ ১৭:১৮ পিএম
রাজস্ব কর্মকর্তা রফিকুল ইসলামের ঘুষ নেওয়ার চিত্র (বাঁয়ে, ভিডিও থেকে নেওয়া ছবি), আরেক রাজস্ব কর্মকর্তা ইমরান কবীর (ডানে)।
কাস্টমস, এক্সাইজ ও ভ্যাট বিভাগ মাদারীপুর সার্কেল কার্যালয়ের সেই দুই রাজস্ব কর্মকর্তাকে স্ট্যান্ড রিলিজ (তাৎক্ষণিক বদলি) করেছে খুলনা ভ্যাট কমিশন। সম্প্রতি ওই দুই কর্মকর্তার ঘুষ লেনদেনের একটি ভিডিও চিত্র ইন্টারনেটে ছড়িয়ে পড়লে ব্যাপক সমালোচনা সৃষ্টি হয়।
ওই দুই কর্মকর্তা প্রত্যাহারের বিষয়টি মঙ্গলবার (৩ জানুয়ারি) দুপুরে মাদারীপুর জেলা প্রশাসক ড. রহিমা খাতুন প্রতিদিনের বাংলাদেশকে নিশ্চিত করেছেন।
তিনি বলেন, ‘অভিযুক্তদের সোমবার (২ জানুয়ারি) স্ট্যান্ড রিলিজ করেন খুলনার ভ্যাট কমিশনের অতিরিক্ত কমিশনার ম. সফিউজ্জামান। আজ দুপুরে মাদারীপুর সার্কেল কার্যালয়ে পত্রটি পাঠানো হয়। এর পর ওই দুই কর্মকর্তা খুলনায় চলে গেছেন।’
জেলা প্রশাসক রহিমা খাতুন বলেন, ‘অভিযুক্তদের খুলনা কার্যালয়ে সংযুক্ত করে অফিসিয়াল তদন্ত করবে ভ্যাট কমিশন।’
এর আগে কাস্টমস, এক্সাইজ ও ভ্যাট বিভাগ মাদারীপুর সার্কেল কার্যালয়ের দুই রাজস্ব কর্মকর্তার ঘুষ নেওয়ার একটি ভিডিও সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে ছড়িয়ে পড়ে। ভিডিওতে দেখা যায় সার্কেল কার্যালয়ের রাজস্ব কর্মকর্তা (সার্কেল-২) রফিকুল ইসলাম ও (সার্কেল-১) মো. ইমরান কবীর অফিস কক্ষে বসে দর কষাকষি করে এক ব্যবসায়ীর কাছ থেকে ঘুষের টাকা নিচ্ছেন।
দুই কর্মকর্তা প্রত্যাহারের পর ভুক্তভোগী ব্যবসায়ী শহিদুল ইসলাম লিখন বলেন, ‘তারা আমার কাছ থেকে সেদিন দর কষাকষি করে ঘুষ নেন। এটা খুবই দুঃখজনক। ঘটনার পরেই তা আমি ও আমার বন্ধু অমিত হোসেন গণমাধ্যমে বিষয়টি জানিয়ে দেই। এতে বিভিন্ন মহল থেকে আমাদের ওপর চাপ এসেছে।’
তিনি বলেন, ‘শুনেছি তাদের বদলি হয়েছে। এতে তো দোষীর কোনো বিচার হলো না। বরং মাদারীপুর জেলার চেয়ে বড় জেলা খুলনায় বদলি হলো। সেখানে রেখে তাদের তদন্ত হলে প্রশ্নবিদ্ধ হবে। তাই তাদের চাকরি থেকে অব্যাহতি দিয়ে তদন্ত করলে আমাদের মতো ক্ষুদ্র ব্যবসায়ীরা লাভবান হবো। স্ট্যান্ড রিলিজ কোনো সমাধান হতে পারে না। দোষীরা বিচারের মুখোমুখি হোক।’
এ ব্যাপারে জানতে কাস্টমস, এক্সাইজ ও ভ্যাট বিভাগ মাদারীপুর সার্কেল কার্যালয়ের বিভাগীয় কর্মকর্তা ও ডেপুটি কমিশনার মো. এনামুল হকের অফিসে গিয়ে তাকে পাওয়া যায়নি। ফোনে একাধিকবার যোগাযোগ করেও তার সাড়া পাওয়া যায়নি। পরে তার ফোনে খুধেবার্তা পাঠিয়েও জবাব মেলেনি।
২৭ ডিসেম্বর রাতে ফাঁস হওয়া ১০ মিনিট ১৩ সেকেন্ডের ওই ভিডিওতে দেখা যায় ব্যবসীয়কে উদ্দেশ করে রাজস্ব কর্মকর্তা রফিকুল ইসলাম বলেন, ‘এইডা কী আনছেন?’ পরে ৫০০ টাকার কয়েকটি নোট হাতে গুনে পকেটে ভরেন রফিকুল। এরপর রাজস্ব কর্মকর্তা রফিকুল ওই ব্যবসায়ীকে বলেন, ‘কী যে করেন আপনারা? মানে... মাদারীপুরের লোক এত ধনী, দেশের মধ্যে তৃতীয় ধনী জেলা। আপনারা কেন এমন করেন?’
এক পর্যায়ে ব্যবসায়ীর ওপর ক্ষুব্ধ হয়ে রফিকুল ইসলাম বলেন, ‘যা দিছেন আমি এটা নিতে পারব না। এটা ইমরান সাহেবকে কী দেব? আমি কীভাবে বুঝাব? স্যারে তো বকব! আমি এটা নিতে পারব না। এই ৩ (তিন হাজার) আমি নিতে পারব না। বাকিটা কখন দেবেন? আপনারা স্যারকে বলে যান, দেখা করে যান। কারণ তিনি (ইমরান কবীর) আপনার অরজিনাল স্যার। সেই আপনাকে বাঁচাতে পারব, মারতে পারব। বুঝচ্ছেন!’
শেষ কথায় রফিকুল ইসলাম ওই ব্যবসায়ীকে বলেন, ‘প্রতি মাসে অফিস খরচ ১ হাজার টাকা দিয়ে যাবেন। এটা যেন আর না বলা লাগে। কথা যেন নড়চড় না হয়। মাসের ১০ তারিখের মধ্যে টাকা আমার কাছে দিয়ে যাবেন।’
ভিডিওর ৮ মিনিট ৩৫ সেকেন্ড পর দেখা যায় রাজস্ব কর্মকর্তা মো. ইমরান কবীরকে। তিনি ওই ব্যবসায়ীকে উদ্দেশ করে বলেন, ‘আপনার দোকানের আশপাশে যারা দিচ্ছে ওয়েল অ্যান্ড গুড। আর যারা দিচ্ছেন না, তাদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেব। আপনার নম্বর দিয়ে যান।’
পরে ওই ব্যবসায়ী ১ হাজার টাকা ইমরান কবীরের টেবিলে রাখলে তিনি টাকাটা নেন।
খোঁজ নিয়ে জানা যায়, ভিডিওতে থাকা ওই ব্যবসায়ীর নাম অমিত হাসান। তিনি মাদারীপুর পুরান বাজারের পোশাক ব্যবসায়ী।
জানতে চাইলে ব্যবসায়ী অমিত হাসান প্রতিদিনের বাংলাদেশকে বলেন, ‘আমার ছোট পোশাকের দোকান। প্রতি মাসে ১০ হাজার টাকা করে ভ্যাট দিতে বলেন স্যারেরা। পরে অফিসে গেলে তারা ১ হাজার টাকা করে ভ্যাট দেওয়ার ব্যবস্থা করে দেন। কিন্তু শর্ত হলো, প্রতি মাসে অফিসে ৩ হাজার করে টাকা দিতে হবে।’