প্রবা প্রতিবেদন
প্রকাশ : ১৮ ঘণ্টা আগে
টানা এক সপ্তাহেরও বেশি সময় ধরে চলা ভারী বর্ষণ, পাহাড়ি ঢলে দেশের দক্ষিণাঞ্চল ও উত্তর-পূর্বাঞ্চলের জেলাগুলোর বন্যা পরিস্থিতির ব্যাপক অবনতি হয়েছে। দুর্যোগপূর্ণ এলাকাগুলোয় শিশুখাদ্য, বিশুদ্ধ পানি ও জরুরি ওষুধের তীব্র সংকট দেখা দিয়েছে। এ পর্যন্ত মারা গেছেন ৫১ জন ও আহত হয়েছেন ৩৯ জন। এই মহাদুর্যোগে পানিবন্দি ১০ লাখ ২২ হাজার ৯৬৩ জন মানুষ বিপন্নবোধ করছেন। এ ছাড়া আশ্রয়কেন্দ্রে ঠাঁই নিয়েছে ৪৪ হাজার ৪৫৭ জন। সবচেয়ে বেশি প্রাণহানির ঘটনা ঘটেছে কক্সবাজারে। সেখানে পাহাড় ধস ও বন্যায় মোট ২৮ জনের মৃত্যু হয়েছে, যার মধ্যে ১৫ জন স্থানীয় বাসিন্দা ও ১৩ জন রোহিঙ্গা। আহত হয়েছেন আরও ২৪ জন, যাদের মধ্যে ১৯ জন স্থানীয় ও ৫ জন রোহিঙ্গা। এ ছাড়া এই জেলায় ১ জন এখনও নিখোঁজ রয়েছেন। চট্টগ্রামে ১৩, বান্দরবানে ৬, রাঙামাটিতে ৩ ও মৌলভীবাজারে একজন নিহত হয়েছেন।
চট্টগ্রামে বন্যা পরিস্থিতির আরও অবনতি : টানা এক সপ্তাহের অতি বর্ষণ ও পাহাড়ি ঢলে চট্টগ্রামের বন্যা পরিস্থিতি আরও ভয়াবহ আকার ধারণ করেছে। জেলার সাতকানিয়া, লোহাগাড়া, বাঁশখালী ও চন্দনাইশ উপজেলার বিস্তীর্ণ এলাকা এখনও পানির নিচে তলিয়ে রয়েছে। গত শনিবার বৃষ্টির তীব্রতা কিছুটা কমলেও রবিবার সকাল থেকে আবারও ভারী বর্ষণ শুরু হওয়ায় দুর্গত মানুষের মধ্যে নতুন করে আতঙ্ক ও উদ্বেগ দেখা দিয়েছে।
প্রশাসন ও স্থানীয় সূত্রে জানা গেছে, সাতকানিয়া, লোহাগাড়া, বাঁশখালী ও চন্দনাইশÑ এই চারটি উপজেলাতেই অন্তত আট লাখ মানুষ পানিবন্দি হয়ে মানবেতর জীবনযাপন করছেন। জেলা প্রশাসনের তথ্য অনুযায়ী, ১ লাখ ৪৯ হাজার ২৭০টি পরিবার এখনও পানিবন্দি রয়েছে এবং ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছেন মোট ৬ লাখ ২০ হাজার মানুষ। এ পর্যন্ত বন্যায় মারা গেছেন ১৩ জন। জেলার ৬৭০টি আশ্রয়কেন্দ্রে আশ্রয় নিয়েছেন ২২ হাজার ৬০০ জন। এ ছাড়া ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে ১৪ হাজার ২৮১টি বসতঘর।
চট্টগ্রাম-কক্সবাজার রুটে ট্রেন চলাচল শুরু : টানা পাঁচ দিন বন্ধের পর চট্টগ্রাম-কক্সবাজার রুটে ফের ট্রেন চলাচল শুরু হয়েছে। রবিবার দুপুর দেড়টার পর চট্টগ্রাম রেলস্টেশন থেকে কক্সবাজারের উদ্দেশে ছেড়ে যায় ঢাকা থেকে আসা পর্যটক এক্সপ্রেস। এর গত মঙ্গলবার নগরীর মুরাদপর এলাকায় শমসের পাড়ায় রেলপথ পানিতে তলিয়ে গেলে চট্টগ্রাম-কক্সাবাজর রুটে ট্রেন চলাচল বন্ধ ঘোষণা করে রেল কর্তৃপক্ষ। এত দিন ট্রেন বন্ধ থাকায় যাত্রীরা দুর্ভোগে পড়েছিলেন। অবশেষে রবিবার থেকে চট্টগ্রাম রেলস্টেশন থেকে কক্সবাজারের উদ্দেশে ট্রেন যাত্রা শুরু করেছে।
চট্টগ্রামে সাপের কামড়ে আহত ৭৫ : বন্যাকবলিত চট্টগ্রামে পানিবাহিত রোগের পাশাপাশি নতুন করে উদ্বেগের কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে সাপের উপদ্রব। বন্যার পানিতে আশ্রয়স্থল ও বসতবাড়িতে সাপ ঢুকে পড়ায় এখন পর্যন্ত সাপের কামড়ে ৭৫ জন আহত হয়েছেন। রবিবার জেলা সিভিল সার্জন ডা. জাহাঙ্গীর আলম এসব তথ্য জানান।
চট্টগ্রাম সিভিল সার্জন কার্যালয়ের তথ্য অনুযায়ী, সাপের কামড়ে আহতদের মধ্যে বোয়ালখালীতে ২০ জন, পটিয়ায় ২২ জন, রাউজানে ১৪ জন, হাটহাজারীতে ৮ জন, রাঙ্গুনিয়ায় ৩ জন, সাতকানিয়ায় ৩ জন, চন্দনাইশে ৩ জন এবং লোহাগাড়ায় ২ জন রয়েছেন।
কক্সবাজারে বন্যার পরিস্তিতি অপরিবর্তিত : কক্সবাজারে ভারী বৃষ্টি কিছুটা কমলেও প্লাবিত এলাকার পরিস্থিতি অপরিবর্তিত রয়েছে। এদিকে চকরিয়া বন্যাকবলিত মানুষের মাঝে ত্রাণ বিতরণ করছেন দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা ও ত্রাণ প্রতিমন্ত্রী এম ইকবাল হোসেইন। রবিবার বিকালে উপজেলার বন্যাকবলিত এলাকায় বন্যাদুর্গতদের মাঝে ত্রাণ বিতরণ করেন তিনি।
বান্দরবানে কমছে পা, সড়ক-কৃষিতে ব্যাপক ক্ষতি : বান্দরবানে বন্যার পানি কমতে শুরু করেছে। তবে এখনও জেলার হাজারো পরিবার পানিবন্দি অবস্থায় রয়েছে। এবারের বন্যায় সবচেয়ে বেশি ক্ষতির মুখে পড়েছেন কৃষকরা। পাশাপাশি সড়ক, সেতু ও কৃষি খাতে কোটি কোটি টাকার ক্ষয়ক্ষতি হয়েছে। রবিবার বিভিন্ন এলাকায় দেখা যায়, অনেকেই বাড়িঘর ও ব্যবসাপ্রতিষ্ঠান থেকে কাদামাটি পরিষ্কার করে স্বাভাবিক জীবনে ফেরার চেষ্টা করছেন। তবে নিচু এলাকার অনেক বসতবাড়ি এখনও পানির নিচে থাকায় দুর্ভোগ কাটেনি।
জেলা প্রশাসন সূত্রে জানা গেছে, জেলার ২৯টি ইউনিয়ন কমবেশি বন্যাকবলিত হয়েছে। এর মধ্যে বান্দরবান সদর, লামা ও আলীকদম উপজেলার কয়েকটি ইউনিয়নে ক্ষয়ক্ষতির পরিমাণ সবচেয়ে বেশি। দুর্যোগ মোকাবিলায় জেলার ২২০টি আশ্রয়কেন্দ্র প্রস্তুত রাখা হয়েছিল। এর মধ্যে ৫৪টি আশ্রয়কেন্দ্রে ৪ হাজার ৬০০-এর বেশি মানুষ আশ্রয় নিয়েছিলেন।
রাঙামাটিতে পাহাড়ি ঢলে নতুন নতুন এলাকা প্লাবিত : রাঙামাটি পার্বত্য জেলার বন্যা পরিস্থিতি কিছুটা উন্নত হলেও আশ্রয় কেন্দ্রের অপরিবর্তিত রয়েছে। বৃষ্টি কমলেও ভারতের লুশাই পাহাড়ি ঢলের কারণে বরকল উপজেলায় নতুন নতুন এলাকা বন্যার পানিতে প্লাবিত হচ্ছে। রবিবার বরকল উপজেলায় নতুন করে তলিয়ে গেছে এরাবুনিয়া, ভুষনছড়া ও আইমাছড়া এলাকা। এতে পুরো উপজেলায় ২০ হাজারের অধিক মানুষ পানিবন্দি হয়ে পড়েছে। কাপ্তাই হ্রদের পানি বৃদ্ধি ও পাহাড়ি ঢলে সৃষ্ট বন্যায় রাঙামাটি পার্বত্য জেলার হ্রদবেষ্টিত ৬টি উপলোয় প্রায় অর্ধলাখ মানুষ পানিবন্দি রয়েছে। বিলাইছড়ি উপজেলায় পানি কিছুটা কমলেও স্রোতের কারণে দুর্গত এলাকায় এখনও ত্রাণ যায়নি। এখনও সেখানের পরিস্থিতি স্বাভাবিক হয়নি।
বাঘাইছড়ি, জুরাইছড়ি, নানিয়াচর ও লংগদু উপজেলায় বন্যা পরিস্থিতির উন্নতি হয়েছে বলে খবর পাওয়া গেছে। রাঙামাটি-বান্দরবান সড়কের গুরুত্বপূর্ণ ব্রিজঘাট সেতুর একটি অংশ ধসে পড়ায় রাঙামাটি-বান্দরবান সড়ক যোগাযোগ বিচ্ছিন্ন রয়েছে। বন্যা পরিস্থিতিতে পানিতে তলিয়ে যাওয়া বিভিন্ন এলাকা পরিদর্শন করেছেন দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা ও ত্রাণ মন্ত্রণালয়ের প্রতিমন্ত্রী এম. ইকবাল হোসেইন ও বিদ্যুৎ, জ্বালানি ও খনিজ সম্পদ প্রতিমন্ত্রী অনিন্দ্য ইসলাম অমিত ও সাবেক পার্বত্যমন্ত্রী দীপেন দেওয়ান এমপি।
সুনামগঞ্জে বন্যার আশঙ্কা : সুনামগঞ্জে টানা কয়েক দিনের ভারী বৃষ্টি আর উজান থেকে নেমে আসা পাহাড়ি ঢলে পানি বৃদ্ধি পেয়ে টইটম্বুর জেলার সব নদী ও বিশাল বিশাল হাওর। বন্যা পূর্বাভাস ও সতর্কীকরণ কেন্দ্রের পূর্বাভাসে বলা হয়েছে আগামী ৪৮ ঘণ্টা অর্থাৎ দুদিন সুরমা, কুশিয়ারা নদীর পানি বৃদ্ধি অব্যাহত থাকতে পারে। এতে নিম্নাঞ্চলের বন্যা পরিস্থিতি কিছুটা অবনতি এবং সুরমা নদী সংলগ্ন নিম্নাঞ্চলে বন্যা পরিস্থিতি তৈরি হতে পারে। ইতোমধ্যে জেলা ও উপজেলা পর্যায়ে দুর্যোগ মোকাবিলায় ও দুর্যোগ বিষয়ে তথ্য ও যোগাযোগের জন্য কন্ট্রোলরুম খোলা হয়েছে।
সুনামগঞ্জের অতিরিক্ত জেলা প্রশাসক (সার্বিক) মতিউর রহমান খান বলেন, বন্যা মোকাবিলায় আমাদের পূর্ব প্রস্তুতি হিসেবে যা যা দরকার সবকিছু নিয়ে রেখেছি। যখনই প্রয়োজন হবে অবস্থা অনুযায়ী তাৎক্ষণিক ব্যবস্থা নেওয়া হবে। মানুষ সহজে সেবা পাওয়ার লক্ষ্যে উপজেলা, পৌরসভা ও জেলা পর্যায়ে কন্ট্রোল রুম খোলা হয়েছে। যেকোনো সময় কন্ট্রোল রুমে যোগাযোগ করে প্রয়োজনীয় সহায়তা ও দিকনির্দেশনা পাবেন আক্রান্তরা। যদি কন্ট্রোল রুমে যোগাযোগ না করা যায় তাহলে স্থানীয় উপজেলা বা ইউনিয়ন পরিষদের মেম্বারের কাছে সাথে যোগাযোগ করলেও সহায়তা মিলবে। এদের কাউকে না পাওয়া গেলে গ্রামপুলিশের মাধ্যমে সহায়তা নেওয়া যাবে। গ্রামপুলিশকে সেভাবে দিকনির্দেশনা দিয়ে প্রস্তুত রাখা হয়েছে।
বানভাসির নিরাপত্তায় ১১ জেলায় বিজিবি মোতায়েন : টানা ভারী বর্ষণ, পাহাড়ি ঢল, বন্যা ও ভূমিধসে সৃষ্ট দুর্যোগে ক্ষতিগ্রস্ত মানুষদের উদ্ধার, নিরাপদ আশ্রয়ের ব্যবস্থা, ত্রাণসামগ্রী বিতরণ, জরুরি চিকিৎসা সহায়তা প্রদান, ক্ষতিগ্রস্ত যোগাযোগ ব্যবস্থা পুনরুদ্ধার এবং ঝুঁকিপূর্ণ অবকাঠামো সুরক্ষায় ১১ জেলায় বর্ডার গার্ড বাংলাদেশ (বিজিবি) মোতায়েন করা হয়েছে। রবিবার বিজিবির জনসংযোগ কর্মকর্তা মো. শরীফুল ইসলাম স্বাক্ষরিত এক সংবাদ বিজ্ঞপ্তিতে এসব তথ্য জানানো হয়। এতে জানানো হয়, বান্দরবান, কক্সবাজার, রাঙামাটি, খাগড়াছড়ি, চট্টগ্রাম, ফেনী, সিলেট, হবিগঞ্জ, সুনামগঞ্জ, নেত্রকোণা ও জামালপুর জেলায় দুর্যোগ পরিস্থিতি মোকাবিলায় উল্লিখিত জেলাগুলোতে মোট ৯০টি পয়েন্টে বিজিবির সার্বক্ষণিক বন্যা পরিস্থিতি পর্যবেক্ষণ ও মনিটরিং কার্যক্রম পরিচালিত হচ্ছে। প্রয়োজন অনুযায়ী তাৎক্ষণিক উদ্ধার ও মানবিক সহায়তা নিশ্চিত করা হচ্ছে।