নুসরাত জাহান এ্যানি
প্রকাশ : ১৯ ঘণ্টা আগে
ছবি: প্রতিদিনের বাংলাদেশ
ভোরের আলো ফোটার আগেই পানি ঢুকে পড়েছিল উঠানে। কিছু বুঝে ওঠার আগেই তলিয়ে যায় বসতঘর, রান্নাঘর, ধানের গোলা। প্রাণ বাঁচাতে সন্তানকে কোলে আর প্রয়োজনীয় কিছু কাপড় হাতে নিয়ে আশ্রয়কেন্দ্রের পথে ছুটতে হয়। এমন দৃশ্য এখন দেশের বন্যাকবলিত বহু জেলার মানুষের নিত্যদিনের বাস্তবতা।
একদিকে ভয়াবহ বন্যা, অন্যদিকে খাবার, বিশুদ্ধ পানি ও চিকিৎসার সংকট—সব মিলিয়ে খেয়ে না খেয়েই দিন পার করছেন হাজারো মানুষ।
সাম্প্রতিক বন্যায় চট্টগ্রামসহ দেশের উত্তর, উত্তর-পূর্ব ও মধ্যাঞ্চলের বিস্তীর্ণ এলাকা মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। কোথাও নদীভাঙন, কোথাও বাঁধ ভেঙে লোকালয়ে পানি ঢুকে পড়ায় হাজারো পরিবার ঘরবাড়ি ছেড়ে আশ্রয়কেন্দ্রে যেতে বাধ্য হয়েছে। অনেকে এখনও নিজ ঘরে ফিরতে পারেননি।
বন্যার পানিতে শুধু ঘরবাড়ি নয়, থেমে গেছে মানুষের জীবিকার চাকা। দিনমজুরের কাজ নেই, জেলের জাল পানির তোড়ে হারিয়ে গেছে, কৃষকের জমি ডুবে আছে, ক্ষুদ্র ব্যবসায়ীর দোকান পানিতে তলিয়ে গেছে। ফলে প্রতিদিনের আয়ের ওপর নির্ভরশীল পরিবারগুলো সবচেয়ে বেশি সংকটে পড়েছে। অনেক পরিবার দিনে একবার খাবার জোগাড় করতেই হিমশিম খাচ্ছে। কেউ শুকনো খাবার খেয়ে দিন কাটাচ্ছেন, আবার কেউ প্রতিবেশী বা স্বেচ্ছাসেবীদের সহায়তার অপেক্ষায় রয়েছেন।
বন্যার সবচেয়ে বড় ধাক্কা লেগেছে কৃষি খাতে। আমন ধানের ক্ষেত, শাকসবজির জমি, মাছের ঘের এবং গবাদিপশুর খামার ব্যাপক ক্ষতির মুখে পড়েছে। অনেক কৃষক ঋণ করে চাষাবাদ করেছিলেন। কিন্তু কয়েক দিনের বন্যায় সেই স্বপ্ন পানিতে ভেসে গেছে। এখন নতুন করে কীভাবে ঘুরে দাঁড়াবেন, সেই চিন্তাই তাদের সবচেয়ে বড় উদ্বেগ।
আশ্রয়কেন্দ্রগুলোতে সবচেয়ে বেশি দুর্ভোগ পোহাতে হচ্ছে শিশু, নারী ও বয়স্কদের। বিশুদ্ধ পানির সংকট, স্যানিটেশনের দুরবস্থা এবং পর্যাপ্ত চিকিৎসাসেবার অভাবে পানিবাহিত রোগ ছড়িয়ে পড়ার আশঙ্কা তৈরি হয়েছে। অনেক শিক্ষা প্রতিষ্ঠান আশ্রয়কেন্দ্রে পরিণত হওয়ায় শিশুদের পড়াশোনাও বন্ধ রয়েছে। বই-খাতা হারিয়ে তারা অনিশ্চয়তার মধ্যে দিন কাটাচ্ছে।
দুর্যোগের এই সময়ে বিভিন্ন স্বেচ্ছাসেবী সংগঠন, সামাজিক প্রতিষ্ঠান, শিক্ষার্থী ও সাধারণ মানুষ দুর্গতদের পাশে দাঁড়িয়েছেন। শুকনো খাবার, বিশুদ্ধ পানি, ওষুধ, শিশু খাদ্য ও প্রয়োজনীয় সামগ্রী নিয়ে তারা ছুটে যাচ্ছেন দুর্গম এলাকায়। এই সহযোগিতা ক্ষতিগ্রস্ত মানুষের মনে কিছুটা হলেও স্বস্তি এনে দিচ্ছে।
বিশেষজ্ঞদের মতে, শুধু ত্রাণ বিতরণে সংকট কাটবে না। ক্ষতিগ্রস্ত পরিবারগুলোর পুনর্বাসন, কৃষকদের ক্ষতি পুষিয়ে নিতে আর্থিক সহায়তা, বীজ ও কৃষি উপকরণ বিতরণ, ক্ষুদ্র ব্যবসায়ীদের পুনরুদ্ধারে ঋণসুবিধা এবং ক্ষতিগ্রস্ত অবকাঠামো দ্রুত সংস্কার জরুরি। একই সঙ্গে টেকসই বাঁধ নির্মাণ, নদী ব্যবস্থাপনা, কার্যকর ড্রেজিং এবং আগাম বন্যা সতর্কীকরণ ব্যবস্থাকে আরও শক্তিশালী করতে হবে।
বন্যা প্রতি বছরই আসে, কিন্তু প্রতিবারই রেখে যায় নতুন নতুন ক্ষতচিহ্ন। প্রকৃতির এই দুর্যোগে সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হন সমাজের নিম্নআয়ের মানুষ। তাদের প্রয়োজন শুধু একবেলার খাবার নয়; প্রয়োজন নিরাপদ আশ্রয়, জীবিকা ফিরে পাওয়ার সুযোগ এবং নতুন করে স্বপ্ন দেখার সাহস। রাষ্ট্র, সমাজ ও বিত্তবানদের সম্মিলিত উদ্যোগই পারে বন্যাদুর্গত মানুষের মুখে আবারও স্বস্তির হাসি ফিরিয়ে আনতে।
নুসরাত জাহান এ্যানি
শিক্ষার্থী, গোপালগঞ্জ সরকারি কলেজ।