বান্দরবান প্রতিবেদক
প্রকাশ : ২ ঘণ্টা আগে
বান্দরবান সদর উপজেলা রত্নপুর এলাকায় ফসলি জমি বন্যায় ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। ছবি: প্রতিদিনের বাংলাদেশ
“আমার স্বপ্ন, পরিশ্রম আর সব মূলধন বানের জলে ভাসিয়ে নিয়ে গেছে। এখন সব শেষ, বাঁচার আর কোনো পথ দেখি না।”- কথাগুলো বলতে বলতে চোখের পানি ধরে রাখতে পারেননি বান্দরবান সদর উপজেলার রত্নপুর গ্রামের কৃষক মিন্টু কুমার তঞ্চঙ্গ্যা।
টানা কয়েক দিনের ভারী বর্ষণ ও পাহাড়ি ঢলে বন্যা পরিস্থিতির সৃষ্টি হয়েছে বান্দরবান সদর ইউনিয়নের ২ নম্বর ওয়ার্ডের রত্নপুর পাড়া, জিনিঅং পাড়া, ধুংখি পাড়া, ডলুঝিড়ি পাড়া, রোয়াজা পাড়া, পুরাতন ব্রিকফিল্ড ও গোয়ালীয়াখোলা পাড়াসহ অনেক এলাকায়।
সরেজমিনে শুক্রবার এসব এলাকায় গিয়ে দেখা যায়, শতাধিক কৃষকের ফসলি জমি, সবজিক্ষেত, পানের বরজ, মাছের পুকুর ও বিভিন্ন কৃষি খামার তলিয়ে গেছে। কয়েক দিনের মধ্যেই বছরের সঞ্চয় ও জীবিকার প্রধান অবলম্বন হারিয়ে পথে বসার আশঙ্কায় দিন কাটছে তাদের।
৬৫ বছর বয়সী কৃষক মিন্টু কুমার তঞ্চঙ্গ্যা জানান, এক কানি ধনিয়াপাতার ক্ষেত সম্পূর্ণ নষ্ট হয়ে গেছে। দুটি পুকুরে প্রায় ৫৫ হাজার টাকার মাছের পোনা ছেড়েছিলেন। বন্যার পানিতে পুকুর ডুবে সব মাছ ভেসে গেছে। সব মিলিয়ে তার প্রায় পাঁচ লাখ টাকার ক্ষতি হয়েছে।
একই গ্রামের কৃষক শুক্র তঞ্চঙ্গ্যা জানান, তার আড়াই কানি ধনিয়াপাতার ক্ষেত এবং প্রায় ১০০০টি ফলন্ত পেঁপে গাছ বন্যার পানিতে তলিয়ে সম্পূর্ণ নষ্ট হয়ে গেছে। এতে তার প্রায় তিন লাখ টাকার ক্ষতি হয়েছে।
সজিব তঞ্চঙ্গ্যা ২০ শতক জমিতে ধনিয়াপাতার চাষ করেছিলেন। কয়েক দিনের মধ্যেই ফসল বাজারে তোলার কথা ছিল। কিন্তু বন্যার পানিতে পুরো ক্ষেত নষ্ট হয়ে গেছে।
পুরাতন ব্রিকফিল্ড এলাকার কৃষক মো. দেলোয়ার হোসেন (৬০) জানান, তার পানের বরজ সম্পূর্ণ নষ্ট হয়ে গেছে। তিনি বলেন, “এত বড় ক্ষতি জীবনে কখনও দেখিনি। আবার নতুন করে শুরু করার মতো সামর্থ্যও নেই।”
একই এলাকার কৃষক মো. ওসমান (৬০) জানান, এক কানি করলা ও দেড় কানি শসার চাষ করতে এক লাখ টাকার বেশি ব্যয় করেছিলেন। ক্ষেত নষ্ট না হলে অন্তত আড়াই লাখ টাকার সবজি বিক্রি করতে পারতেন। কিন্তু বন্যার পানিতে পুরো ক্ষেত ডুবে যাওয়ায় সব আশা শেষ হয়ে গেছে।
রত্নপুর পাড়ার কারবারী ও কৃষক নীল কান্তি (কনক) তঞ্চঙ্গ্যা জানান, তার মাছভর্তি দুটি পুকুর বন্যার পানিতে তলিয়ে গেছে। পুকুরে থাকা কাতলা, রুই, মৃগেল ও ব্রিগেড মাছের প্রতিটির ওজন দুই থেকে তিন কেজি হয়েছিল। কিন্তু হঠাৎ বন্যার পানিতে বাঁধ ভেঙে সব মাছ ভেসে চলে যায়। ধার দেনা করে প্রায় ২ লক্ষ টাকা মাছের পোনা পুকুরে ছেড়েছিলাম। আর ধনিয়া পাতা চাষ করেছি ৭০ হাজার টাকা খরচ করে। বানের জলে সব তলিয়ে গেছে। আগামীর দিনগুলোতে পরিবার নিয়ে কিভাবে বেঁচে থাকবো- কিভাবে চালাবো সংসার, কোনও উপায় দেখছি না।
কথা বলতে বলতে কপালে হাত রেখে তিনি বলেন, “এখন পথে বসা ছাড়া আর কী উপায় আছে? সব শেষ হয়ে গেছে।”
স্থানীয়দের ভাষ্য, গোয়ালাখোলা এলাকার বিস্তীর্ণ কৃষিজমি এখনো পানির নিচে রয়েছে। সবজি, ধান, পানের বরজ, পেঁপে বাগান ও মাছের পুকুর মিলিয়ে শতাধিক কৃষক ব্যাপক ক্ষতির মুখে পড়েছেন। অনেকেই ঋণ নিয়ে চাষাবাদ করেছিলেন। ফলে ফসল হারিয়ে তারা এখন ঋণ পরিশোধ নিয়েও চরম অনিশ্চয়তায় রয়েছেন।
বান্দরবান কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের উপ-পরিচালক কৃষিবিদ আবু নঈম মোহাম্মদ সাইফুদ্দিন প্রতিদিনের বাংলাদেশকে বলেন, বন্যায় ক্ষতিগ্রস্ত কৃষকদের তালিকা ও পুরো তথ্য সংগ্রহ চলমান। বন্যার পানি পুরোপুরি নেমে গেলে সরেজমিনে গিয়ে ক্ষতিগ্রস্ত কৃষকদের সঠিক তথ্য সংগ্রহ ও ক্ষয়ক্ষতি নিরূপন করে প্রতিবেদন আকারে ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষের কাছে প্রতিবেদন প্রেরণ করা হবে।