‘কাগজে উন্নয়ন, মাঠে শূন্য’
কুড়িগ্রাম সদর উপজেলার যাত্রাপুর ইউনিয়নের ঘনেশ্যামপুর এলাকার রাস্তা এটি। এক ডালি মাটি না ফেলেও কাবিখা প্রকল্পের চাল আত্মসাতের অভিযোগ উঠেছে। ছবি: প্রতিদিনের বাংলাদেশ
কুড়িগ্রামের ফুলবাড়ী ও সদর উপজেলায় গ্রামীণ অবকাঠামো উন্নয়নের নামে কাবিখা, কাবিটা ও টিআর প্রকল্পে ব্যাপক অনিয়ম, দুর্নীতি ও লুটপাটের অভিযোগ উঠেছে।
অভিযোগ রয়েছে, সরকারি বরাদ্দের কোটি টাকা এবং শতাধিক টন চাল-গমের বড় অংশ প্রকৃত কাজে ব্যয় না করে আত্মসাৎ করা হয়েছে।
কোথাও নামমাত্র কাজ, আবার কোথাও কাজ ছাড়াই প্রকল্প সম্পন্ন দেখিয়ে বিল উত্তোলনের অভিযোগ করেছেন স্থানীয়রা।
জেলা ত্রাণ ও পুনর্বাসন অফিস সূত্রে জানা গেছে, ২০২৫-২৬ অর্থবছরের প্রথম পর্যায়ে ফুলবাড়ী উপজেলায় কাবিটার ৩৫টি প্রকল্পে প্রায় ৯৫ লাখ ৭০ হাজার টাকা এবং আরও ৫৮টি প্রকল্পে প্রায় ৭৭ লাখ ৬ হাজার টাকা বরাদ্দ দেওয়া হয়।
এছাড়া কাবিখার ৮টি প্রকল্পে ৫৭ মেট্রিক টন গম এবং ৯টি প্রকল্পে ৯৩ মেট্রিক টন চাল বরাদ্দ দেওয়া হয় বলেও জানা যায়।
সরেজমিনে বড়ভিটা, ভাঙ্গামোড় ও নাওডাঙ্গা ইউনিয়নের বিভিন্ন প্রকল্প এলাকা ঘুরে অধিকাংশ স্থানেই সরকারি নীতিমালা অনুযায়ী কাজ হয়নি বলে অভিযোগ পাওয়া যায়।
বড়ভিটা ইউনিয়নের একটি কাবিখা প্রকল্পে রাস্তা সংস্কারের জন্য ৮ টন গম বরাদ্দ থাকলেও নদী থেকে অবৈধভাবে ড্রেজারের মাধ্যমে বালু তুলে দায়সারা কাজ করার অভিযোগ উঠেছে।
শাহবাজার উচ্চ বিদ্যালয়ের উন্নয়নে ১ লাখ ৫৭ হাজার টাকা বরাদ্দ থাকলেও ছয় মাসেও দৃশ্যমান কোনো কাজ হয়নি বলে স্থানীয়রা জানান।
ভাঙ্গামোড় ইউনিয়নের ৮ নম্বর ওয়ার্ডের ইউপি সদস্য ও প্রকল্প সভাপতি আবুল মালেক অভিযোগ করে বলেন, প্রকল্পের বিল ছাড় করাতে উপজেলা প্রকল্প বাস্তবায়ন কর্মকর্তাকে (পিআইও) এক লাখ টাকা ঘুষ দিতে হয়েছে।
তার দাবি, কমিশন ছাড়া কোনো বিল ছাড় হয় না এবং চেয়ারম্যানের অনুপস্থিতিতে একটি সিন্ডিকেট কার্যক্রম নিয়ন্ত্রণ করছে।
নাওডাঙ্গা ইউনিয়নেও চেয়ারম্যান পলাতক থাকার সুযোগে তার ঘনিষ্ঠদের মাধ্যমে টিআর ও কাবিখার বরাদ্দ লুটপাটের অভিযোগ করেছেন স্থানীয়রা।
এদিকে কুড়িগ্রাম সদর উপজেলার যাত্রাপুর ইউনিয়নের দুটি কাবিখা প্রকল্পে ২৮ মেট্রিক টন চাল আত্মসাতের অভিযোগ উঠেছে।
সরকারি নথিতে কাজ সম্পন্ন দেখানো হলেও স্থানীয়দের দাবি, গত এক বছরে সংশ্লিষ্ট সড়কে উল্লেখযোগ্য কোনো উন্নয়ন হয়নি।
তবে যাত্রাপুর ইউপি চেয়ারম্যান ও প্রকল্প চেয়ারম্যান আব্দুল গফুর দাবি করেছেন, প্রকল্পের কাজ যথাযথভাবে সম্পন্ন হয়েছে।
কুড়িগ্রাম সদর উপজেলার পিআইও মো. জসিম উদ্দিন বলেন, তিনি প্রকল্প পরিদর্শনের পরই চালের ডিও দিয়েছেন এবং কাজ হয়নি-এমন অভিযোগ সঠিক নয়। কাজ হয়েছে তবে কম আর বেশি।
তার দাবি, একটি পক্ষ ঘোলা পানিতে মাছ শিকারের চেষ্টা করছে।
ফুলবাড়ী উপজেলা পিআইও মো. সিরাজুদ্দৌলা বলেন, "চেয়ারম্যান-মেম্বারদের আয়ের একমাত্র উৎস কাবিখা ও টিআর। এখানে কিছু অনিয়ম থাকতেই পারে।
“টিআর কাবিখার কাজ কতটুকু বাস্তবায়ন হয় তা সবাই জানে। সুতরাং এটা নিয়ে এত কথা বলার সময় নাই আমার।"
এ বিষয়ে কুড়িগ্রাম জেলা ত্রাণ ও পুনর্বাসন কর্মকর্তা এস এম বেনজির বলেন, "অভিযোগ পাওয়া গেছে। তদন্ত করে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়া হবে।”
এখনই সংবাদ প্রকাশের দরকার নাই উল্লেখ করে তিনি বলেন, “আমাদেরকে একটু সময় দেন, আমরা বিষয়টি শক্তভাবে দেখছি।”
জেলা প্রশাসক অন্নপূর্ণা দেবনাথ বলেন, “সুনির্দিষ্ট অভিযোগ পেলে কাউকেই ছাড় দেওয়া হবে না। তদন্তে অভিযোগের সত্যতা মিললে আইনগত ব্যবস্থা নেওয়া হবে।”
এ সব প্রকল্প নিয়ে কথা হয়ে বেশ কয়েকজন স্থানীয় লোকজনের সঙ্গে।
তাদের দাবি, উন্নয়নের জন্য বরাদ্দ সরকারি অর্থ ও খাদ্যশস্যের সঠিক ব্যবহার নিশ্চিত করতে হবে।
একই সঙ্গে অনিয়মে জড়িতদের বিরুদ্ধে দ্রুত ও দৃষ্টান্তমূলক ব্যবস্থা নেওয়ার আহ্বান জানিয়েছেন তারা।