খোকন বিকাশ ত্রিপুরা জ্যাক, খাগড়াছড়ি
প্রকাশ : ১ ঘণ্টা আগে
আপডেট : ১ ঘণ্টা আগে
খাগড়াছড়ির নিম্নাঞ্চল প্লাবিত হওয়ায় কোথাও বাড়িঘরে পানি ঢুকেছে, কোথাও সড়ক তলিয়ে যোগাযোগ ব্যাহত হচ্ছে। ছবি: প্রতিদিনের বাংলাদেশ
টানা ছয় দিনের অবিরাম বর্ষণে সবুজে মোড়া খাগড়াছড়ির প্রকৃতি যেমন নতুন রূপ পেয়েছে, তেমনি দুর্ভোগে পড়েছেন হাজারো মানুষ।
চেঙ্গী নদীসহ বিভিন্ন নদী, ছড়া ও খালের পানি বৃদ্ধি পাওয়ায় জেলার নিম্নাঞ্চল প্লাবিত হয়েছে। কোথাও বাড়িঘরে পানি ঢুকেছে, কোথাও সড়ক তলিয়ে যোগাযোগ ব্যাহত হচ্ছে।
একই সঙ্গে পাহাড় ধসের আশঙ্কায় নির্ঘুম সময় কাটছে ঝুঁকিপূর্ণ এলাকার বাসিন্দাদের।
গত ৪ জুলাই থেকে শুরু হওয়া টানা বর্ষণে খাগড়াছড়ি সদর, মহালছড়ি, দীঘিনালা, পানছড়িসহ বিভিন্ন এলাকায় জলাবদ্ধতা দেখা দিয়েছে।
সদর উপজেলার মুসলিমপাড়া, আরামবাগ, মেহেদীবাগ ও কমলছড়িসহ বিভিন্ন নিম্নাঞ্চলে হাঁটুসমান পানি জমে ঘরবাড়িতে ঢুকে পড়েছে।
অনেক পরিবার প্রয়োজনীয় জিনিসপত্র নিরাপদ স্থানে সরিয়ে রেখে মানবেতর জীবনযাপন করছে।
মুসলিমপাড়ার বাসিন্দা রিনা আক্তার বলেন, “এবারের মতো এতদিন ধরে পানি ঘরে ছিল না। ছোট ছোট সন্তানদের নিয়ে খুব কষ্টে আছি। রান্না করা, ঘুমানো—সবই এখন সংগ্রাম।”
একই এলাকার মো. আব্দুল কাদের বলেন, “বৃষ্টি থামার কোনো লক্ষণ নেই। পানি আরও বাড়লে কোথায় যাব, সেটাই এখন সবচেয়ে বড় দুশ্চিন্তা।”
শুধু বসতবাড়িই নয়, দুর্ভোগে পড়েছেন পথচারী ও কর্মজীবী মানুষও।
মহালছড়ি উপজেলার মাইসছড়ি বাজার, স্লুইচগেটপাড়া এবং দীঘিনালা-লংগদু সড়কের আটারকছড়া এলাকায় সড়কের ওপর দিয়ে পানি প্রবাহিত হওয়ায় যান চলাচল ব্যাহত হচ্ছে।
এতে বিকল্প পথ ব্যবহার করতে বাধ্য হচ্ছেন সাধারণ মানুষ।
অটোচালক মো. শাহজাহান বলেন, “সড়কে পানি থাকায় যাত্রী কমে গেছে। অনেক জায়গায় রিকশা চালানোই সম্ভব হয় না। সারাদিন পরিশ্রম করেও আগের অর্ধেক আয় হচ্ছে।”
অবিরাম বর্ষণে সদর উপজেলার শালবন, সবুজবাগ ও আলুটিলাসহ কয়েকটি এলাকায় ছোট পরিসরে পাহাড় ধসের ঘটনা ঘটেছে।
বড় ধরনের ক্ষয়ক্ষতি না হলেও পাহাড়ের পাদদেশে বসবাসকারীদের মধ্যে আতঙ্ক বিরাজ করছে।
শালবন এলাকার শাহিনা বেগম বলেন, “রাত হলেই ভয় লাগে। ভারী বৃষ্টি শুরু হলে মনে হয়, এই বুঝি পাহাড় ভেঙে পড়ল। পরিবার নিয়ে সারারাত জেগে থাকতে হয়।”
সবুজবাগ এলাকার মো. আসলাম বলেন, “প্রশাসন নিরাপদ স্থানে যেতে বলেছে। প্রয়োজনীয় জিনিসপত্র গুছিয়ে রেখেছি। বৃষ্টি বাড়লে আর দেরি করব না।”
পরিস্থিতি মোকাবিলায় জেলা প্রশাসন সর্বোচ্চ সতর্ক অবস্থানে রয়েছে। ঝুঁকিপূর্ণ এলাকা পর্যবেক্ষণের পাশাপাশি ১৩৫টি আশ্রয়কেন্দ্র প্রস্তুত রাখা হয়েছে।
সেখানে নিরাপদ আশ্রয়, বিশুদ্ধ খাবার পানি ও প্রয়োজনীয় সেবার ব্যবস্থা নিশ্চিত করা হয়েছে।
খাগড়াছড়ি জেলা প্রশাসক মো. আনোয়ার সাদাত বলেন, “নদ-নদীর পানি এখনো বিপদসীমার নিচে রয়েছে। তবে আমরা সার্বক্ষণিক পরিস্থিতি পর্যবেক্ষণ করছি। পাহাড় ধসের ঝুঁকিতে থাকা এলাকাগুলোতে নিয়মিত মাইকিং করা হচ্ছে।”
জেলা মোট ১৩৫টি আশ্রয়কেন্দ্র খোলা হয়েছে উল্লেখ করে তিনি বলেন, “প্রয়োজন হলে দ্রুত মানুষকে নিরাপদ আশ্রয়ে সরিয়ে নেওয়া হবে। প্রশাসনের সব বিভাগ মাঠে রয়েছে।"
এদিকে বন্যাকবলিত এলাকা, সড়ক ও পাহাড় ধসপ্রবণ স্থান পরিদর্শন করেছেন খাগড়াছড়ি পার্বত্য জেলা পরিষদের চেয়ারম্যান শেফালিকা ত্রিপুরা।
তার সঙ্গে ছিলেন জেলা পরিষদের মুখ্য নির্বাহী কর্মকর্তা মো. ইলিয়াস মেহেদী, নির্বাহী কর্মকর্তা আব্দুল্লাহ আল মাহফুজ এবং পরিষদের সদস্যরা।
তারা কমলছড়ি, বটতলি, মেহেদীবাগসহ বিভিন্ন এলাকা ও আশ্রয়কেন্দ্র ঘুরে ক্ষতিগ্রস্ত মানুষের খোঁজখবর নেন।
পরিদর্শন শেষে শেফালিকা ত্রিপুরা বলেন, “দুর্যোগে মানুষের পাশে থাকা আমাদের নৈতিক ও প্রাতিষ্ঠানিক দায়িত্ব। জেলা পরিষদ প্রশাসনের সঙ্গে সমন্বয় করে ক্ষতিগ্রস্ত মানুষের জন্য প্রয়োজনীয় সহযোগিতা অব্যাহত রাখবে।”
“কেউ যেন ঝুঁকিপূর্ণ পাহাড়ের পাদদেশে অবস্থান না করেন, সে বিষয়ে সবাইকে সচেতন থাকতে হবে। মানুষের জীবন রক্ষাই এখন সবচেয়ে বড় অগ্রাধিকার।"
অন্যদিকে খাগড়াছড়ি সদর উপজেলা প্রশাসনের উদ্যোগে পানিবন্দি পরিবারের মাঝে জরুরি খাদ্যসামগ্রী বিতরণ করা হয়েছে।
উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা ফারিয়া সুলতানার নেতৃত্বে পরিচালিত এ কার্যক্রমে সহকারী কমিশনার (ভূমি) নুসরাত জাবীন ও স্থানীয় জনপ্রতিনিধিরা অংশ নেন।
এদিকে আবহাওয়া অধিদপ্তর থেকে ফের বৃষ্টির পূর্বাভাস দেওয়ায় উদ্বেগ আরও বেড়েছে।
জেলা প্রশাসন পাহাড়ের পাদদেশ, ঝুঁকিপূর্ণ ঢাল এবং নদী-ছড়ার তীরবর্তী এলাকার বাসিন্দাদের সতর্ক থাকার, অপ্রয়োজনে বাইরে না যাওয়ার এবং জরুরি প্রয়োজনে দ্রুত প্রশাসনের সঙ্গে যোগাযোগ করার আহ্বান জানিয়েছে।