প্রবা প্রতিবেদন
প্রকাশ : ১ ঘণ্টা আগে
আপডেট : ১ ঘণ্টা আগে
কক্সবাজারের উখিয়ার ৫ নম্বর রোহিঙ্গা ক্যাম্পে অবস্থিত খাদিজাতুল কুবরা মহিলা মাদ্রাসা ও হিফজখানার ওপর পাশের একটি পাহাড় ধসে পড়ে। ছবি: প্রতিদিনের বাংলাদেশ
চট্টগ্রাম অঞ্চল জুড়ে যেন প্রলয়ের ঢল নেমেছে। টানা প্রবল বর্ষণে পাহাড়ধসে একের পর এক করুণ মৃত্যু এবং সেই সঙ্গে দেখা দিয়েছে নানামুখী মানবীয় বিপর্যয়। পুরো চাটগাঁ এলাকা বিপর্যস্ত।
টানা কয়েক দিনের অতি ভারি বর্ষণে চট্টগ্রাম ও পার্বত্যাঞ্চলের জনজীবন কার্যত স্থবির হয়ে পড়েছে। গত তিন দিনে পাহাড়ধস ও দেয়ালধসে অন্তত ২০ জনের মৃত্যু হয়েছে। চট্টগ্রাম-কক্সবাজার রেলপথ পানিতে তলিয়ে যাওয়ায় ট্রেন চলাচল বন্ধ রয়েছে। জলাবদ্ধতায় চট্টগ্রাম নগরীর বিস্তীর্ণ এলাকায় সড়ক যোগাযোগ, শিক্ষা, স্বাস্থ্য ও নিত্যপ্রয়োজনীয় সেবায় মারাত্মক বিঘ্ন সৃষ্টি হয়েছে। পরিস্থিতির কারণে কয়েকটি জেলার এইচএসসি ও সমমানের পরীক্ষা স্থগিত করা হয়েছে। রাঙামাটির সব প্রাথমিক বিদ্যালয়েও বৃহস্পতিবার শ্রেণি পাঠদান বন্ধ ঘোষণা করা হয়েছে।
রোহিঙ্গা ক্যাম্পে পাহাড়ধসে নিহত ৮
গতকাল বুধবার দুপুরে টানা ভারি বৃষ্টির মধ্যে কক্সবাজারের উখিয়ার ৫ নম্বর রোহিঙ্গা ক্যাম্পে অবস্থিত খাদিজাতুল কুবরা মহিলা মাদ্রাসা ও হিফজখানার ওপর পাশের একটি পাহাড় ধসে পড়ে।
শরণার্থী ত্রাণ ও প্রত্যাবাসন কমিশনার (আরআরআরসি) মিজানুর রহমান জানান, আটজনের মরদেহ উদ্ধার করা হয়েছে। নিহতদের মধ্যে সাতজনই শিশু। মাদ্রাসাটি অস্থায়ী আশ্রয়কেন্দ্র হিসেবেও ব্যবহৃত হওয়ায় সেখানে অনেক রোহিঙ্গা আশ্রয় নিয়েছিলেন। নিহতদের মধ্যে চারজনের পরিচয় নিশ্চিত হয়েছে। তারা হলেন রাশিদা বেগম (১৩), উম্মে নেজাতুল (১৩), উম্মে সালমা (১২) এবং উমাইসা বিবি (১৩)।
রোহিঙ্গা ক্যাম্পের নিরাপত্তার দায়িত্বে থাকা ১৪ এপিবিএনের অধিনায়ক মোহাম্মদ সিরাজ আমিন জানান, বিকাল সাড়ে ৫টার দিকে উদ্ধার অভিযান শেষ হয়। পরে ফায়ার সার্ভিসের সদস্যরা ঘটনাস্থল ত্যাগ করেন। আহতদের স্থানীয় রোহিঙ্গারা বিভিন্ন হাসপাতালে নিয়ে যান।
কক্সবাজার আবহাওয়া অধিদপ্তরের সহকারী আবহাওয়াবিদ মো. আব্দুল হান্নান জানান, বুধবার সকাল ৬টা থেকে বেলা ৩টা পর্যন্ত জেলায় ৬৮ মিলিমিটার বৃষ্টিপাত রেকর্ড করা হয়েছে। এর আগে রবিবার ২৪০, সোমবার ১২৯ এবং মঙ্গলবার ৬৯ মিলিমিটার বৃষ্টিপাত হয়।
এর আগে মঙ্গলবার সকালে কক্সবাজার শহরে পাহাড়ধসে একজনের মৃত্যু হয়। সোমবার রোহিঙ্গা ক্যাম্পে পাহাড়ধসে আটজন নিহত হন। একই দিন কক্সবাজার শহর ও পেকুয়ায় পৃথক ঘটনায় আরও দুজনের মৃত্যু হয়। এ ছাড়া বৃষ্টির পানিতে ডুবে এক রোহিঙ্গা শিশুসহ দুই শিশুর মৃত্যু হয়েছে।
চট্টগ্রামে পাহাড়ধসে দুই শিশুর মৃত্যু
বুধবার চট্টগ্রামে পৃথক দুটি পাহাড়ধসে দুই শিশুর মৃত্যু হয়েছে। নগরীর চশমা হিলের মেয়র গলি এলাকায় পাহাড়ধসে সামিয়া ইসলাম (১৩) নিহত হয়। বায়েজিদ বোস্তামী ফায়ার স্টেশনের জ্যেষ্ঠ স্টেশন কর্মকর্তা মো. কামরুজ্জামান জানান, ঘটনাস্থল থেকে তার মরদেহ উদ্ধার করা হয়েছে।
একই দিন সকালে সীতাকুণ্ড উপজেলার জঙ্গল সলিমপুরের বাগানবাড়ি এলাকায় পাহাড়ধসে আশরাফুল ইসলাম ওরফে তানভীর (১০ মাস) নিহত হয়। এ ঘটনায় তার মা লামিয়া আক্তার আহত হন।
সীতাকুণ্ড উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা মো. ফখরুল ইসলাম বলেন, “পাহাড়ধসের ঝুঁকি সম্পর্কে আগেই মাইকিং করে সতর্ক করা হয়েছিল। আহত লামিয়া আক্তারের চিকিৎসার জন্য ২৫ হাজার টাকা আর্থিক সহায়তা দেওয়া হবে”।
পতেঙ্গা আবহাওয়া অফিসের তথ্যমতে, বুধবার দুপুর ১২টা পর্যন্ত আগের ২৪ ঘণ্টায় চট্টগ্রামে ২৩৪ দশমিক ৯ মিলিমিটার বৃষ্টিপাত রেকর্ড করা হয়েছে। এর আগের ২৪ ঘণ্টায় বৃষ্টিপাতের পরিমাণ ছিল ৪১২ দশমিক ৩ মিলিমিটার, যা গত ৪২ বছরের মধ্যে সর্বোচ্চ।
জলাবদ্ধতায় স্থবির নগরজীবন
টানা বর্ষণে চট্টগ্রাম নগরীর বিস্তীর্ণ এলাকা হাঁটু থেকে কোমরসমান পানিতে তলিয়ে গেছে। চকবাজার, কাতালগঞ্জ, পাঁচলাইশ, বাকলিয়া, কাজীরহাট, হালিশহর, আগ্রাবাদ, চান্দগাঁও, পতেঙ্গা ও কুয়াইশসহ বিভিন্ন এলাকায় যান চলাচল মারাত্মকভাবে ব্যাহত হয়েছে। নতুন করে সিডিএ ১ নম্বর, সিটি গেট, জামালখানের হেমসেন লেন, নাসিরাবাদ ওমেন কলেজ এলাকা, জিইসি মোড়, ফয়’স লেক, গরিব উল্লাহ শাহ মাজার এলাকা এবং ইস্পাহানি রেলগেট এলাকাতেও পানি জমেছে।
স্থানীয় বাসিন্দা আহমদ উল্লাহ বলেন, “খাল-নালা পরিষ্কার না থাকায় বৃষ্টির পানি দ্রুত নামতে পারছে না”।
একই ধরনের অভিযোগ করেন কাতালগঞ্জের বাসিন্দা রতনানন্দ।
চান্দগাঁওয়ের বাসিন্দা নাদিয়া সুলতানা জানান, ঘরে পানি ঢুকে পড়ায় রান্না করা সম্ভব হয়নি। পরিবার নিয়ে অন্যত্র আশ্রয় নিতে হয়েছে। আগ্রাবাদে কর্মস্থলে যেতে চাকরিজীবীদের কোমরসমান পানি পেরোতে হয়েছে। ব্যাংক কর্মকর্তা সাহাব উদ্দিন বলেন, গণপরিবহন বন্ধ থাকায় অতিরিক্ত ভাড়া দিয়ে রিকশায় অফিসে যেতে হয়েছে।
চট্টগ্রাম উন্নয়ন কর্তৃপক্ষের চেয়ারম্যান প্রকৌশলী বেলায়েত হোসেন বলেন, “জলাবদ্ধতা নিরসন প্রকল্পের কাজ আগামী ডিসেম্বরের মধ্যে শেষ করার লক্ষ্য নির্ধারণ করা হয়েছে। এর মধ্যে দুর্ভোগ কমাতে তাৎক্ষণিক বিভিন্ন পদক্ষেপ নেওয়া হচ্ছে”।
চট্টগ্রাম সিটি করপোরেশনের মেয়র ডা. শাহাদাত হোসেন বলেন, “পরিস্থিতি মোকাবিলায় চট্টগ্রাম সিটি করপোরেশন, চট্টগ্রাম উন্নয়ন কর্তৃপক্ষ (সিডিএ), পানি উন্নয়ন বোর্ড এবং সেনাবাহিনীর ইঞ্জিনিয়ারিং কোর সমন্বিতভাবে কাজ করছে”।
রাঙামাটিতে বিদ্যালয় বন্ধ
বৈরী আবহাওয়া ও শিক্ষার্থীদের নিরাপত্তার কথা বিবেচনায় নিয়ে রাঙামাটি জেলার সব প্রাথমিক বিদ্যালয়ে বৃহস্পতিবার শ্রেণি পাঠদান স্থগিত ঘোষণা করা হয়েছে।
টানা তিন দিনের ভারি বৃষ্টিতে জেলায় পাহাড়ধসের ঝুঁকি বেড়েছে। জেলা প্রশাসন ২০৪টি আশ্রয়কেন্দ্র খুলেছে। এর মধ্যে ২০টি আশ্রয়কেন্দ্রে ১ হাজার ১৪৬ জন আশ্রয় নিয়েছেন। সাজেকে প্রায় ৬০০ পর্যটক আটকা পড়েছেন। টানা বৃষ্টিতে রাঙামাটি-চট্টগ্রাম, রাঙামাটি-খাগড়াছড়ি ও লংগদু সড়কে যান চলাচল বন্ধ রয়েছে। বিভিন্ন স্থানে সড়ক ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ায় যোগাযোগ ব্যবস্থা ব্যাহত হয়েছে।
জেলা প্রশাসক নাজমা আশরাফি বলেন, “পাহাড়ধসের ঝুঁকিতে থাকা এলাকার বাসিন্দাদের নিরাপদ স্থানে সরিয়ে নেওয়ার কার্যক্রম অব্যাহত রয়েছে”।
এইচএসসি পরীক্ষা স্থগিত
বন্যা পরিস্থিতির কারণে চট্টগ্রাম ও রাঙামাটির পর কক্সবাজার জেলার বুধবারের এইচএসসি ও সমমানের পরীক্ষাও স্থগিত করা হয়েছিল। আন্তঃশিক্ষা বোর্ড সমন্বয় কমিটির পৃথক দুটি আদেশে এ সিদ্ধান্ত জানানো হয়। স্থগিত পরীক্ষার সংশোধিত সময়সূচি পরে ঘোষণা করা হবে।
চট্টগ্রাম-কক্সবাজার রেল চলাচল বন্ধ
টানা বর্ষণে চট্টগ্রাম-কক্সবাজার রেলপথের একটি অংশ প্রায় দুই ফুট পানিতে তলিয়ে যাওয়ায় বাংলাদেশ রেলওয়ে ট্রেন চলাচল বন্ধ রেখেছে। এতে ঢাকা-কক্সবাজার রুটে চলাচলকারী চার জোড়া ট্রেনের চলাচল ব্যাহত হয়েছে। বুধবার সকালে চট্টগ্রাম থেকে কক্সবাজারগামী সৈকত এক্সপ্রেসের যাত্রাও বাতিল করা হয়।
চট্টগ্রাম রেলওয়ে স্টেশনের ব্যবস্থাপক আবু বক্কর সিদ্দিকী বলেন, “পানি নেমে পরিস্থিতি স্বাভাবিক হলে ট্রেন চলাচল পুনরায় শুরু হবে”।
রেললাইন পরিদর্শন শেষে রেল প্রতিমন্ত্রী হাবিবুর রশিদ বলেন, “চট্টগ্রাম থেকে দোহাজারী পর্যন্ত ৪৭ কিলোমিটার রেলপথ প্রায় পাঁচ ফুট উঁচু করার পরিকল্পনা নেওয়া হয়েছে। এ লক্ষ্যে দরপত্র প্রক্রিয়া শুরু হয়েছে। তার দাবি, রেলপথ নির্মাণে কোনো ত্রুটি নেই; অস্বাভাবিক বৃষ্টিপাতের কারণেই এ পরিস্থিতির সৃষ্টি হয়েছে”।
বান্দরবানে ঘরবাড়ি ক্ষতিগ্রস্ত, থানচিতে আটকা পর্যটক
বান্দরবান পৌরসভার ৩ নম্বর ওয়ার্ডের কালাঘাটা বড়ুয়াপাড়া এলাকায় পাহাড়ধসে একটি পাকা দালানসহ অন্তত পাঁচটি বসতঘর ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। পরে উপজেলা প্রশাসন জানায়, কালাঘাটা বড়ুয়া পাড়া ও সুয়ালক এলাকায় মোট সাতটি বসতঘর ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ার তথ্য পাওয়া গেছে।
সাঙ্গু ও মাতামুহুরী নদীর পানি বৃদ্ধি পাওয়ায় থানচির নাফাখুম, জিন্নাপাড়া ও বাঘের মুখ এলাকায় ৩৭ জন পর্যটক আটকা পড়েছেন। জেলা প্রশাসন জানিয়েছে, তাদের নিরাপদে উদ্ধারের ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে।
আবহাওয়া অধিদপ্তরের ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা সনাতন কুমার মণ্ডল জানান, গত ২৪ ঘণ্টায় জেলায় ৩০৯ মিলিমিটার বৃষ্টিপাত রেকর্ড করা হয়েছে।
প্রতিবেদনটি তৈরিতে তথ্যসহায়তা করেছেন চট্টগ্রাম অফিস, কক্সবাজার, বান্দরবান, খাগড়াছড়ি ও রাঙামাটি প্রতিবেদক