খুলনা ওয়াসা ভবন। ছবি: সংগৃহীত
আদালতের নির্দেশনা নিয়ে ভিন্ন ব্যাখ্যা, বিভাগীয় প্রার্থীদের আবেদন প্রত্যাখ্যান এবং নিয়োগ প্রক্রিয়ার স্বচ্ছতা নিয়ে প্রশ্ন, এসব অভিযোগকে ঘিরে নতুন করে বিতর্কে জড়িয়েছে খুলনা ওয়াসার নিয়োগ কার্যক্রম।
আগামী শুক্রবার অনুষ্ঠেয় নিয়োগ পরীক্ষায় অংশগ্রহণের সুযোগ পাচ্ছেন না খুলনা ওয়াসার কর্মরত ২৪ জন বিভাগীয় প্রার্থী। এ নিয়ে তারা হাইকোর্টে রিট করলেও আদালতের নির্দেশনা কার্যকর না করেই কর্তৃপক্ষ পরীক্ষা নিতে যাচ্ছে বলে অভিযোগ করেছেন রিটকারীরা। তবে খুলনা ওয়াসা কর্তৃপক্ষের দাবি, হাইকোর্ট রিট খারিজ করে দিয়েছেন এবং প্রতিষ্ঠানের নিজস্ব প্রবিধানে বিভাগীয় প্রার্থীদের জন্য আলাদা কোনো সুযোগ না থাকায় তাদের পরীক্ষায় অংশ নেওয়ার সুযোগ দেওয়ার বিধান নেই।
এ ঘটনাকে কেন্দ্র করে খুলনা ওয়াসার কর্মকর্তা-কর্মচারীদের মধ্যে তীব্র ক্ষোভ ও অসন্তোষ বিরাজ করছে।
রিটকারীদের আবেদন সূত্রে জানা গেছে, খুলনা ওয়াসা ২০২৫ সালের ১০ নভেম্বর ২১টি পদে জনবল নিয়োগের জন্য একটি বিজ্ঞপ্তি প্রকাশ করে। ১৩ নভেম্বর বিজ্ঞপ্তিটি বিভিন্ন পত্রিকায় প্রকাশিত হয়। বিজ্ঞপ্তিতে সহকারী প্রকৌশলী (যান্ত্রিক ও বৈদ্যুতিক), প্রশাসনিক কর্মকর্তা, অফিস সহকারী কাম কম্পিউটার অপারেটর ও টাইপিস্ট, রাজস্ব তত্ত্বাবধায়ক, ডেটা এন্ট্রি অপারেটর, ল্যাব টেকনিশিয়ান, ক্যাশিয়ার, স্টোরকিপার, সিনিয়র সহকারী, পাম্প অপারেটর, যান্ত্রিক টেকনিশিয়ান এবং বৈদ্যুতিক টেকনিশিয়ানসহ মোট ২১টি পদে নিয়োগের কথা বলা হয়।
তবে সরকারি ও অধিকাংশ স্বায়ত্তশাসিত প্রতিষ্ঠানে বিভাগীয় প্রার্থীদের ক্ষেত্রে বয়স ও শিক্ষাগত যোগ্যতা শিথিলের সুযোগ থাকলেও ওই বিজ্ঞপ্তিতে এমন কোনো সুযোগ রাখা হয়নি। খুলনা ওয়াসার বিভিন্ন পদে কর্মরত ২৪ জন কর্মকর্তা-কর্মচারী অভ্যন্তরীণ প্রার্থী হিসেবে নিয়োগ পরীক্ষায় অংশগ্রহণের আবেদন করলেও তা গ্রহণ করা হয়নি। পরে তারা হাইকোর্টে রিট পিটিশন (নং-২২৭৩/২০২৬) দায়ের করেন।
রিটকারীদের ভাষ্য, গত ১৪ জুন বিচারপতি ফাতেমা নাজিব ও বিচারপতি এএফএম সাইফুল করিমের সমন্বয়ে গঠিত হাইকোর্টের দ্বৈত বেঞ্চে শুনানি শেষে মামলার ২ নম্বর রেসপনডেন্ট খুলনা ওয়াসার ব্যবস্থাপনা পরিচালককে আদেশের কপি পাওয়ার ১৫ দিনের মধ্যে আবেদনকারীদের আবেদন নিষ্পত্তির নির্দেশ দেওয়া হয়। একই সঙ্গে আদেশে বলা হয়, কর্তৃপক্ষ আইন অনুযায়ী স্বাধীনভাবে সিদ্ধান্ত গ্রহণ করতে পারবেন। কিন্তু সেই আবেদন নিষ্পত্তি না করেই শুক্রবার নিয়োগ পরীক্ষা আয়োজন করা হচ্ছে বলে অভিযোগ তাদের।
রিটকারী এবং খুলনা ওয়াসার ভাণ্ডার রক্ষক রবিউল ইসলাম বলেন, শিক্ষাগত যোগ্যতা ও অভিজ্ঞতার ভিত্তিতে আমি প্রশাসনিক কর্মকর্তা পদে আবেদন করতে চেয়েছিলাম। ওয়াসায় আমার ১০ বছরের চাকরির অভিজ্ঞতা রয়েছে। আমাদের অনেকেরই পদোন্নতি পাওয়ার সময় হয়েছে। কিন্তু পুরনো কর্মচারীদের বিষয়টি বিবেচনায় না এনে নতুনদের নিয়োগের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। এতে বড় ধরনের নিয়োগ বাণিজ্যের আশঙ্কা করছি। হাইকোর্টে রিট করায় আমার বিরুদ্ধে মিথ্যা অভিযোগে বিভাগীয় মামলা দিয়ে হয়রানি করা হচ্ছে।
খুলনা ওয়াসা কর্মচারী ইউনিয়নের সাধারণ সম্পাদক জিএম আব্দুল গফফার বলেন, ঢাকা, রাজশাহী ও চট্টগ্রাম ওয়াসাসহ দেশের সব সরকারি ও স্বায়ত্তশাসিত প্রতিষ্ঠানে বিভাগীয় প্রার্থীদের জন্য বিশেষ সুযোগ এবং বয়স ও শিক্ষাগত যোগ্যতা শিথিলের বিধান রয়েছে। একমাত্র খুলনা ওয়াসায় খামখেয়ালিপূর্ণভাবে এই নিয়ম মানা হয় না। এতে ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষের বড় আকারের নিয়োগ দুর্নীতি ও অনিয়মের সুযোগ সৃষ্টি হয়।
তিনি আরও বলেন, ২০২০ সালেও একই ধরনের একটি নিয়োগ বিজ্ঞপ্তির বিরুদ্ধে আমি হাইকোর্টে রিট করেছিলাম। সে সময় নিয়োগ কার্যক্রম স্থগিত হয়ে যায়। মামলাটি এখনও বিচারাধীন রয়েছে।
তবে অভিযোগ অস্বীকার করেছেন খুলনা ওয়াসার উপ-ব্যবস্থাপনা পরিচালক (অর্থ ও প্রশাসন) ঝুমুর বালা। তিনি বলেন, নিয়োগ পরীক্ষার বিষয়ে হাইকোর্টে একটি রিট হয়েছিল। হাইকোর্ট সেটি খারিজ করে দিয়েছেন। খুলনা ওয়াসা নিজস্ব প্রবিধান অনুযায়ী পরিচালিত হয়। সেখানে বিভাগীয় প্রার্থীদের জন্য আলাদা কোনো বিধান নেই। ফলে নীতিমালার বাইরে গিয়ে কাউকে পরীক্ষায় অংশগ্রহণের সুযোগ দেওয়ার কোনো সুযোগ নেই। তিনি আরও জানান, শুক্রবার সকাল ১০টায় খুলনা জিলা স্কুলে নিয়োগ পরীক্ষা অনুষ্ঠিত হবে।
আদালতের আদেশের ব্যাখ্যা নিয়ে দুই পক্ষের বিপরীত অবস্থান এবং বিভাগীয় প্রার্থীদের অংশগ্রহণের সুযোগ না থাকায় খুলনা ওয়াসার নিয়োগ প্রক্রিয়া নিয়ে নতুন করে প্রশ্ন দেখা দিয়েছে। রিটকারীদের অভিযোগ, আদালতের নির্দেশের আলোকে তাদের আবেদন নিষ্পত্তির আগেই পরীক্ষা নেওয়া হলে পুরো নিয়োগ প্রক্রিয়া নিয়ে আইনি জটিলতা তৈরি হতে পারে। তবে ওয়াসা কর্তৃপক্ষ বলছে, তারা প্রতিষ্ঠানের বিদ্যমান প্রবিধান মেনেই নিয়োগ কার্যক্রম পরিচালনা করছে।