দিলীপ মজুমদার, কুমিল্লা অফিস
প্রকাশ : ৭ ঘণ্টা আগে
ব্রাহ্মণপাড়া উপজেলা প্রাথমিক শিক্ষা অফিসারের কার্যালয়। ছবি: প্রতিদিনের বাংলাদেশ
কুমিল্লার ব্রাহ্মণপাড়া উপজেলার সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়গুলো দীর্ঘদিন ধরে তীব্র শিক্ষক সংকটে জর্জরিত। উপজেলার অর্ধেকেরও বেশি বিদ্যালয়ে প্রধান শিক্ষক নেই। ফলে ৬১টি বিদ্যালয়ে সহকারী শিক্ষকদের ভারপ্রাপ্ত প্রধান শিক্ষকের দায়িত্ব পালন করতে হচ্ছে। একই সময়ে সহকারি শিক্ষকের ৪১টি পদও শূন্য থাকায় শিক্ষা কার্যক্রম, প্রশাসনিক ব্যবস্থাপনা ও শিক্ষার মান ধরে রাখা দিন দিন কঠিন হয়ে পড়েছে। এর সরাসরি বিরূপ প্রভাব পড়ছে কোমলমতি শিক্ষার্থীদের পাঠদান ও শেখার পরিবেশে।
উপজেলা প্রাথমিক শিক্ষা অফিস সূত্রে জানা গেছে, ব্রাহ্মণপাড়া উপজেলার আটটি ইউনিয়নে মোট ১১৪টি সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয় রয়েছে। এর মধ্যে ৬১টি বিদ্যালয়ে প্রধান শিক্ষকের পদ দীর্ঘদিন ধরে শূন্য। পাশাপাশি সহকারী শিক্ষকের ৪১টি পদও পূরণ হয়নি। এতে অনেক বিদ্যালয়ে সীমিত সংখ্যক শিক্ষক দিয়ে একাধিক শ্রেণির পাঠদান, প্রশাসনিক কার্যক্রম, সরকারি বিভিন্ন কর্মসূচি বাস্তবায়ন, শিক্ষার্থীদের মূল্যায়ন, উপবৃত্তির তথ্য হালনাগাদ, মিড-ডে মিল, জন্মনিবন্ধন যাচাই, অনলাইন ডাটা এন্ট্রি, বিদ্যালয়ের আর্থিক ব্যবস্থাপনা ও সরকারি চিঠিপত্রের জবাব দেওয়াসহ সব ধরনের দায়িত্ব পালন করতে হচ্ছে।
বিদ্যালয় সংশ্লিষ্টরা জানান, একটি বিদ্যালয়ের একাডেমিক ও প্রশাসনিক নেতৃত্বের মূল দায়িত্ব প্রধান শিক্ষকের ওপর বর্তায়। শিক্ষক-শিক্ষার্থীদের তদারকি, শ্রেণি পর্যবেক্ষণ, বিদ্যালয় উন্নয়ন পরিকল্পনা বাস্তবায়ন, এসএমসি ও অভিভাবকদের সঙ্গে সমন্বয়, সরকারি প্রকল্প বাস্তবায়ন এবং শিক্ষার গুণগত মান নিশ্চিত করাই তার প্রধান দায়িত্ব। কিন্তু দীর্ঘদিন ধরে এসব দায়িত্ব পালন করছেন সহকারী শিক্ষকরা। ফলে তাদের নিয়মিত ক্লাসরুমে পর্যাপ্ত সময় দেওয়া সম্ভব হচ্ছে না।
একাধিক ভারপ্রাপ্ত প্রধান শিক্ষক বলেন, একই পদমর্যাদার সহকারী শিক্ষকদের মধ্য থেকে একজনকে ভারপ্রাপ্ত দায়িত্ব দেওয়ায় প্রশাসনিক সিদ্ধান্ত বাস্তবায়নে অনেক সময় বিব্রতকর পরিস্থিতির সৃষ্টি হয়। অফিসের নথিপত্র, অনলাইন কার্যক্রম, সরকারি সভা, প্রশিক্ষণ, ইউজিসি ও অধিদপ্তরের বিভিন্ন নির্দেশনা বাস্তবায়ন করতে গিয়ে শ্রেণিকক্ষে সময় দেওয়া কঠিন হয়ে পড়ে।
একজন ভারপ্রাপ্ত প্রধান শিক্ষক বলেন, প্রধান শিক্ষক ও সহকারী শিক্ষক—দুই ধরনের দায়িত্ব একসঙ্গে পালন করতে গিয়ে প্রায়ই হিমশিম খেতে হয়। প্রশাসনিক কাজের চাপ এত বেশি যে অনেক সময় নিয়মিত ক্লাস নেওয়া সম্ভব হয় না। এতে শিক্ষার্থীদের শেখার ধারাবাহিকতা ব্যাহত হচ্ছে।
শিক্ষক সংকটের কারণে অনেক বিদ্যালয়ে একজন শিক্ষককে একাধিক শ্রেণির পাঠদান করতে হচ্ছে। কোথাও কোথাও একই কক্ষে দুই বা ততোধিক শ্রেণির শিক্ষার্থীদের একসঙ্গে পাঠদান কিংবা রুটিন পরিবর্তন করে ক্লাস পরিচালনা করা হচ্ছে। এতে শিক্ষার্থীদের ব্যক্তিগত শেখার সুযোগ কমে যাচ্ছে এবং দুর্বল শিক্ষার্থীদের প্রতি আলাদা মনোযোগ দেওয়া সম্ভব হচ্ছে না। বিশেষ করে বাংলা, ইংরেজি ও গণিতের মতো মৌলিক বিষয়ে শিক্ষার্থীদের শেখার ঘাটতি তৈরি হওয়ার আশঙ্কা বাড়ছে বলে মনে করছেন শিক্ষকরা।
এছাড়া শিক্ষকদের নিয়মিত প্রশিক্ষণ, উপজেলা ও জেলা পর্যায়ের সভা, নির্বাচন, জনশুমারি, বিভিন্ন সরকারি জরিপ, টিকাদান কর্মসূচি, জাতীয় দিবস উদযাপনসহ নানা দায়িত্ব পালন করতে হওয়ায় বিদ্যালয়ে পাঠদানের জন্য কার্যকর শিক্ষক সংখ্যা আরও কমে যায়।
অভিভাবকদের অভিযোগ, শিক্ষক সংকটের কারণে শিশুদের পাঠে আগ্রহ কমে যাচ্ছে। নিয়মিত মূল্যায়ন ও দুর্বল শিক্ষার্থীদের আলাদা সহায়তা না পাওয়ায় অনেকেই কাঙ্ক্ষিত শিখনফল অর্জন করতে পারছে না।
অভিভাবক জুয়েল রাণা বলেন, শিক্ষক সংকটের কারণে শিশুদের ঠিকমতো পড়াশোনা হচ্ছে না। পর্যাপ্ত শিক্ষক থাকলে প্রতিটি শিক্ষার্থীর প্রতি আলাদা নজর দেওয়া যেত। সরকার দ্রুত শূন্য পদগুলো পূরণ করুক।
আরেক অভিভাবক আনিসুর রহমান বলেন, একজন শিক্ষককে একাধিক শ্রেণি সামলাতে হচ্ছে। এতে কোনো শিক্ষার্থীই প্রয়োজনীয় মনোযোগ পাচ্ছে না। শিক্ষার মান ধরে রাখতে দ্রুত শিক্ষক নিয়োগের বিকল্প নেই।
শিক্ষাবিদদের মতে, মানসম্মত প্রাথমিক শিক্ষা নিশ্চিত করতে শুধু নতুন ভবন নির্মাণ বা অবকাঠামো উন্নয়ন যথেষ্ট নয়; প্রয়োজন দক্ষ নেতৃত্ব ও পর্যাপ্ত শিক্ষক। দীর্ঘদিন প্রধান শিক্ষক না থাকলে বিদ্যালয়ের পরিকল্পিত উন্নয়ন, শিক্ষকদের জবাবদিহিতা, শিক্ষার পরিবেশ এবং শিক্ষার্থীদের শিখনফল—সবই ক্ষতিগ্রস্ত হয়। বর্তমানে নতুন শিক্ষাক্রম বাস্তবায়ন, ধারাবাহিক মূল্যায়ন এবং প্রযুক্তিনির্ভর শিক্ষা কার্যক্রম পরিচালনায়ও পর্যাপ্ত শিক্ষক অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।
ব্রাহ্মণপাড়া উপজেলা প্রাথমিক শিক্ষা কর্মকর্তা সৈয়দা হালিমা পারভীন বলেন, উপজেলার অর্ধেকের বেশি সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে প্রধান শিক্ষকের পদ শূন্য রয়েছে। এসব বিদ্যালয়ে সহকারী শিক্ষকরা চলতি দায়িত্ব পালন করছেন। এতে কিছুটা সমস্যা হচ্ছে। তবে ক্লাস্টার কার্যক্রম, নিয়মিত মনিটরিং এবং সহকারী উপজেলা শিক্ষা কর্মকর্তাদের তদারকির মাধ্যমে শিক্ষার মান ধরে রাখার চেষ্টা করা হচ্ছে।
তিনি জানান, শূন্য পদের তথ্য নিয়মিত ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষের কাছে পাঠানো হচ্ছে এবং প্রয়োজনীয় জনবল নিয়োগ হলে পরিস্থিতির উন্নতি হবে।
কুমিল্লা জেলা প্রাথমিক শিক্ষা কর্মকর্তা মনছুর আলী চৌধুরী বলেন, জেলার অধিকাংশ উপজেলায় প্রধান শিক্ষকসহ সহকারী শিক্ষকের কমবেশি শূন্য পদ রয়েছে। জেলাজুড়ে প্রায় ৪০০টি সহকারী শিক্ষকের পদ বর্তমানে শূন্য। বিধিমোতাবেক শর্ত পূরণ সাপেক্ষে চলতি দায়িত্ব পালনকারী ভারপ্রাপ্ত প্রধান শিক্ষকদের পদোন্নতির মাধ্যমে প্রধান শিক্ষক পদে নিয়োগ দেওয়ার বিষয়ে প্রাথমিক শিক্ষা অধিদপ্তরের পরিকল্পনা রয়েছে। পাশাপাশি সারা দেশের শূন্য পদ পূরণের লক্ষ্যে নতুন শিক্ষক নিয়োগের প্রক্রিয়া দ্রুত শুরু হবে বলে মন্ত্রণালয় থেকে জানানো হয়েছে।
তিনি আরও জানান, ২০১৮ সাল থেকে অধিকাংশ বিদ্যালয়ে সহকারী শিক্ষকরা ভারপ্রাপ্ত প্রধান শিক্ষকের দায়িত্ব পালন করে আসছেন। এর মধ্যে অনেকেই ইতোমধ্যে অবসরে চলে গেছেন, ফলে সংকট আরও বেড়েছে।
স্থানীয় সচেতন মহলের দাবি, প্রাথমিক শিক্ষা দেশের শিক্ষা ব্যবস্থার ভিত্তি। তাই ব্রাহ্মণপাড়ার ৬১টি বিদ্যালয়ে প্রধান শিক্ষক এবং ৪১টি সহকারী শিক্ষকের শূন্য পদ দ্রুত পূরণ, প্রয়োজনীয় পদোন্নতি সম্পন্ন এবং নতুন শিক্ষক নিয়োগ নিশ্চিত করা জরুরি। একই সঙ্গে দীর্ঘদিন ভারপ্রাপ্ত দায়িত্ব পালনকারী শিক্ষকদের স্থায়ী পদায়ন করা হলে বিদ্যালয়গুলোর প্রশাসনিক কার্যক্রমে গতি ফিরবে, পাঠদানের মান উন্নত হবে এবং শিক্ষার্থীরা একটি কার্যকর, নিরাপদ ও মানসম্মত শিক্ষার পরিবেশ পাবে।