সরকার বিপুল অঙ্কের রাজস্ব হারাচ্ছে
মনিরুজ্জামান বাবলু, চাঁদপুর
প্রকাশ : ০৭ জুলাই ২০২৬ ১২:২৮ পিএম
আপডেট : ০৭ জুলাই ২০২৬ ১৩:০৯ পিএম
চাঁদপুরের হাজীগঞ্জ পৌরবাস টার্মিনাল। ছবি: প্রতিদিনের বাংলাদেশ
চাঁদপুর বেশিরভাগ যাত্রীবাহী বাসের নেই রোড ফারমিটসহ প্রয়োজনীয় কাগজ-পত্র। এতে বৈধ ও অবৈধ পরিবহনের দ্বন্দ্বে সড়ক পথে যাত্রীদের বাড়ছে হয়রানি। আর সরকার হারাচ্ছে বছরে কোটি কোটি টাকার রাজস্ব।
রোড ফারমিট বিহীন যানবাহন বন্ধে সংশ্লিষ্ট বাংলাদেশ সড়ক পরিবহন কর্তৃপক্ষ (বিআরটিএ) নিরবতা থাকলেও মোবাইল কোর্টের পাশাপাশি অবৈধ পরিবহনের তালিকা তৈরি ও রাজস্ব আয়ের আওতায় আনতে দ্রুত কঠোর পদক্ষেপ নেয়ার আশ্বাস জেলা প্রশাসকের।
চাঁদপুর থেকে রাজধানী ঢাকাসহ দেশের বিভিন্ন প্রান্তে ছুটে যাচ্ছে প্রায় সাত শতাধিক যাত্রীবাহী বাস। যার অর্ধেকের বেশি বাসের নেই রোড ফারমিটসহ প্রয়োজনীয় কাগজ-পত্র।
বেশিরভাগ পরিবহন ১০ থেকে ১২ টি বাসের রোড ফারমিট বা জেলা প্রশাসন থেকে বিশেষ অনুমোদন নিয়ে নামলেও সড়কে দাবড়ে বেড়াছে ৪০ থেকে ৫০ টি করে বাস।
সম্প্রতি বৈধ-অবৈধ বাসের দ্বন্দ্বে ঢাকা-চাঁদপুর সড়কে পদ্মা পরিবহন, হাজীগঞ্জ-কচুয়া-গৌরীপুর- ঢাকা সড়কে আল আরাফাহ এক্সপ্রেস- সুরমা পরিবহনসহ বিভিন্নœ পরিবহন বাঁধা শিকার হয়ে হঠাৎ হঠাৎ বন্ধ রাখা হয়। এতে গাড়ীর শ্রমিক ও যাত্রীরা হয়রানির শিকার হচ্ছে।
বাস চালক হেলাল মিয়া বলেন, 'চাঁদপুরের ভিতরে ২০১১ সাল থেকে কোন রোড ফারমিট হচ্ছে না। আমরা সরকার ইনকাম টেক্স দিয়ে যাচ্ছি, অথচ আমরা রোড ফারমিট পাচ্ছি না। সে কারণে আমাদের গাড়ীগুলো হয়রানির শিকার হচ্ছে, আমরা হয়রানির শিকার হচ্ছে, যাত্রীরাও হয়রানির শিকার হচ্ছে।
এসপি বলছেন, রোড ফারমিট ছাড়া কোনো গাড়ী চলবে না। এই পরিপ্রেক্ষিতে বোগদাদ, আইদি, আরো অন্যান্য জৈনপুরী, সৌদিয়া, হিলশা, সততা- পদ্মা এক্সপ্রেস সবগুলো গাড়ী চলে- তাদেরকে ডির্স্টাব করে না। অথচ আমাদেরকে ডিস্টার্ব করছে- আল-আরাফাহ এক্সপ্রেসকে।'
বোগদাদ পরিবহনের এক শ্রমিক বলেন, '৬ মিনিট পরপর গাড়ী। তারা গাড়ী মাঝখানে এনে গেদারিং করে, যানজট সৃষ্টি করে- রাস্তার মধ্যে, ওনারা সরকারকে টেক্স দেয় না। কাগজপত্রও ওনাদের ঠিক নেই।
আল-আরাফাহ এক্সপ্রেসের ম্যানেজার ফারুক হোসেন, 'বিএরটিএ কাগজ দেওয়া আছে, একটা একটা করে হচ্ছে। বাকী যেগুলো আছে- সেগুলো আমরা আবেদন করে রাখছি- মানি টার্মিনাল বা রাস্তা সংস্কার করলে পরবর্তী সময়ে গাড়ীর কাগজগুলো আস্তে আস্তে দিবে।'
তিনি আরও বলেন, আল- আরাফাহ এক্সপ্রেস আমাদের রোড পারমিট থাকাকালীন শর্তেও আমাদেরকে কচুয়া ও সাচারে গাড়ী বন্ধ রেখে স্টাফদের বকা-বাদ্য-মারধর করছে। দ্বিতীয়ত সুরমার রোড ফারমিট আছে, এক্সপ্রেসের রোড ফারমিট আছে। আল-আরাফাহ স্পেশালের রোড ফারমিট নেই।'
চাঁদপুর থেকে দেশের বিভিন্ন প্রান্তে ছেড়ে যাওয়া যাত্রীবাহী কতটি বাসের রোড ফারমিট রয়েছে, ফিটনেস নেই? তার কোন পরিসংখ্যান নেই জেলা বিআরটিএ অফিসে। জেলা প্রশাসন থেকে চারটি পরিবহনের মাত্র ৩৪ টি বাসের বিশেষ অনুমোদন রয়েছে বলে জানায় জেলা সড়ক পরিবহন কর্তৃপক্ষ।
তবে সংশ্লিষ্ট কেউ এ বিষয়ে বক্তব্য দিতে রাজি না হলেও বেশিরভাগ বাসের রোড পারমিট ও কাগজ-পত্রের স্বচ্ছতা নেই বলে ক্ষোভ প্রকাশ করে উর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষকে দায়ী করছেন স্বয়ং বাস শ্রমিক ও মালিকপক্ষরা।
বাস চালক মিজানুর রহমান বলেন, 'আমিতো ঢাকা-চাঁদপুর পদ্মা এক্সপ্রেস চালাই, এখন সমস্য হইছে এইযে পথেঘাটে যেই ধরণের গাড়ীগুলো চলে, তাদের কোন রোড পারমিট নাই। এখন একটা সার্ভিসের সাথে দুই তিনটা সার্ভিসের পাল্লা চলে। যার কারণে যাত্রীরও সমস্যা হয়, গাড়ীরও সমস্য হয়। সরকারও ঠিকমতো রাজস্ব পায় না। এটা রোডফারমিট ঠিকমতো করে না, রেনু করে না। ফিটনেস তারা কিভাবে লইছে, একমাত্র তারাই বলতে পারবেন। আর আমাদের উধ্বর্তন কর্মকর্তাদের অবহেলা আছে।
পদ্মা বাসের মালিক পক্ষের একজন বলেন,' যেই জায়গায় মানুষের ছেড়ে হয়ে গেছে গাড়ী বেশি। আমাদের কিছু অবৈধ গাড়ী আছে। রাস্তায় চলে, রোড পারমিট নাই। আমাদের বৈধ গাড়ী আছে, রোট ফারমিট আছে- কিন্তু চালাইতে পারছি না। আমাদের মালিক সমিতি বারবার ডিসি, এসপির সঙ্গে মিটিং করছে- তারা কোনো এটার ভূমিকা নিতে পারছে না। যে হিসেবে রোড ফারমিট ছিল বা আছে , সে থেকে ৫ থেকে ৬ গুণ গাড়ী এখন চলছে। কিন্তু এগুলো ফারমিট বিহীন। তো এগুলো আপানার বা বিআরটিএ মাধ্যমে সরকারের মাধ্যমে আবেদন জানাই- যে জিনিসগুলো সমাধানের জন্য।
হাজীগঞ্জ বাজারের ট্রাফিক পুলিশ বলেন,' আমাদের উর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষের সিদ্ধান্তনুযায়ী- ঢাকা-হাজীগঞ্জ রোডে কচুয়া রোড দিয়ে যেই গাড়ীগুলো যাবে- তাদের অবশ্যই রোড পারমিট থাকবে। এখন যে সমস্ত গাড়ীর রোড ফারমিট নেই, সেই সমস্ত গাড়ীকে আমরা যেতে দিচ্ছি না। আর শুধু মাত্র ঐ গাড়ী যাচ্ছে- যে গাড়ীর রোড ফারমিট আছে এবং অন্যান্য কাগজপত্র সঠিক আছে।'
চাঁদপুর-হাজীগঞ্জ-কচুয়া-ঢাকা সড়কে আল-আরাফাহ এক্সপ্রেস প্রায় ৬০, আল আরাফাহ স্পেশাল ৩০, সুরমা পরিবহন প্রায় ২শ, চাঁদপুর-কুমিল্লা সড়কে বোগদাদ পরিবহন ৯০, আইদি ৪০, চাঁদপুর-লক্ষীপুর-নোয়াখালী সড়কে আনন্দ ৩০, বাবুরহাট-মতলব-ঢাকা সড়কে জৈনপুরী পরিবহন ও এক্সপ্রেস শতাধিক, মতলব এক্সপ্রেস ৫০, চাঁদপুর-কক্সবাজার-চট্টগ্রাম-সিলেট সড়কে সততা, একতা, সৌদিয়া, ইলিশের বাড়ী চাঁদপুর, হিলশা ও রুপসী চাঁদপুর পরিবহনের অর্ধশত বাসসহ সাত শতাধিক বাস রয়েছে।
কিছু বাস রোড ফারমিট ছাড়া অবৈধভাবে চলছে জানিয়ে জেলা প্রশাসক বলেছেন, অবৈধ বাসের তালিকা করে দ্রুত কঠোর পদক্ষেপের পাশাপাশি পরিবহন খাতে সরকারের রাজস্ব আয় নিশ্চিত করতে উদ্যোগ নেয়া হবে বলে জানান জেলা প্রশাসক আহমেদ জিয়াউর রহমান।
তিনি বলেন, চাঁদপুর থেকে কুমিল্লা, এবং চাঁদপুর থেকে ঢাকাগামী কিছু বাস রোড ফারমিট ছাড়া অবৈধভাবে চলছে বলে আমাদের নজরে এসেছে। এখন আমরা হোম ওয়ার্কের কাজটা করছি। তালিকা তৈরি করছি। এবং অতিদ্রুতই আমরা এই ব্যবস্থা নিবো । ইতোমধ্যে আমাদের মোবাইল কোর্ট এই লাইনে সচল আছে। আশা করি অল্প কিছু দিনের মধ্যে কাজটা শেষ হয়ে গেলে আমরা দ্রুত কঠোর ব্যবস্থা নিবো।
তিনি আরও বলেন, যদি রোড ফারমিট না নিয়ে করোর কোনো গাড়ী রাস্তা চলাচল করে তাতে সরকার রাজস্ব হারায়। আমরা চেষ্টা করবো এই ক্ষতি কমিয়ে আনা। আমরা যদি রোড ফারমিট ইনশিউর করে রাস্তায় চলাচল করতে পারি, তাহলে সরকার যেমন রাজস্ব নিশ্চিত হবে, একইভাবে একটি ফিটনেসযুক্ত, রোড ফারমিটযুক্ত একটি গাড়ী সড়ক পরিবহনে থাকে- এটা সাধারণ মানুষেরও দুভোর্গ লাঘব হবে।'
সড়ক আইনে যাত্রীবাহী বাসের রোড ফারমিট, টেস্ট টোকেন, ফিটনেস, আয়কর বাবদ প্রতি বছর সরকারের বিভিন্ন দপ্তরের ৪০ থেকে ৫০ হাজার টাকা জমা দেয়ার বিধান রয়েছে। গড়ে প্রতিবছর চাঁদপুরে যাত্রীবাহী বাস থেকে সরকার ৩/৪ কোটি টাকার রাজস্ব হারাচ্ছে।