সাইফুল হক মোল্লা দুলু, মধ্যাঞ্চল
প্রকাশ : ১ ঘণ্টা আগে
আপডেট : ৪৭ মিনিট আগে
কিশোরগঞ্জের নিকলী হাওড় এলাকা। ছবি: প্রতিদিনের বাংলাদেশ
বর্ষা মৌসুম শুরু হলেও প্রকৃতির প্রত্যাশিত রূপ এখনো ধরা দেয়নি কিশোরগঞ্জের নিকলী হাওড়ে।
অন্যান্য বছরের মতো বিস্তীর্ণ জলরাশি, নৌকার সারি আর হাজারো পর্যটকের কোলাহলে মুখর হওয়ার কথা থাকলেও এবার তার উল্টো চিত্র।
আগাম পানি নেমে যাওয়া, পর্যাপ্ত বৃষ্টিপাত না হওয়া, হাওড়ে জলরাশির সংকট, পর্যটকদের নিরাপত্তা ও ব্যবস্থাপনার ঘাটতি এবং কিছু ক্ষেত্রে অতিরিক্ত ভাড়ার অভিযোগ—সব মিলিয়ে ভাটা পড়েছে নিকলী হাওড়কেন্দ্রিক পর্যটন শিল্পে।
একসময় যেখানে ছুটির দিনগুলোতে তিল ধারণের ঠাঁই থাকত না, সেখানে এখন দিনের বেশির ভাগ সময়ই বিরাজ করছে নীরবতা।
পর্যটক না থাকায় অলস সময় কাটাচ্ছেন নৌকার মাঝিরা। বেচাকেনা নেই ঘাটের হোটেল, রেস্তোরাঁ, কফি হাউস, মুদি দোকান কিংবা ভ্রাম্যমাণ ব্যবসায়ীদের।
পর্যটননির্ভর এই অঞ্চলের হাজারো মানুষের জীবিকায় নেমে এসেছে চরম অনিশ্চয়তা।
স্থানীয়দের দাবি, পর্যটক সংকট দীর্ঘায়িত হলে আরও অনেক ব্যবসাপ্রতিষ্ঠান বন্ধ হয়ে যেতে পারে। সম্প্রতি সরেজমিনে নিকলী উপজেলার বেড়িবাঁধ, নৌঘাট ও আশপাশের পর্যটনকেন্দ্র ঘুরে এমন চিত্র দেখা গেছে।
পর্যটক না থাকায় অলস পড়ে আছে নৌকা। ছবি: প্রতিদিনের বাংলাদেশবাংলাদেশের হাওড়াঞ্চলের অন্যতম আকর্ষণীয় পর্যটন গন্তব্য কিশোরগঞ্জের নিকলী হাওড়। বর্ষা এলেই প্রকৃতির অপরূপ সৌন্দর্যে সেজে ওঠে এই বিস্তীর্ণ জলরাশি। আকাশ আর পানির মিলন, দিগন্তজোড়া নীল জল, সবুজের সমারোহ এবং নৌকাভ্রমণের অনন্য অভিজ্ঞতা উপভোগ করতে প্রতিবছর লাখো পর্যটক ছুটে আসেন এখানে। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে নিকলী হাওড়ের সৌন্দর্যের ছবি ও ভিডিও ছড়িয়ে পড়ার পর গত কয়েক বছরে এটি দেশের অন্যতম জনপ্রিয় বর্ষাকালীন পর্যটনকেন্দ্রে পরিণত হয়েছে।
শুধু সৌন্দর্য নয়, এই পর্যটনকে ঘিরে গড়ে উঠেছে একটি বিশাল স্থানীয় অর্থনীতি। নৌকার মাঝি, স্পিডবোট চালক, হোটেল-রেস্তোরাঁ, কফি শপ, মুদি দোকান, মাছ বিক্রেতা, পরিবহন শ্রমিক, ভ্রাম্যমাণ ব্যবসায়ী, ফটোগ্রাফার, স্থানীয় গাইড—সব মিলিয়ে হাজারো পরিবার তাদের জীবিকা নির্বাহ করছে এই পর্যটনের ওপর নির্ভর করে। ফলে পর্যটক কমে যাওয়া মানেই পুরো অঞ্চলের অর্থনীতিতে বড় ধরনের নেতিবাচক প্রভাব।
বর্ষা মৌসুমে বেড়িবাঁধ এলাকায় সাধারণত সকাল থেকেই দেশের বিভিন্ন প্রান্ত থেকে আসা পর্যটকদের ভিড় জমে। ঘাটজুড়ে নৌকার সারি, স্পিডবোটের ব্যস্ততা, হোটেল-রেস্তোরাঁয় উপচে পড়া ভিড় এবং পুরো এলাকা উৎসবমুখর পরিবেশে মুখর থাকে। কিন্তু এবার সেই চেনা দৃশ্য অনেকটাই অনুপস্থিত। সারি সারি নৌকা ঘাটে বাঁধা থাকলেও যাত্রী না থাকায় সেগুলো দিনের পর দিন অলস পড়ে আছে। স্পিডবোটের ইঞ্জিন বন্ধ। সকাল থেকে সন্ধ্যা পর্যন্ত অনেক মাঝিই একটি ট্রিপও পাচ্ছেন না।
স্থানীয়রা জানান, গত কয়েক বছরে নিকলী হাওড়কে কেন্দ্র করে একটি সম্ভাবনাময় পর্যটন অর্থনীতি গড়ে উঠেছিল। বর্ষা এলেই ঢাকা, চট্টগ্রাম, সিলেট, ময়মনসিংহ, টাঙ্গাইল, গাজীপুরসহ দেশের বিভিন্ন জেলা থেকে হাজার হাজার পর্যটক এখানে ভিড় করতেন। নৌকা কিংবা স্পিডবোটে করে তারা ইটনা, মিঠামইন, অষ্টগ্রামের অলওয়েদার সড়ক, ছাতিরচরের করচবন, সাবেক রাষ্ট্রপতির বাড়ি, প্রেসিডেন্ট রিসোর্টসহ বিভিন্ন দর্শনীয় স্থান ঘুরে দেখতেন। পর্যটকদের ঘিরে গড়ে ওঠে শত শত হোটেল, রেস্তোরাঁ, কফি শপ, মুদি দোকান, ভ্রাম্যমাণ খাবারের দোকান, ফটোগ্রাফি, নৌকা ও স্পিডবোট ভাড়া, গাইডিংসহ নানা ধরনের ব্যবসা। হাজার হাজার মানুষ প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষভাবে জীবিকা নির্বাহ করতে শুরু করেন।
জানা যায়, ২০২০ সালে প্রায় ৯০০ কোটি টাকা ব্যয়ে ইটনা-মিঠামইন-অষ্টগ্রাম অলওয়েদার সড়ক নির্মাণের পর নিকলী হাওড়ে পর্যটকের সংখ্যা কয়েক গুণ বেড়ে যায়। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে হাওড়ের সৌন্দর্যের ছবি ও ভিডিও ছড়িয়ে পড়ার পর দেশের অন্যতম জনপ্রিয় বর্ষাকালীন পর্যটন গন্তব্যে পরিণত হয় নিকলী। স্থানীয়দের মতে, বর্তমানে প্রায় ১০ হাজার নৌকার মাঝিসহ কয়েক হাজার ক্ষুদ্র ব্যবসায়ী এই পর্যটন শিল্পের ওপর নির্ভরশীল।
কিন্তু চলতি মৌসুমে পরিস্থিতি সম্পূর্ণ ভিন্ন। আগাম পানি নেমে যাওয়ায় হাওড়ে পর্যাপ্ত জলরাশি সৃষ্টি হয়নি। অনেক এলাকায় নৌকা চলাচলেও সমস্যা হচ্ছে। পাশাপাশি পর্যাপ্ত লাইফ জ্যাকেট, উদ্ধার সরঞ্জাম, সতর্কতামূলক সাইনবোর্ড, প্রশিক্ষিত উদ্ধারকর্মী এবং নিয়মিত তদারকির অভাবও পর্যটকদের মধ্যে নিরাপত্তা নিয়ে উদ্বেগ তৈরি করছে। এসব কারণে অনেকেই নিকলীতে না এসে অন্য পর্যটনকেন্দ্র বেছে নিচ্ছেন বলে মনে করছেন স্থানীয়রা।
স্থানীয়দের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, একটি মাঝারি আকারের নৌকা প্রতিদিন একাধিক ট্রিপ দিয়ে কয়েক হাজার টাকা আয় করত। ছুটির দিনে সেই আয় আরও বেশি হতো। একইভাবে হোটেল, রেস্তোরাঁ, চায়ের দোকান ও কফি শপগুলোতেও পর্যটকের ভিড়ে বসার জায়গা পাওয়া যেত না। বর্তমানে অধিকাংশ দোকানে সারাদিনে কয়েকজন ক্রেতাও আসছেন না। ফলে দোকান ভাড়া, বিদ্যুৎ বিল, কর্মচারীদের বেতন এবং ঋণের কিস্তি পরিশোধ করতেই হিমশিম খেতে হচ্ছে ব্যবসায়ীদের। তাদের দাবি, পর্যটন খাতে এই স্থবিরতা অব্যাহত থাকলে বহু ক্ষুদ্র উদ্যোক্তা ব্যবসা গুটিয়ে ফেলতে বাধ্য হবেন। এতে বেকারত্ব বাড়বে এবং স্থানীয় অর্থনীতিতে দীর্ঘমেয়াদি নেতিবাচক প্রভাব পড়বে।
স্থানীয় প্রবীণদের মতে, কয়েক বছর আগেও বর্ষা শুরু হওয়ার সঙ্গে সঙ্গে নিকলী হাওড় কানায় কানায় পূর্ণ হয়ে যেত। দূর-দূরান্ত পর্যন্ত শুধু পানি আর পানি দেখা যেত। কিন্তু জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাব, অনিয়মিত বৃষ্টিপাত এবং আগাম পানি নেমে যাওয়ার কারণে গত কয়েক বছরে হাওড়ের স্বাভাবিক জলাবদ্ধতার চিত্র বদলাতে শুরু করেছে। এবার তার প্রভাব আরও প্রকট। অনেক এলাকায় পানি কমে যাওয়ায় বড় নৌকা চলাচলে সমস্যা হচ্ছে। কোথাও কোথাও কচুরিপানা ও পলি জমে নৌপথও সরু হয়ে গেছে। স্থানীয়দের দাবি, শুধু পর্যটনের স্বার্থেই নয়, হাওড়ের পরিবেশ ও জীববৈচিত্র্য রক্ষার স্বার্থেও দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা গ্রহণ জরুরি। নইলে ভবিষ্যতে হাওড়ের প্রাকৃতিক সৌন্দর্য এবং পর্যটনের আকর্ষণ দুটোই ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারে।
পর্যটন সংশ্লিষ্টদের দাবি, একসময় সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে নিকলী হাওড় নিয়ে ব্যাপক প্রচারণা ছিল। বিভিন্ন ইউটিউবার, ট্রাভেল ব্লগার ও কনটেন্ট নির্মাতারা নিয়মিত ভিডিও প্রকাশ করতেন। কিন্তু সাম্প্রতিক সময়ে পর্যাপ্ত পানি না থাকায় সেই প্রচারণাও কমে গেছে। ফলে নতুন পর্যটকদের আগ্রহেও কিছুটা ভাটা পড়েছে। তারা মনে করেন, সরকারি ও বেসরকারি উদ্যোগে পরিকল্পিত প্রচারণা চালানো হলে এবং বর্ষার উপযুক্ত সময়ে বিভিন্ন পর্যটন উৎসব আয়োজন করা গেলে নিকলী হাওড় আবারও আগের জনপ্রিয়তা ফিরে পেতে পারে।
নিকলী হাওড়ে পর্যটনের বিকাশ শুধু একটি ভ্রমণকেন্দ্র তৈরি করেনি, বরং পুরো অঞ্চলের অর্থনীতির চিত্র বদলে দিয়েছিল। কয়েক বছর আগেও যেখানে বর্ষা মৌসুমে সীমিত আয়ের কৃষক ও জেলেরা বিকল্প কর্মসংস্থানের তেমন সুযোগ পেতেন না, সেখানে পর্যটনের প্রসারের ফলে হাজারো মানুষ নতুন আয়ের পথ খুঁজে পান। অনেকেই ব্যাংক ঋণ কিংবা এনজিও থেকে ঋণ নিয়ে পর্যটকদের জন্য বড় নৌকা, কোষা নৌকা ও স্পিডবোট কিনেছেন। কেউ গড়ে তুলেছেন ছোট-বড় হোটেল, রেস্তোরাঁ, কফি শপ কিংবা খাবারের দোকান। আবার অনেকে পর্যটকদের ছবি তুলে, স্থানীয় পণ্য বিক্রি করে বা গাইড হিসেবে কাজ করে সংসারের হাল ধরেছেন। কিন্তু চলতি মৌসুমে সেই পুরো অর্থনৈতিক চক্র অনেকটাই থমকে গেছে। প্রতিদিন যে অর্থ লেনদেন হওয়ার কথা ছিল, তা এখন অনেক কমে গেছে। ঘাটে নৌকা থাকলেও যাত্রী নেই, দোকান খোলা থাকলেও ক্রেতা নেই, হোটেলে কক্ষ খালি পড়ে আছে। এতে শুধু ব্যবসায়ীরাই নন, তাদের সঙ্গে যুক্ত শ্রমিক, কর্মচারী ও দিনমজুররাও কাজ হারানোর শঙ্কায় রয়েছেন।
তবে সীমিত সংখ্যক পর্যটক এখনও নিকলীতে আসছেন। ঢাকা থেকে পরিবার নিয়ে ঘুরতে আসা সাথী আক্তার বলেন, “অনেক দিন ধরেই নিকলী হাওড়ে আসার ইচ্ছা ছিল। ফেসবুক, ইউটিউবসহ বিভিন্ন সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে হাওড়ের অসংখ্য ভিডিও ও ছবি দেখে জায়গাটির প্রতি আলাদা আকর্ষণ তৈরি হয়। তাই ছুটির সুযোগ পেয়ে পরিবার নিয়ে চলে এসেছি। বাস্তবে এসে দেখলাম, জায়গাটি সত্যিই অনেক সুন্দর। চারদিকে বিস্তীর্ণ জলরাশি, খোলা আকাশ, সবুজ প্রকৃতি আর নির্মল পরিবেশ মনকে অন্যরকম প্রশান্তি দেয়। শহরের ব্যস্ত জীবন থেকে কিছুটা সময় প্রকৃতির মাঝে কাটানোর জন্য এটি দারুণ একটি স্থান। বিশেষ করে বিকেলের দিকে সূর্যের আলো যখন পানির ওপর পড়ে, তখন হাওড়ের সৌন্দর্য আরও কয়েক গুণ বেড়ে যায়। আমরা নৌকায় করে কয়েক ঘণ্টা ঘুরব, প্রকৃতির সৌন্দর্য উপভোগ করব এবং পরিবারের সঙ্গে সুন্দর কিছু সময় কাটাব। তবে পানি যদি আরও বেশি থাকত, তাহলে অভিজ্ঞতাটা আরও উপভোগ্য হতো।”
ষষ্ঠ শ্রেণির এক শিক্ষার্থী সারা বলেন, “অনেক দিন ধরেই বাবা-মাকে বলছিলাম আমাকে নিকলী হাওড়ে নিয়ে আসার জন্য। স্কুলে বন্ধুদের কাছ থেকেও এই জায়গার অনেক গল্প শুনেছি। আজ ছুটির সুযোগে সবাই মিলে এখানে এসেছি। চারদিকে শুধু পানি, নৌকা আর প্রাকৃতিক সৌন্দর্য দেখে আমার খুব ভালো লাগছে। নৌকায় ঘুরতে অনেক মজা লাগছে। মোবাইলে অনেক ছবি তুলেছি। সুযোগ পেলে আবারও এখানে আসতে চাই। আমার মনে হয়, যারা এখনো নিকলী হাওড়ে আসেননি, তাদের একবার হলেও এখানে ঘুরতে আসা উচিত।”
টাঙ্গাইল থেকে বন্ধুদের নিয়ে আসা মোহাম্মদ বেলাল হোসেন বলেন, “অনলাইনে নিকলী হাওড়ের অনেক ভিডিও দেখেছি। তখন থেকেই বন্ধুদের নিয়ে এখানে আসার পরিকল্পনা করি। অবশেষে আজ সেই ইচ্ছা পূরণ হলো। জায়গাটি সত্যিই অনেক সুন্দর এবং প্রাকৃতিক সৌন্দর্যে ভরপুর। তবে এখানে আসার পথে যোগাযোগ ব্যবস্থার কিছু সীমাবদ্ধতা রয়েছে। রাস্তাঘাট আরও উন্নত করা গেলে এবং পর্যটকদের জন্য প্রয়োজনীয় সুযোগ-সুবিধা বাড়ানো হলে দেশের বিভিন্ন প্রান্ত থেকে আরও বেশি মানুষ এখানে আসবেন। এতে স্থানীয় অর্থনীতিও সমৃদ্ধ হবে।”
একই জেলার আরেক পর্যটক মো. কামরুল হাসান বলেন, “আমরা ১১টি মোটরসাইকেলে প্রায় ২৬ থেকে ২৭ জন বন্ধু একসঙ্গে এখানে এসেছি। সবাই মিলে একটি সুন্দর সময় কাটানোর পরিকল্পনা ছিল। জায়গাটি ভালো লাগলেও এবার পানির পরিমাণ তুলনামূলক কম, তাই হাওড়ের প্রকৃত সৌন্দর্য পুরোপুরি উপভোগ করা সম্ভব হয়নি। এছাড়া রাস্তাঘাট আরও উন্নত করা, পর্যটন এলাকাগুলো পরিষ্কার-পরিচ্ছন্ন রাখা এবং নিরাপত্তা ব্যবস্থা জোরদার করা প্রয়োজন। নৌকা ভাড়া ও কিছু খাবারের দামও তুলনামূলক বেশি মনে হয়েছে। প্রশাসন যদি এসব বিষয়ে নজর দেয়, তাহলে পর্যটকদের ভোগান্তি কমবে এবং নিকলী হাওড় আরও জনপ্রিয় পর্যটনকেন্দ্রে পরিণত হবে।”
গাজীপুর থেকে পরিবার নিয়ে আসা মোহাম্মদ তুষার আহমেদ বলেন, “অনেক দিন ধরেই নিকলী হাওড়ে আসার পরিকল্পনা ছিল। বিভিন্ন জায়গা ঘুরেছি, তবে হাওড়ের মতো এমন বিশাল প্রাকৃতিক সৌন্দর্য খুব কম জায়গাতেই দেখা যায়। এখানে এসে সত্যিই ভালো লাগছে। তবে পানির পরিমাণ আরও বেশি থাকলে হাওড়ের সৌন্দর্য কয়েক গুণ বেড়ে যেত। আশা করছি, বর্ষার পুরো মৌসুমে পানি বাড়লে আবারও পরিবার নিয়ে এখানে আসব।”
শুধু পর্যটকরাই নন, স্থানীয় বাসিন্দারাও পর্যটন ব্যবস্থাপনার বিভিন্ন সীমাবদ্ধতার কথা তুলে ধরছেন। স্থানীয় বাসিন্দা মোহাম্মদ রাকিবুল ইসলাম বলেন, “নিকলী হাওড়ের সৌন্দর্য দেশের অন্যতম আকর্ষণ হলেও কিছু অসাধু ব্যবসায়ীর কারণে পুরো এলাকার ভাবমূর্তি ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে। বাইরে থেকে আসা অনেক পর্যটকের কাছ থেকে অতিরিক্ত দাম নেওয়ার অভিযোগ প্রায়ই শোনা যায়। এতে পর্যটকদের মধ্যে নেতিবাচক ধারণা তৈরি হয়। প্রশাসনের উচিত নিয়মিত বাজার মনিটরিং করা এবং নির্ধারিত মূল্যতালিকা নিশ্চিত করা। পাশাপাশি নৌকায় বাধ্যতামূলক লাইফ জ্যাকেট, হাওড়জুড়ে সতর্কতামূলক সাইনবোর্ড, জরুরি উদ্ধার ব্যবস্থা এবং পর্যাপ্ত নিরাপত্তা নিশ্চিত করা। তাহলেই পর্যটকরা আরও স্বস্তি নিয়ে এখানে ঘুরতে পারবেন।”
পর্যটক কমে যাওয়ার সবচেয়ে বড় ধাক্কা লেগেছে নৌকার মাঝিদের জীবনে। লাখ লাখ টাকা ব্যয় করে নৌকা তৈরি করলেও এখন সেগুলো দিনের পর দিন ঘাটেই পড়ে আছে। নৌকার মাঝি হেলাল উদ্দিন বলেন, “লাখ লাখ টাকা খরচ করে পর্যটকদের জন্য নৌকা বানিয়েছি। অন্য বছর এই সময় নৌকা নিয়ে ব্যস্ত থাকতে হতো। কিন্তু এবার পানি কম থাকায় নৌকা ঠিকমতো চলছেই না। পর্যটকও নেই। সারাদিন ঘাটে বসে থাকতে হয়, কোনো আয়-রোজগার নেই। সংসার চালানো কঠিন হয়ে গেছে। পরিবার নিয়ে খুব কষ্টে দিন কাটছে।”
আরেক স্পিডবোটের মাঝি মোহাম্মদ মেহেদী হাসান বলেন, “হাজার হাজার নৌকা এখন ঘাটে পড়ে আছে। পর্যটক এত কম যে একজন যাত্রী পেলেও মাঝিদের মধ্যে প্রতিযোগিতা শুরু হয়ে যায়। আগে দিনে কয়েকটি ট্রিপ দেওয়া যেত, এখন অনেক দিন একটি ট্রিপও মেলে না। আমরা সবাই অপেক্ষা করছি পানি বাড়ার। পানি বাড়লেই পর্যটক আসবে, তখন আবার কাজের সুযোগ তৈরি হবে।”
কোষা নৌকার মাঝি ইছব আলী জানান, কয়েক বছর আগে ভয়াবহ বন্যায় ধানের ফসল নষ্ট হওয়ার পর ধারদেনা করে একটি কোষা নৌকা কিনেছিলেন। আশা করেছিলেন পর্যটকদের নিয়ে নৌকা চালিয়ে সংসার চালাবেন এবং ধীরে ধীরে ঋণ পরিশোধ করবেন। কিন্তু এবার হাওড়ে পর্যাপ্ত পানি না থাকায় সেই নৌকাও প্রায় অচল হয়ে পড়েছে। ফলে আয়-রোজগার বন্ধ হওয়ার পাশাপাশি ঋণের কিস্তি পরিশোধ এবং পরিবারের দৈনন্দিন খরচ চালাতেও তাকে চরম সংকটে পড়তে হচ্ছে।
পর্যটক কমে যাওয়ায় হোটেল, রেস্তোরাঁ ও দোকানপাটেও নেমে এসেছে তীব্র মন্দা। হোটেল কর্মচারী মোহাম্মদ মুমিন বলেন, “আগে প্রতিদিন অনেক পর্যটক আসতেন। হোটেল সারাক্ষণ ব্যস্ত থাকত। এখন মানুষ না থাকায় বিক্রি একেবারে কমে গেছে। সারাদিন বসে থেকেও তেমন কোনো ক্রেতা পাওয়া যায় না। ব্যবসার অবস্থা খুব খারাপ। আমরা আশা করছি, পানি বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে আবার পর্যটক বাড়বে এবং আগের মতো কর্মচাঞ্চল্য ফিরে আসবে।”
মুদি দোকানি মুহাম্মদ ওসমান বলেন, “এবার হাওড়ে পানি কম থাকায় পর্যটকের সংখ্যাও অনেক কম। অথচ জ্বালানি তেলের দাম, দোকান ভাড়া, কর্মচারীর বেতনসহ সব ধরনের খরচ আগের তুলনায় বেড়েছে। কিন্তু বিক্রি না থাকায় ব্যবসা টিকিয়ে রাখাই কঠিন হয়ে পড়েছে। দ্রুত পানি বাড়লে আবার মানুষ আসবে বলে আশা করছি। একই সঙ্গে প্রশাসনের উচিত পর্যটকদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে লাইফ জ্যাকেট, উদ্ধার সরঞ্জাম, পর্যাপ্ত আলোর ব্যবস্থা এবং সতর্কতামূলক সাইনবোর্ড স্থাপন করা।”
স্থানীয় ব্যবসায়ীরা জানান, পর্যটক কমে যাওয়ার প্রভাব শুধু নৌকার মাঝি বা হোটেল ব্যবসায়ীদের মধ্যেই সীমাবদ্ধ নেই। ক্ষতির মুখে পড়েছেন ফটোগ্রাফার, ভ্রাম্যমাণ খাবার বিক্রেতা, চা দোকানি, পরিবহন শ্রমিক, মাছ বিক্রেতা, কফি শপের মালিকসহ পর্যটননির্ভর অসংখ্য ক্ষুদ্র ব্যবসায়ী। পর্যটকের অভাবে অনেক ছোট ব্যবসাপ্রতিষ্ঠান ইতোমধ্যে বন্ধ হয়ে গেছে। কেউ কেউ লোকসান সামলাতে কর্মচারী ছাঁটাই করতে বাধ্য হয়েছেন। স্থানীয়দের আশঙ্কা, দ্রুত পরিস্থিতির উন্নতি না হলে নিকলী হাওড়কেন্দ্রিক পর্যটন অর্থনীতি আরও বড় সংকটে পড়বে।
স্থানীয়দের মতে, নিকলী হাওড়ের পর্যটন সম্ভাবনা এখনও অনেক বেশি। তবে সেই সম্ভাবনাকে কাজে লাগাতে হলে সমন্বিত পরিকল্পনা গ্রহণ জরুরি। তারা হাওড় এলাকায় নিয়মিত পরিচ্ছন্নতা অভিযান, পর্যটকবান্ধব নিরাপত্তা ব্যবস্থা, পর্যাপ্ত লাইফ জ্যাকেট ও উদ্ধার সরঞ্জাম, সতর্কতামূলক সাইনবোর্ড স্থাপন, দ্রব্যমূল্য ও নৌকা ভাড়া নিয়ন্ত্রণ, অসাধু ব্যবসায়ীদের বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা, যোগাযোগ ব্যবস্থার উন্নয়ন এবং পর্যটন ব্যবস্থাপনায় কার্যকর তদারকির দাবি জানিয়েছেন। তাদের বিশ্বাস, বর্ষার পানি স্বাভাবিকভাবে বৃদ্ধি পেলে এবং প্রশাসনের সমন্বিত উদ্যোগ বাস্তবায়িত হলে নিকলী হাওড় খুব দ্রুতই আবার প্রাণ ফিরে পাবে। তখন ঘাটে ফিরবে নৌকার ব্যস্ততা, হোটেল-রেস্তোরাঁয় বাড়বে ক্রেতার ভিড়, কর্মসংস্থান ফিরে পাবেন হাজারো মানুষ এবং দেশের অন্যতম জনপ্রিয় বর্ষাকালীন পর্যটন গন্তব্য হিসেবে নিকলী হাওড় আবারও নতুন উদ্যমে মাথা তুলে দাঁড়াবে।
পর্যটন সংশ্লিষ্টরা মনে করেন, নিকলী হাওড়ের সম্ভাবনা এখনও শেষ হয়ে যায়নি। বরং সঠিক পরিকল্পনা, নিরাপদ নৌভ্রমণ, মানসম্মত পর্যটনসেবা, পরিবেশ সংরক্ষণ, আধুনিক অবকাঠামো, মূল্য নিয়ন্ত্রণ এবং কার্যকর প্রচারণার মাধ্যমে নিকলী হাওড়কে আন্তর্জাতিক মানের একটি ইকো-ট্যুরিজম গন্তব্য হিসেবে গড়ে তোলা সম্ভব। এতে শুধু পর্যটনই নয়, পুরো হাওড়াঞ্চলের অর্থনীতিতে নতুন গতি আসবে এবং হাজারো মানুষের কর্মসংস্থান আরও শক্তিশালী হবে।
সার্বিক নিরাপত্তা ও পর্যটন ব্যবস্থাপনা নিয়ে জানতে চাইলে নিকলী থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) মো. মাহবুবুর রহমান বলেন, নতুন পুলিশ সুপার দায়িত্ব গ্রহণের পর থেকেই নিকলী ও করিমগঞ্জ—এই দুই গুরুত্বপূর্ণ পর্যটন প্রবেশপথকে কেন্দ্র করে বিশেষ গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে। দেশের বিভিন্ন প্রান্ত থেকে আগত পর্যটকরা যাতে নিরাপদ ও নির্বিঘ্নে হাওড় ভ্রমণ করে সন্তুষ্টচিত্তে ফিরে যেতে পারেন, সে লক্ষ্যে জেলা পুলিশ ইতোমধ্যে একাধিক সমন্বয় সভা করেছে। এসব সভায় হোটেল ও আবাসিক হোটেল মালিক, রিসোর্ট কর্তৃপক্ষ, নৌকা ও স্পিডবোট মালিক, সাংবাদিকসহ সংশ্লিষ্ট অংশীজনরা অংশ নিয়েছেন। পর্যটকদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে নদীপথে টহল জোরদার, নৌ পুলিশ ও ট্যুরিস্ট পুলিশকে সম্পৃক্ত করা, স্বেচ্ছাসেবকভিত্তিক ট্রাফিক ব্যবস্থাপনা এবং সার্বিক নজরদারি বৃদ্ধিসহ বিভিন্ন উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে।
ওসি আরও বলেন, উপজেলা প্রশাসন ও জেলা প্রশাসনের সঙ্গে সমন্বয় করে পর্যটকদের জন্য প্রয়োজনীয় সুযোগ-সুবিধা বাড়ানোর উদ্যোগও নেওয়া হচ্ছে। এর মধ্যে পোশাক পরিবর্তনের ব্যবস্থা, তথ্য ও সহায়তা প্রদানের জন্য একটি কমান্ড ও কন্ট্রোল সেন্টার স্থাপনের পরিকল্পনা রয়েছে। পাশাপাশি পর্যটকদের যেকোনো সমস্যায় জেলা পুলিশের পক্ষ থেকে সর্বাত্মক সহযোগিতা দেওয়া হবে। সামনে পর্যটকের সংখ্যা আরও বাড়বে বলে আশা করা হচ্ছে। সেই পরিস্থিতি মোকাবিলায় পুলিশ সুপারের নেতৃত্বে নিকলী থানা পুলিশ সর্বদা মাঠে থেকে পর্যটকদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে কাজ করবে। পর্যটকদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে পুলিশ প্রশাসন সর্বদা তৎপর রয়েছে। নির্দিষ্ট পয়েন্টগুলোতে নজরদারি বাড়ানো হবে।
এ বিষয়ে নিকলী উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) মো. শহীদউল্লাহ বলেন, বর্ষা মৌসুমে নিকলী হাওড়ে দেশের বিভিন্ন অঞ্চল থেকে বিপুলসংখ্যক পর্যটকের সমাগম ঘটে। তাই পর্যটকদের নিরাপদ ও নির্বিঘ্ন ভ্রমণ নিশ্চিত করতে উপজেলা প্রশাসন সার্বিক প্রস্তুতি গ্রহণ করছে। প্রশাসনের প্রধান লক্ষ্য হচ্ছে পর্যটক পরিবহনে নিয়োজিত হাউস বোট ও নৌযান পরিচালনাকারীদের সঙ্গে সমন্বয় বজায় রাখা, পর্যটন এলাকার রাস্তাঘাট পরিষ্কার-পরিচ্ছন্ন রাখা এবং প্রয়োজনীয় সেবার মান নিশ্চিত করা। যেহেতু এখনও হাওড়ে পর্যাপ্ত পানি আসেনি, তাই নৌযানের ভাড়াসহ সংশ্লিষ্ট বিষয়গুলো এখনো নির্ধারণ করা হয়নি। পানি বাড়লেই সংশ্লিষ্টদের সঙ্গে আলোচনা করে ভাড়া নির্ধারণ করা হবে।
ইউএনও আরও বলেন, আগাম বন্যায় ক্ষতিগ্রস্ত কৃষকদের ধান মাড়াইসহ বিভিন্ন কাজ হাওড়সংলগ্ন সড়কে করতে হয়েছে। ফলে সেসব এলাকায় পরিচ্ছন্নতা কার্যক্রম চালানোর জন্য ইতোমধ্যে নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে এবং প্রশাসন এ বিষয়ে কাজ করছে।
পর্যটকদের নিরাপত্তা ও হয়রানি প্রতিরোধ প্রসঙ্গে তিনি বলেন, উপজেলা প্রশাসন ও নিকলী থানা পুলিশের মধ্যে নিবিড় সমন্বয় রয়েছে। পর্যটকদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করা, আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি স্বাভাবিক রাখা এবং কোনো ধরনের হয়রানি রোধে প্রশাসন সর্বদা সতর্ক ও তৎপর রয়েছে। তিনি আশা প্রকাশ করেন, হাওড়ে পর্যাপ্ত পানি এলে দেশ-বিদেশের পর্যটকরা নিকলীর প্রাকৃতিক সৌন্দর্য নিরাপদ পরিবেশে উপভোগ করতে পারবেন।