ফাইল ছবি
দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চল, দেশের বিদ্যুৎ উৎপাদনের অন্যতম বড় কেন্দ্র। কয়লাভিত্তিক বৃহৎ বিদ্যুৎ কেন্দ্র, গ্যাসচালিত প্লান্ট, আমদানিকৃত বিদ্যুতের সংযোগ,সব মিলিয়ে দেশের জ্বালানি মানচিত্রে এই অঞ্চল গুরুত্বপূর্ণ অবস্থানে রয়েছে।
কিন্তু বাস্তব চিত্র উল্টো। উৎপাদনের কেন্দ্র হয়েও খুলনা-বরিশালসহ পদ্মার ওপারের ২১ জেলার মানুষকে ঘণ্টার পর ঘণ্টা লোডশেডিংয়ের মধ্যে থাকতে হচ্ছে। তীব্র গরমে জনজীবন স্থবির হয়ে পড়ছে, শিল্প উৎপাদন ব্যাহত হচ্ছে, ব্যবসা-বাণিজ্যে বাড়ছে ব্যয়। লোডশেডিংয়ের প্রভাব এখন সামাজিক অস্থিরতায়ও রূপ নিচ্ছে। পল্লী বিদ্যুৎ অফিসে হামলা ও ব্যাপক ভাঙচুরের ঘটনাও ঘটছে।
বিদ্যুৎ খাত সংশ্লিষ্ট সূত্র, সরবরাহকারী প্রতিষ্ঠান এবং স্থানীয় নাগরিক সমাজের বক্তব্য বিশ্লেষণ করলে দেখা যাচ্ছে, এটি কেবল সাময়িক উৎপাদন সংকট নয়; বরং জ্বালানি ঘাটতি, কেন্দ্রীয় বণ্টন কাঠামো এবং আঞ্চলিক অগ্রাধিকার, এই তিনের সমন্বয়ে তৈরি একটি গভীর সংকট।
ওয়েস্ট জোন পাওয়ার ডিস্ট্রিবিউশন কোম্পানি (ওজোপাডিকো) সূত্রে জানা গেছে, গ্যাস সংকটের কারণে দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলের ২০টি বিদ্যুৎ কেন্দ্রের মধ্যে অন্তত ৯টি বন্ধ রয়েছে।
বন্ধ থাকা কেন্দ্রগুলোর মধ্যে রয়েছে, ৪১০ মেগাওয়াটের ভেড়ামারা কম্বাইন্ড সাইকেল পাওয়ার প্লান্ট, ১১৫ মেগাওয়াটের খুলনা কেপিসিএল, ২২৫ মেগাওয়াটের নর্থ ওয়েস্ট পাওয়ার প্লান্ট,১০২ মেগাওয়াটের রূপসা প্রিসিশন পাওয়ার প্লান্ট, ৫০ মেগাওয়াটের ফরিদপুর পাওয়ার প্লান্ট, ১০০ মেগাওয়াটের ভোলা এগ্রিকো , ৯৫.৫ মেগাওয়াটের ভোলা রেন্টাল পাওয়ার প্লান্ট, ১০০ মেগাওয়াটের নওয়াপাড়া বাংলা ট্র্যাক ও ৪০ মেগাওয়াটের নওয়াপাড়া খানজাহান আলী বিদ্যুৎ কেন্দ্র।
অন্যদিকে, সীমান্ত পেরিয়ে প্রতিদিন প্রায় ৮০০ থেকে ১ হাজার মেগাওয়াট বিদ্যুৎ আমদানি অব্যাহত রয়েছে। তবুও দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলে চাহিদা অনুযায়ী বিদ্যুৎ সরবরাহ নিশ্চিত করা যাচ্ছে না।
সংকট শুধু কেন্দ্র বন্ধে সীমাবদ্ধ নয়। চালু থাকা অধিকাংশ কেন্দ্রও পূর্ণ সক্ষমতায় উৎপাদন করতে পারছে না।
ওজোপাডিকোর তথ্য
ওজোপাডিকোর কেন্দ্রীয় নিয়ন্ত্রণ কক্ষের তথ্য অনুযায়ী, ৩৩০ মেগাওয়াট ক্ষমতার খুলনা পাওয়ার প্লান্ট উৎপাদন করেছে মাত্র ১০১ মেগাওয়াট,১,৩২০ মেগাওয়াট ক্ষমতার রামপাল বিদ্যুৎ কেন্দ্র উৎপাদন করেছে ৪৫০ মেগাওয়াট, ১৫০ মেগাওয়াটের পায়রা ইউনাইটেড পাওয়ার প্লান্ট দিয়েছে মাত্র ১৭ মেগাওয়াট, ১২০ মেগাওয়াটের বরিশাল সামিট উৎপাদন করেছে ৪৮ মেগাওয়াট, ১০৫ মেগাওয়াটের গোপালগঞ্জ মধুমতি বিদ্যুৎ কেন্দ্র উৎপাদন করেছে মাত্র ১৫ মেগাওয়াট।
এই পরিসংখ্যান দেখাচ্ছে, কাগজে থাকা উৎপাদন সক্ষমতা বাস্তবে ব্যবহার করা যাচ্ছে না।
সবচেয়ে বেশি প্রশ্ন তৈরি হয়েছে বিদ্যুৎ বণ্টন নিয়ে। গতকাল দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলের কেন্দ্রগুলো থেকে মোট উৎপাদিত হয়েছে ৪ হাজার ২৮৩ মেগাওয়াট বিদ্যুৎ। কিন্তু ওজোপাডিকোর আওতাধীন গ্রাহকদের জন্য সরবরাহ করা হয়েছে মাত্র ২ হাজার ২১১ মেগাওয়াট।
অর্থাৎ উৎপাদিত বিদ্যুতের প্রায় অর্ধেক ২ হাজার ৭২ মেগাওয়াট জাতীয় গ্রিডের মাধ্যমে দেশের অন্যান্য অঞ্চলে, বিশেষ করে রাজধানী ঢাকাসহ বিভিন্ন এলাকায় সরবরাহ করা হয়েছে।
বর্তমান চাহিদা
ওজোপাডিকো ও পল্লী বিদ্যুৎ সূত্র জানিয়েছে, খুলনা ও বরিশাল জোনে প্রতিদিন গড়ে প্রায় ২০০ মেগাওয়াট করে লোডশেডিং করতে হচ্ছে। দুই জোনে মোট বিদ্যুতের চাহিদা ৬০০–৭০০ মেগাওয়াট হলেও সরবরাহ ঘাটতি থাকছে ১৫০–২০০ মেগাওয়াট। ফলে বহু এলাকায় দিনে ৮–১০ ঘণ্টা পর্যন্ত লোডশেডিং হচ্ছে। ভিআইপি ফিডারের বাইরে থাকা এলাকাগুলোতে বিদ্যুৎ বিভ্রাট দীর্ঘ হচ্ছে।
রবিবার রাত ৯টার পিক আওয়ারে খুলনা জোনে চাহিদা ছিল ৬১৬ মেগাওয়াট। সরবরাহ দেওয়া হয়েছে ৫৬১ মেগাওয়াট। অর্থাৎ লোডশেডিং ছিল ৫৫ মেগাওয়াট। বরিশাল জোনে চাহিদা ছিল ১৬৯ মেগাওয়াট, সরবরাহ ১৪৪ মেগাওয়াট, লোডশেডিং ২৫ মেগাওয়াট। ওজোপাডিকোর মোট চাহিদা ছিল ৭৮৫ মেগাওয়াট, সরবরাহ করা হয়েছে ৭০৫ মেগাওয়াট। ঘাটতি ছিল ৮০ মেগাওয়াট।
ছয়টি সার্কেলে লোডশেডিংয়ের চিত্রে দেখা গেছে, খুলনায় ৩০ মেগাওয়াট, যশোরে ২ মেগাওয়াট, ফরিদপুরে ১৯ মেগাওয়াট, কুষ্টিয়ায় ৪ মেগাওয়াট, বরিশালে ২১ মেগাওয়াট, পটুয়াখালীতে ৪ মেগাওয়াট।
অভিযোগ
স্থানীয়দের অভিযোগ, কেন্দ্রীয় লোড ডেসপাস সেন্টার (এলডিসি) বিদ্যুৎ বণ্টনের নিয়ন্ত্রণ করায় দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চল তুলনামূলকভাবে কম বরাদ্দ পাচ্ছে।
বৃহত্তর খুলনা উন্নয়ন সংগ্রাম সমন্বয় কমিটির সভাপতি শেখ আশরাফ-উজ-জামান বলেন, “খুলনা দীর্ঘদিন ধরে বৈষম্যের শিকার। এখানে উৎপাদিত বিদ্যুতের বড় অংশ অন্য অঞ্চলে চলে যায়। স্থানীয় মানুষ পর্যাপ্ত সুবিধা পায় না”।
পরিবেশ সুরক্ষা মঞ্চের সভাপতি অ্যাড. কুদরত-ই-খুদা বলেন, “নবায়নযোগ্য জ্বালানিতে বিনিয়োগ বাড়াতে হবে। খুলনা সিটি কর্পোরেশনের সোনাডাঙ্গা সোলার পার্ক সচল করা গেলে স্থানীয় চাহিদার একটি অংশ পূরণ সম্ভব”।
খুলনা নাগরিক সমাজের সদস্য সচিব অ্যাড. মো. বাবুল হাওলাদার বলেন, “বিদ্যুৎ এখন বিলাসিতা নয়, মৌলিক অবকাঠামো। সরবরাহ সংকট দীর্ঘায়িত হলে জনঅসন্তোষ আরও বাড়বে”।
এসব অভিযোগ প্রসঙ্গে ওজোপাডিকোর প্রধান প্রকৌশলী মো. আব্দুল মজিদ বলেন, “ওজোপাডিকো কেবল বিতরণ করে। এলডিসি থেকে যে পরিমাণ বিদ্যুৎ পাওয়া যায় সেটাই সরবরাহ করা হয়। কেন্দ্রগুলো পূর্ণ সক্ষমতায় ফিরলে পরিস্থিতির উন্নতি হবে”।
বাড়ছে সামাজিক অস্থিরতা
লোডশেডিংয়ের প্রভাব এখন সামাজিক অস্থিরতায়ও রূপ নিচ্ছে। খুলনার কয়রা উপজেলায় তীব্র লোডশেডিংয়ের জেরে পল্লী বিদ্যুৎ জোনাল অফিসে হামলা ও ব্যাপক ভাঙচুরের ঘটনা ঘটেছে।
১৮ জুন ভোর ৫টার দিকে উপজেলার মেইন রোড এলাকায় অবস্থিত পল্লী বিদ্যুৎ অফিসে হামলা চালানো হয়। বাধা দিতে গেলে নিরাপত্তা প্রহরী ওহিদুজ্জামান মোল্লা আহত হন। ঘটনাস্থল থেকে রবিউল ইসলাম (২৭) নামের এক যুবককে আটক করে পুলিশে সোপর্দ করা হয়। একই রাতে উপজেলা মৎস্য অফিস, আনসার ও ভিডিপি অফিস এবং বিআরডিবি অফিসেও ভাঙচুরের ঘটনা ঘটে। পল্লী বিদ্যুৎ অফিসের ডেপুটি জেনারেল ম্যানেজার মাহফুজুর রহমান খান বলেন, কয়রায় দৈনিক চাহিদা ১০–১২ মেগাওয়াট। কিন্তু জাতীয় গ্রিড থেকে পাওয়া যাচ্ছে মাত্র ৫–৬ মেগাওয়াট। এই অবস্থায় ২৪ ঘণ্টা বিদ্যুৎ দেওয়া সম্ভব নয়।
বাড়ছে উৎপাদন ব্যয়
বিদ্যুৎ সংকটের কারণে ক্ষুদ্র ও মাঝারি শিল্প, কোল্ড স্টোরেজ, হাসপাতাল, আইটি সেবা এবং উৎপাদনমুখী শিল্প প্রতিষ্ঠান জেনারেটরনির্ভর হয়ে পড়েছে। ফলে উৎপাদন ব্যয় বাড়ছে, মুনাফা কমছে।