মধ্যাঞ্চল অফিস
প্রকাশ : ৩ ঘণ্টা আগে
পাগলা মসজিদে দানের টাকা গণনা চলছে। ছবি: প্রতিদিনের বাংলাদেশ
অতীতের সব রেকর্ড ভেঙে নতুন রেকর্ড করেছে কিশোরগঞ্জের ঐতিহাসিক পাগলা মসজিদের দানের টাকা। গণনা শেষে এবার পাওয়া গেছে ১৫ কোটি ৯০ লাখ ৮০ হাজার ১৪৬ টাকা।
জেলা প্রশাসক ও পাগলা মসজিদ পরিচালনা কমিটির সভাপতি সোহানা নাসরিনের উপস্থিতিতে শনিবার সকাল ৭টায় খোলা হয় মসজিদের ১৩টি দানবাক্স। এতে মিলে রেকর্ড ৪৩ বস্তা টাকা। ৯টার পর শুরু হয় গণনা। চলে রাত পৌনে ৯টা পর্যন্ত।
এই গণনার আগে পাগলা মসজিদের তহবিলে মোট ১১৪ কোটি ১৩ লাখ সাত হাজার ৩৫২ টাকা জমা রয়েছে বলে জানান জেলা প্রশাসক।
গণনায় আরও অংশ নেন জামিয়া ইমদাদিয়া মাদ্রাসা ও পাগলা মসজিদ মাদ্রাসার শিক্ষার্থীরা, রূপালী ব্যাংকের কর্মকর্তা-কর্মচারী, মসজিদের কর্মচারী এবং জেলা প্রশাসনের বিভিন্ন কর্মকর্তা-কর্মচারী। প্রতিটি বস্তা আলাদাভাবে খুলে টাকা বাছাই, গণনা, যাচাই-বাছাই ও হিসাব সংরক্ষণের কাজ চলে দিনভর। পুরো কার্যক্রমে কঠোর নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে মোতায়েন ছিল বিপুলসংখ্যক পুলিশ সদস্য।
এর আগে ২০২৫ সালের ২৭ ডিসেম্বর তিন মাস ২৭ দিন পর দানবাক্স খুলে পাওয়া গিয়েছিল ১১ কোটি ৭৮ লাখ ৪৮ হাজার ৫৩৮ টাকা, যা তখন পর্যন্ত সর্বোচ্চ সংগ্রহ ছিল। এবার ছয় মাস পর দানবাক্স খোলা হওয়ায় দানের পরিমাণ উল্লেখযোগ্যভাবে বৃদ্ধি পেয়ে নতুন রেকর্ড গড়েছে।
মসজিদ পরিচালনা কমিটি জানিয়েছে, সাধারণত প্রতি তিন মাস পরপর দানবাক্স খোলা হলেও প্রশাসনিক ও অন্যান্য কারণে এবার ছয় মাস অপেক্ষা করতে হয়েছে। এ সময়ের মধ্যে দানের চাপ বেড়ে যাওয়ায় বিদ্যমান ১১টি দানবাক্সের সঙ্গে আরও দুটি নতুন দানবাক্স যুক্ত করা হয়। ফলে এবার মোট ১৩টি দানবাক্স খোলা হয়। প্রতিবারের মতো এবারও দানবাক্সে শুধু নগদ অর্থ নয়, পাওয়া গেছে স্বর্ণ ও রুপার অলংকার, বিভিন্ন দেশের নোট ও কয়েন এবং অন্যান্য মূল্যবান সামগ্রী। এ সব সামগ্রী আলাদাভাবে সংরক্ষণ করা হয়েছে।
দানবাক্সের আরেকটি ব্যতিক্রমী দিক হলো মানুষের লেখা মানতের চিঠি। শত শত চিরকুটে উঠে এসেছে মানুষের জীবনের নানা আশা-আকাঙ্ক্ষা, দুঃখ-কষ্ট, সংকট ও প্রার্থনার কথা। কেউ ভালো চাকরি, কেউ ব্যবসার উন্নতি, কেউ পরীক্ষায় সাফল্য, কেউ সন্তানের সুস্থতা, কেউ রোগমুক্তি, কেউ সংসারের সুখ-শান্তি, আবার কেউ হালাল রিজিক ও জীবনের সফলতা কামনা করেছেন। অনেকেই পারিবারিক অশান্তি দূর হওয়া ও শত্রুর হাত থেকে রক্ষার জন্যও দোয়া চেয়েছেন।
সবচেয়ে আলোচিত চিঠিগুলোর একটি ছিল বাংলাদেশের ফুটবল নিয়ে। সেখানে এক অজ্ঞাতনামা ব্যক্তি লিখেছেন, তিনি চান ২০৩০ সালের ফুটবল বিশ্বকাপে বাংলাদেশ অংশগ্রহণ করুক এবং লাল-সবুজের পতাকা বিশ্বমঞ্চে উড়ুক। পাশাপাশি খেলোয়াড়দের সফলতা ও দেশের ফুটবলের উন্নতির জন্য আল্লাহর কাছে দোয়া করা হয়েছে। এছাড়া আরেকটি ছোট চিরকুটে লেখা ছিল হাদি হত্যার বিচার চাই।
নরসিংদী পৌরসভার উত্তর শাটিরপাড়া এলাকার বাসিন্দা মোহাম্মদ রাজু মিয়া (৬০) বলেন, “আমার দুই ছেলে দীর্ঘদিন ধরে প্রবাসে নানা সমস্যার মধ্যে আছে। তাদের বিপদ-আপদ দূর হোক, আল্লাহ তাদের সুস্থ ও নিরাপদ রাখুন—এই আশা নিয়েই পাগলা মসজিদে মানত করতে এসেছি। মানুষের মুখে শুনেছি, এখানে আন্তরিক নিয়তে দোয়া করলে আল্লাহ কবুল করেন। তাই বিশ্বাস ও ভরসা নিয়ে দান করেছি”।
তিনি আরও বলেন, “এখানে এসে মানুষের ঈমান, বিশ্বাস আর দানের আগ্রহ দেখে খুব ভালো লেগেছে। আল্লাহ যেন আমার দুই ছেলের সমস্যা দূর করেন এবং সবাইকে হালাল রিজিক দান করেন—এই দোয়াই করেছি”।
গাজীপুর থেকে আসা তাসলিমা খাতুন বলেন, “আমি অনেক দূর থেকে শুধু আল্লাহর সন্তুষ্টির জন্য দান করতে এসেছি। আমার পরিবারের সবাই যেন সুস্থ থাকে, সন্তানদের উজ্জ্বল ভবিষ্যৎ হয় এবং সংসারে শান্তি বজায় থাকে—এই নিয়তে মানত করেছি। টাকা-পয়সার পরিমাণ বড় বিষয় নয়, আন্তরিকতাই সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ”।
পুরান ঢাকা থেকে আসা আরিফুর ইসলাম সুজন বলেন, “পাগলা মসজিদের প্রতি মানুষের যে বিশ্বাস, সেটিই আমাকে এখানে টেনে এনেছে। নিজের জন্য, পরিবারের জন্য এবং দেশের শান্তি-সমৃদ্ধির জন্য দোয়া করেছি। সামর্থ্য অনুযায়ী দান করেছি। আল্লাহ যেন আমাদের সবাইকে নেক হেদায়েত দান করেন”।
অতিরিক্ত পুলিশ সুপার নাজমুস সাকিব খান বলেন, “দানবাক্স খোলা থেকে শুরু করে অর্থ গণনা এবং ব্যাংকে নিরাপদে জমা দেওয়া পর্যন্ত প্রতিটি ধাপে কঠোর নিরাপত্তা নিশ্চিত করা হয়েছে। সারা বছরই দানবাক্সের নিরাপত্তায় আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সদস্যরা দায়িত্ব পালন করেন”।
জেলা প্রশাসক ও পাগলা মসজিদ পরিচালনা কমিটির সভাপতি সোহানা নাসরিন বলেন, “পাগলা মসজিদের ব্যাংক হিসাবে ১১৪ কোটি টাকা জমা রয়েছে। এবার নতুন করে ১৫ কোটি ৯০ লাখ টাকার বেশি যুক্ত হওয়ায় মসজিদের দানের ইতিহাসে আরেকটি মাইলফলক যুক্ত হলো”।
তিনি বলেন, “পাগলা মসজিদের আধুনিক ইসলামি কমপ্লেক্স নির্মাণের প্রয়োজনীয় কার্যক্রমও এগিয়ে চলছে। এ লক্ষ্যে বর্তমান মসজিদ কমপ্লেক্স ও কবরস্থানের মধ্যবর্তী ৫৩ দশমিক ৭৭ শতাংশ জমি মসজিদের নামে ক্রয় করা হয়েছে। বর্তমানে কমপ্লেক্সের নান্দনিক নকশা প্রণয়নের কাজ চলমান রয়েছে। পাশাপাশি মুসল্লিদের সুবিধার্থে মসজিদের বাইরে একটি পাবলিক টয়লেট নির্মাণের কাজও চলছে”।
জেলা প্রশাসক বলেন, “মসজিদের তহবিল থেকে কমপ্লেক্সের মাদ্রাসায় অধ্যয়নরত ১৩০ জন এতিম ও অসহায় শিক্ষার্থীর সব ধরনের ব্যয় বহন করা হয়। এছাড়া ৩৫ জন কর্মচারী ও ১০ জন আনসার সদস্যের বেতন, মসজিদের বিদ্যুৎ বিল এবং বিভিন্ন উন্নয়নমূলক ব্যয় এই তহবিল থেকেই মেটানো হয়। তহবিলের লভ্যাংশ থেকে কিশোরগঞ্জ জেলার অসহায় রোগীদের চিকিৎসার জন্যও আর্থিক সহায়তা দেওয়া হয়”।