সাইদুজ্জামান সাঈদ, রামু (কক্সবাজার)
প্রকাশ : ১ ঘণ্টা আগে
রামু উপজেলার জোয়ারিয়ানালা ইউনিয়নের বেংডেবা গ্রামটিতে নেই চলাচল উপযোগী পাকা সড়ক, প্রয়োজনীয় সেতু কিংবা বিদ্যুৎ সংযোগ। ফলে প্রতিদিনই চরম দুর্ভোগে স্থানীয় বাসিন্দারা। প্রবা ফটো
স্বাধীনতার পাঁচ দশকেরও বেশি সময় পেরিয়ে গেলেও কক্সবাজারের রামু উপজেলার জোয়ারিয়ানালা ইউনিয়নের ৮ নম্বর ওয়ার্ডের বেংডেবা গ্রামের প্রায় ১০০ পরিবার এখনও উন্নয়নের মূলধারা থেকে বিচ্ছিন্ন অবস্থায় রয়েছে। গ্রামটিতে নেই চলাচল উপযোগী পাকা সড়ক, প্রয়োজনীয় সেতু কিংবা বিদ্যুৎ সংযোগ। ফলে প্রতিদিনই চরম দুর্ভোগ ও অনিশ্চয়তার মধ্যে জীবনযাপন করছেন স্থানীয় বাসিন্দারা।
স্থানীয়দের অভিযোগ, প্রায় ৫০ বছর ধরে বিভিন্ন সরকারি দপ্তর, জনপ্রতিনিধি ও সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের কাছে আবেদন-নিবেদন করেও মাত্র ২ কিলোমিটার সড়ক ও কয়েকটি ছোট সেতুর ব্যবস্থা করা সম্ভব হয়নি। ফলে গ্রামের মানুষকে কাদামাটি, পাহাড়ি ছড়া ও ঝুঁকিপূর্ণ পথ অতিক্রম করে চলাচল করতে হচ্ছে।
স্বাধীনতার ৫৫ বছর পরও গ্রামটিতে বিদ্যুৎ পৌঁছেনি। কিছু পরিবার সীমিত পরিসরে সৌরবিদ্যুতের ওপর নির্ভর করে রাতের অন্ধকার দূর করার চেষ্টা করছে। মোবাইল ফোন চার্জ দিতে অনেককে কয়েক কিলোমিটার দূরের এলাকায় যেতে হয়। দুর্বল মোবাইল নেটওয়ার্ক ও ইন্টারনেট সংযোগের কারণে শিক্ষার্থী, চাকরিপ্রার্থী ও অনলাইন সেবাগ্রহীতারা নানা সমস্যার মুখোমুখি হচ্ছেন।
এলাকাবাসী জানান, রাস্তা ও সেতুর অভাবে অসুস্থ রোগীদের হাসপাতালে নিতে গিয়ে ভোগান্তির শিকার হতে হয়। বিশেষ করে বর্ষা মৌসুমে পাহাড়ি ছড়া ও খাল পানিতে তলিয়ে গেলে রোগীদের বাঁশের খাটিয়া কিংবা মানুষের কাঁধে বহন করে কয়েক কিলোমিটার পথ পাড়ি দিতে হয়। সময়মতো চিকিৎসা না পাওয়ার কারণে গত কয়েক দশকে অন্তত ২০ জন রোগীর মৃত্যু হয়েছে।
স্থানীয় বাসিন্দা জহিরুল ইসলাম বলেন, জরুরি অ্যাম্বুলেন্স সেবা তো দূরের কথা, মোটরসাইকেল পর্যন্ত গ্রামের ভেতরে প্রবেশ করতে পারে না। ফলে অসুস্থ মানুষের চিকিৎসা পাওয়া অনেক ক্ষেত্রেই ভাগ্যের ওপর নির্ভর করে।
স্থানীয় কৃষকদের অভিযোগ, পরিবহন সংকটের কারণে অনেক সময় কৃষিপণ্য নষ্ট হয়ে যায় অথবা কম দামে বিক্রি করতে বাধ্য হন। এতে উৎপাদন খরচও উঠে আসে না।
গ্রামের শিক্ষার্থীদের প্রতিদিন কয়েক কিলোমিটার দুর্গম পথ পাড়ি দিয়ে স্কুল, কলেজ ও মাদ্রাসায় যেতে হয়। বর্ষাকালে অনেক শিক্ষার্থী নিয়মিত ক্লাসে উপস্থিত হতে পারে না। যাতায়াত সংকটে অনেক শিক্ষার্থী মাঝপথে লেখাপড়া ছেড়ে দিতে বাধ্য হচ্ছেন।
কক্সবাজার সরকারি কলেজের ম্যানেজমেন্ট বিভাগের শিক্ষার্থী আবুল হাসনাত আল-আমিন বলেন, জন্মের পর থেকে দেখে আসছি আমাদের গ্রাম এখনও সরকারের মৌলিক উন্নয়ন সুবিধা থেকে বঞ্চিত। সড়ক, বিদ্যুৎ ও নেটওয়ার্ক সুবিধার অভাবে এলাকার মানুষ চরম দুর্ভোগে রয়েছে।
সাউদার্ন ইউনিভার্সিটি চট্টগ্রামের আইন বিভাগের শিক্ষার্থী মোহাম্মদ মিয়া বলেন, রামুর অন্যান্য এলাকায় উন্নয়নের ছোঁয়া লাগলেও আমাদের গ্রাম এখনও পিছিয়ে আছে।
গ্রামবাসীর ভাষ্য, রাস্তা নির্মাণের উদ্যোগ নিলেই বন বিভাগের আপত্তির মুখে পড়তে হয়। ফলে বছরের পর বছর ধরে উন্নয়ন প্রকল্প বাস্তবায়ন সম্ভব হচ্ছে না।
জোয়ারিয়ানালা ইউনিয়নের ৮ নম্বর ওয়ার্ডের সদস্য একরামুল হক বাবুল বলেন, এখানে প্রায় একশ বছর ধরে মানুষের বসবাস হলেও চলাচলের একমাত্র রাস্তা সংস্কারের উদ্যোগ নিলে বন বিভাগের বাধার মুখে পড়তে হয়।
অন্যদিকে জোয়ারিয়ানালা বিট কর্মকর্তা বাদন ধর বলেন, প্রস্তাবিত রাস্তা নির্মাণ করা হলে বন বিভাগের গাছ কাটা পড়ার আশঙ্কা রয়েছে। বনাঞ্চলের নিরাপত্তা ও গাছ সংরক্ষণের স্বার্থে আমরা রাস্তা নির্মাণে আপত্তি জানিয়ে আসছি।
এ বিষয়ে জোয়ারিয়ানালা ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান কামাল শামশুদ্দিন আহাম্মদ প্রিন্সের সঙ্গে একাধিকবার যোগাযোগের চেষ্টা করা হলেও তার বক্তব্য পাওয়া যায়নি।
স্থানীয় সচেতন মহলের মতে, মাত্র ২ কিলোমিটার সড়ক ও কয়েকটি সেতু নির্মাণের পাশাপাশি বিদ্যুৎ সংযোগ ও মোবাইল নেটওয়ার্ক উন্নত করা গেলে শিক্ষা, স্বাস্থ্য ও অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডে ইতিবাচক পরিবর্তন আসবে।