সাইফুল হক মোল্লা দুলু, মধ্যাঞ্চল
প্রকাশ : ২ ঘণ্টা আগে
শহিদ সৈয়দ নজরুল ইসলাম মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতাল, ইনসেটে অভিযুক্ত মেডিক্যাল টেকনোলজিস্ট কামরুজ্জামান সোহাগ। ছবি: প্রতিদিনের বাংলাদেশ
কিশোরগঞ্জের শহিদ সৈয়দ নজরুল ইসলাম মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালের ফিজিওথেরাপি বিভাগের এক টেকনোলজিস্টের বিরুদ্ধে রোগীর চিকিৎসায় অবহেলার অভিযোগ উঠেছে।
রোগীর স্বজনদের দাবি, থেরাপি মেশিন দীর্ঘ সময় চালু রেখে যথাযথ পর্যবেক্ষণ না করায় রোগীর পায়ে গুরুতর ক্ষত সৃষ্টি হয়েছে।
তবে অভিযুক্ত কর্মকর্তা অভিযোগ অস্বীকার করেছেন। এ ঘটনায় হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ তদন্ত কমিটি গঠন করেছে।
ভুক্তভোগী মোহাম্মদ আলমগীর হোসাইন (৬০) কিশোরগঞ্জ সদর উপজেলার মারিয়া ইউনিয়নের ৭ নম্বর ওয়ার্ডের মারিয়া গ্রামের বাসিন্দা।
তিনি স্ট্রোকে আক্রান্ত হয়ে শহিদ সৈয়দ নজরুল ইসলাম মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালের এমএমডব্লিউ ওয়ার্ডে চিকিৎসাধীন ছিলেন।
রোগীর ছেলে মোহাম্মদ আবিদুর হক গত ২১ জুন হাসপাতালের উপ-পরিচালকের কাছে লিখিত অভিযোগ দায়ের করেন।
অভিযোগে বলা হয়, চিকিৎসক ডা. মোহাম্মদ আবুল কালাম আজাদের পরামর্শে গত ৪ মে আলমগীর হোসাইনকে ফিজিওথেরাপি বিভাগে নেওয়া হয়।
সেখানে বিভাগের মেডিক্যাল টেকনোলজিস্ট কামরুজ্জামান সোহাগ রোগীর বাম পায়ে থেরাপি মেশিন সংযুক্ত করে চালু করেন বলেও অভিযোগে উল্লেখ করা হয়।
স্বজনদের ভাষ্য অনুযায়ী, মেশিন চালুর পর কামরুজ্জামান সোহাগ রোগীর পাশে অবস্থান না করে অন্যত্র চলে যান। যাওয়ার আগে তিনি রোগীকে অতিরিক্ত গরম অনুভব করলে ডাকতে বলেন।
কিন্তু স্ট্রোকের কারণে রোগীর অনুভূতিশক্তি স্বাভাবিক না থাকায় তিনি পরিস্থিতির গুরুত্ব বুঝতে পারেননি। ফলে দীর্ঘ সময় তাপের প্রভাবে তার পায়ে ফোসকা পড়ে এবং পরে সেখানে গুরুতর ক্ষত সৃষ্টি হয় বলেও অভিযোগ করেন তারা।
পরিবারের সদস্যদের অভিযোগ, বিষয়টি জানানো হলেও প্রথমদিকে গুরুত্ব না দিয়ে কিছু অ্যান্টিবায়োটিক ও মলম ব্যবহারের পরামর্শ দেওয়া হয়। পরবর্তীতে ক্ষত আরও জটিল আকার ধারণ করে।
মোহাম্মদ আবিদুর হক বলেন, বাবা শুরু থেকেই জানিয়েছিলেন যে তিনি গরম অনুভব করলেও তা সঠিকভাবে বুঝতে পারবেন না। কিন্তু তাকে সমস্যা হলে ডাকতে বলা হয়েছিল।
পরে বাড়িতে নেওয়ার কয়েক ঘণ্টার মধ্যেই তার পা ফুলে যায় এবং অবস্থার দ্রুত অবনতি ঘটে। চিকিৎসকের সঙ্গে যোগাযোগের চেষ্টা করেও আমরা তাকে পাইনি বলেও অভিযোগ করেন তিনি।
তিনি আরও জানান, ১২ মে জেলা শহরের একটি বেসরকারি ক্লিনিকে ডা. মোহাম্মদ আবুল কালাম আজাদের কাছে রোগীকে নেওয়া হলে তিনি পরিস্থিতি দেখে পুনরায় হাসপাতালে ভর্তি হওয়ার পরামর্শ দেন। তবে উন্নত চিকিৎসার জন্য পরিবার রোগীকে ঢাকার বারডেম হাসপাতালে নিয়ে যায়।
আবিদুর হকের দাবি, বারডেম হাসপাতালের চিকিৎসকরা ক্ষতস্থানে গুরুতর জটিলতা এবং স্নায়ুর ক্ষতির কথা জানিয়েছেন।
তার ভাষায়, বাবা এখন স্থায়ী শারীরিক অক্ষমতার ঝুঁকিতে রয়েছেন। চিকিৎসায় ইতোমধ্যে প্রায় দুই লাখ টাকা ব্যয় হয়েছে। ভবিষ্যতে আরও ব্যয় হতে পারে এবং ক্ষতিগ্রস্ত স্থানে কসমেটিক সার্জারির প্রয়োজনও হতে পারে।
তিনি সরকারি হাসপাতালে রোগীসেবার মান, পর্যবেক্ষণ ব্যবস্থা এবং জবাবদিহিতা আরও শক্তিশালী করার আহ্বান জানান।
এ ঘটনায় স্থানীয় বাসিন্দা তানভীর বলেন, সরকারি হাসপাতালে চিকিৎসা নিতে এসে রোগীরা এমন ঘটনার শিকার হলে তা উদ্বেগজনক। অভিযোগের সুষ্ঠু তদন্ত হওয়া উচিত।
আরেক সেবাপ্রত্যাশী ফারুকের মতে, অভিযোগ প্রমাণিত হলে দায়ীদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়ার পাশাপাশি হাসপাতালের তদারকি ব্যবস্থাও জোরদার করা উচিত।
অভিযোগের বিষয়ে কামরুজ্জামান সোহাগ বলেন, আমার বিরুদ্ধে আনা অভিযোগ সম্পূর্ণ মিথ্যা ও বানোয়াট। ২০১৭ সাল থেকে আমি পেশাগতভাবে ফিজিওথেরাপি সেবা দিয়ে আসছি। এ ধরনের অভিযোগ আগে কখনও ওঠেনি।
তিনি জানান, আইআরআর (ইনফ্রারেড রেডিয়েশন) থেরাপি দেওয়ার আগে রোগীর অনুভূতির মাত্রা পরীক্ষা করা হয় এবং নির্ধারিত সময় ও দূরত্ব মেনে চিকিৎসা দেওয়া হয়।
তার দাবি, চিকিৎসার পর কোনো সমস্যা দেখা দিলে রোগীর স্বজনরা তাৎক্ষণিকভাবে তাকে অবহিত করেননি।
শহিদ সৈয়দ নজরুল ইসলাম মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালের উপ-পরিচালক ডা. সাইফুল ইসলাম বলেন, অভিযোগটি গুরুত্বের সঙ্গে নেওয়া হয়েছে। লিখিত অভিযোগ পাওয়ার পর একটি তদন্ত কমিটি গঠন করা হয়েছে। তদন্ত প্রতিবেদনের ভিত্তিতে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে।
কিশোরগঞ্জের ভারপ্রাপ্ত সিভিল সার্জন ডা. মো. নাজমুল করিম বলেন, বিষয়টি আগে জানা ছিল না। প্রকৃত ঘটনা কী ঘটেছে তা তদন্তের মাধ্যমে যাচাই করা প্রয়োজন।
যদি কোনো অবহেলার প্রমাণ পাওয়া যায়, তাহলে প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ নেওয়া হবে বলেও জানান তিনি।