রংপুরের গঙ্গাচড়া উপজেলার কোলকোন্দ ইউনিয়নে গোয়েন বাঁধের নিচ দিয়ে পানি প্রবাহিত হওয়ায় তীব্র ভাঙন দেখা দিয়েছে। প্রবা ফটো
উজান থেকে নেমে আসা পাহাড়ি ঢল ও ভারী বৃষ্টিপাতের প্রভাবে উত্তরাঞ্চলের প্রধান নদ-নদীগুলোর পানি দ্রুত বৃদ্ধি পাচ্ছে। বিশেষ করে তিস্তা নদীর পানি রংপুর, কুড়িগ্রাম ও লালমনিরহাটের বিভিন্ন পয়েন্টে বিপদসীমার কাছাকাছি পৌঁছে গেছে। কোথাও কোথাও পানি বিপদসীমা অতিক্রম করায় তিস্তা তীরবর্তী জনপদে বন্যা ও নদীভাঙনের আতঙ্ক ছড়িয়ে পড়েছে। প্রতিবেদকদের খবর
রংপুর : উজানের পাহাড়ি ঢলে রংপুরে তিস্তা নদীর পানি বিপদসীমা ছুঁই ছুঁই করছে। পানির তোড়ে নদীর তীরবর্তী এলাকায় ভাঙন দেখা দিয়েছে। ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে গঙ্গাচড়া উপজেলার কোলকোন্দ ইউনিয়নের গ্রোয়েন বাঁধ।
পানি উন্নয়ন বোর্ড সূত্রে জানা গেছে, মঙ্গলবার (২৩ জুন) সন্ধ্যা ৬টায় তিস্তা নদীর ডালিয়া পয়েন্টে পানি বিপদসীমার মাত্র ১ সেন্টিমিটার নিচে এবং কাউনিয়া পয়েন্টে ২৯ সেন্টিমিটার নিচ দিয়ে প্রবাহিত হয়। তবে দিনের বিভিন্ন সময়ে ডালিয়া পয়েন্টে পানি বিপদসীমা অতিক্রমও করেছে। উজানে ভারী থেকে অতিভারী বৃষ্টিপাত অব্যাহত থাকায় তিস্তার পানি আরও বাড়ার আশঙ্কা রয়েছে।
এদিকে সোমবার বিকাল থেকে গঙ্গাচড়া উপজেলার কোলকোন্দ ইউনিয়নের গ্রোয়েন বাঁধের তলদেশ দিয়ে পানি ঢুকে পড়েছে। এতে বাঁধ সংলগ্ন এলাকা ও আশপাশের ফসলি জমিতে ব্যাপক ভাঙন শুরু হয়েছে। ইতোমধ্যে নদীতে বিলীন হয়েছে প্রায় ১৫ একরের বেশি আবাদি জমি।
কোলকোন্দ ইউনিয়নের ৬ নম্বর ওয়ার্ড ইউপি সদস্য লাল মিয়া বলেন, স্থানীয়দের সহযোগিতায় ৪৫টার মতো জিও ব্যাগ আমরা ফেলেছি। কিন্তু আজকে আবার পানি বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে ভাঙন তীব্র হয়েছে।
গঙ্গাচড়ার উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা জেসমিন আক্তার বলেন, পানি উন্নয়ন বোর্ডের সহযোগিতায় সেখানে কিছু জিও ব্যাগও দেওয়া হয়েছে। পরিস্থিতি নজরদারিতে রাখা হয়েছে।
কুড়িগ্রাম : জেলার তিস্তা, ধরলা, দুধকুমার ও ব্রহ্মপুত্রের বিভিন্ন পয়েন্টে পানি বাড়তে থাকায় নিম্নাঞ্চলের নতুন নতুন এলাকা প্লাবিত হচ্ছে। একই সঙ্গে নদীভাঙনের আতঙ্কও ছড়িয়ে পড়েছে নদীর তীরবর্তী জনপদে।
মঙ্গলবার সকাল ৯টার তথ্য অনুযায়ী, তিস্তার কাউনিয়া পয়েন্টে পানির উচ্চতা ছিল ২৮ দশমিক ৯৫ মিটার, যা বিপদসীমার মাত্র ৩৬ সেন্টিমিটার নিচে। ধরলা নদীর কুড়িগ্রাম পয়েন্টে পানি বিপদসীমার ১ দশমিক ৪৫ মিটার এবং তালুক সিমুলবাড়ী পয়েন্টে ৯৪ সেন্টিমিটার নিচে প্রবাহিত হচ্ছিল।
দুধকুমার নদের পাটেশ্বরী পয়েন্টে পানি বিপদসীমার ৬৩ সেন্টিমিটার নিচে এবং ব্রহ্মপুত্র নদের নুনখাওয়া ও চিলমারী পয়েন্টেও পানি বিপদসীমার নিচে থাকলেও সব নদীর প্রবণতা ঊর্ধ্বমুখী রয়েছে। ফলে জেলার নিম্নাঞ্চল ও চরাঞ্চলে নতুন নতুন এলাকা প্লাবিত হতে শুরু করেছে।
ইতোমধ্যে চীনাবাদাম, পাট, মরিচসহ বিভিন্ন ফসলি জমিতে পানি ঢুকে পড়েছে। ক্ষতির আশঙ্কায় কৃষকরা আগাম ফসল সংগ্রহে ব্যস্ত হয়ে পড়েছেন। একই সঙ্গে ধরলা, তিস্তা ও দুধকুমার নদীতীরবর্তী এলাকায় ভাঙনের তীব্রতা বেড়ে যাওয়ায় বসতভিটা ও আবাদি জমি হারানোর শঙ্কায় দিন কাটছে নদীপাড়ের মানুষের।
নদীভাঙনের শিকার কুড়িগ্রামের বিদ্যানন্দ ইউনিয়নের রামহরি গ্রামের খোতেজা বেওয়া জানান, এর আগেও তিনবার তার বাড়ি নদীতে বিলীন হয়েছে। এবারও তিস্তার পানি বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে ভয়াবহ ভাঙন শুরু হয়েছে। নদীর গর্জনে রাতেও ঘুমাতে পারছেন না বলে জানান তিনি।
পানি উন্নয়ন বোর্ডের নির্বাহী কর্মকর্তা মো. রাকিবুল হাসান জানান, উজানে বৃষ্টিপাত ও ঢলের পরিস্থিতির ওপর নজর রাখা হচ্ছে। আগামী কয়েকদিন নদীগুলোর পানি আরও বৃদ্ধি পেয়ে মাঝারি ধরনের বন্যা পরিস্থিতি তৈরি হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে।
লালমনিরহাট : লালমনিরহাটে মঙ্গলবার বেলা ৩টায় ডালিয়া পয়েন্টে তিস্তার পানি বিপদসীমার ১ সেন্টিমিটার ওপর দিয়ে প্রবাহিত হয়। সকালে যেখানে পানি বিপদসীমার ১০ সেন্টিমিটার নিচে ছিল, কয়েক ঘণ্টার ব্যবধানে তা দ্রুত বৃদ্ধি পেয়ে বিপদসীমা অতিক্রম করে। এতে তিস্তার ভাটির নিম্নাঞ্চল ও চরাঞ্চলের বাসিন্দাদের মধ্যে নতুন করে বন্যা আতঙ্ক দেখা দিয়েছে।
মঙ্গলবার বেলা ৩টায় তিস্তা ব্যারাজের ডালিয়া পয়েন্টে নদীর পানি বিপদসীমার ১ সেন্টিমিটার ওপর দিয়ে প্রবাহিত হয়েছে। কয়েক ঘণ্টার ব্যবধানে পানির এ দ্রুত বৃদ্ধি নদীতীরবর্তী নিম্নাঞ্চল ও চরাঞ্চলের বাসিন্দাদের মধ্যে নতুন করে বন্যা আতঙ্ক সৃষ্টি করেছে। যদিও বর্তমানে চরাঞ্চলে উল্লেখযোগ্য মৌসুমি ফসল না থাকায় বড় ধরনের কৃষি ক্ষয়ক্ষতির আশঙ্কা কম বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা। তবে নদীভাঙন ও আকস্মিক বন্যার ঝুঁকিতে উদ্বেগ বাড়ছে।
পানি উন্নয়ন বোর্ডের নির্বাহী প্রকৌশলী সুনীল কুমার জানান, আগামী ৭২ ঘণ্টায় তিস্তা নদীর পানি আরও বৃদ্ধি পেয়ে বিপদসীমার কাছাকাছি অথবা এর ওপর দিয়ে প্রবাহিত হতে পারে। পরিস্থিতি নিবিড়ভাবে পর্যবেক্ষণ করা হচ্ছে এবং যেকোনো ধরনের দুর্যোগ মোকাবিলায় সংশ্লিষ্ট দপ্তরগুলোকে সতর্ক অবস্থানে রাখা হয়েছে।