মহিউদ্দিন আহাম্মেদ, মাধবপুর (হবিগঞ্জ)
প্রকাশ : ৩ ঘণ্টা আগে
আপডেট : ৩ ঘণ্টা আগে
ন্যাশনাল টি কোম্পানি (এনটিসি) লোগোর নিচে চা বাগান। গ্রাফিক্স: প্রতিদিনের বাংলাদেশ
দেশের অন্যতম বৃহৎ ও ঐতিহ্যবাহী চা উৎপাদনকারী প্রতিষ্ঠান ন্যাশনাল টি কোম্পানি (এনটিসি) এখন চরম অস্তিত্ব সংকটে। টানা লোকসান, ঋণের ক্রমবর্ধমান বোঝা, উৎপাদন ব্যয় বৃদ্ধি এবং বাজারজাতকরণে অদূরদর্শিতার কারণে প্রতিষ্ঠানটির ভবিষ্যৎ নিয়ে গভীর উদ্বেগ দেখা দিয়েছে।
একই সঙ্গে হবিগঞ্জ ও সিলেট অঞ্চলের জগদীশপুর, তেলিয়াপাড়া, চন্ডিছড়া, পারকুল, মাধবপুর, প্রেমনগর, বিজয়া, পাত্রখোলা, চাম্পারাই, মদনমোহনপুর ও লাক্কাতুরাসহ ১২টি চা বাগানের কয়েক হাজার শ্রমিকের জীবন-জীবিকা এখন অনিশ্চয়তার মুখে।
নিরীক্ষা প্রতিষ্ঠান আর্টিজান চার্টার্ড অ্যাকাউন্ট্যান্টসের সাম্প্রতিক প্রতিবেদনে এনটিসির আর্থিক দুরবস্থার ভয়াবহ চিত্র ফুটে উঠেছে।
প্রতিবেদনে জানানো হয়, ২০১৯-২০ অর্থবছর থেকে ধারাবাহিকভাবে লোকসানে রয়েছে কোম্পানিটি। ২০২৪ সালের ৩০ জুন পর্যন্ত এনটিসির পুঞ্জীভূত লোকসানের পরিমাণ দাঁড়িয়েছে ২৩৯ কোটি ৯ লাখ টাকা। একই সময়ে প্রতিষ্ঠানটির দীর্ঘ ও স্বল্পমেয়াদি ঋণের বোঝা বেড়ে দাঁড়িয়েছে ৪৪৩ কোটি ২৮ লাখ টাকায়। বর্তমানে কোম্পানির শেয়ারপ্রতি নিট সম্পদ মূল্য (এনএভিপিএস) ঋণাত্মক ১৪৪ দশমিক ৯৭ টাকা, যা কোম্পানির আর্থিক অবস্থার গভীর সংকটেরই ইঙ্গিত দেয়।
বাগান সংশ্লিষ্ট সূত্র জানায়, গত কয়েক বছরে শ্রমিকদের মজুরি বৃদ্ধি ছাড়াও বিদ্যুৎ, জ্বালানি, সার, কীটনাশক ও যন্ত্রপাতির দাম উল্লেখযোগ্য হারে বেড়েছে। কিন্তু উৎপাদন ব্যয়ের সঙ্গে পাল্লা দিয়ে চায়ের বাজারমূল্য বাড়েনি। এছাড়া উৎপাদিত চা চট্টগ্রাম নিলাম কেন্দ্রে নিয়ে বিক্রি করতে গিয়ে পরিবহন ও গুদামজাতকরণে বাড়তি ব্যয়ের চাপ সইতে হচ্ছে কোম্পানিকে।
সংশ্লিষ্টদের মতে, আন্তর্জাতিক বাজারে বাংলাদেশের চায়ের অবস্থান এখনও সীমিত। ফলে রপ্তানি সম্ভাবনা থাকলেও কাঙ্ক্ষিত বাজার সম্প্রসারণ হচ্ছে না। মৌসুমের শুরুতে চায়ের দাম কিছুটা ভালো থাকলেও পরে তা কমে যায়, যা উৎপাদকদের জন্য নতুন সংকট তৈরি করে।
চন্ডিছড়া চা বাগানে ন্যাশনাল টি কোম্পানি উৎপাদিত চায়ের প্রায় ২৫ শতাংশ নিজস্ব ব্র্যান্ডে প্যাকেটজাত করে বাজারজাত করছে। তবে শক্তিশালী বিপণন নেটওয়ার্ক ও আধুনিক বিপণন কৌশলের অভাবে এ খাতে প্রত্যাশিত সাফল্য আসছে না। সংশ্লিষ্ট মহলের মতে, বিপণন ব্যবস্থাকে আরও কার্যকর, স্বচ্ছ ও জবাবদিহিমূলক করা গেলে বিক্রি বাড়ানো সম্ভব। বিপণন বিভাগের লোকজন কাজে আন্তরিকতা নন।
এদিকে চলতি বছর অতিবৃষ্টি ও প্রতিকূল আবহাওয়ার কারণে চা উৎপাদনও কমে গেছে। অনেক বাগানে পাতা সংগ্রহ ব্যাহত হয়েছে। ফলে চলতি অর্থবছরে লোকসান আরও বাড়ার আশঙ্কা দেখা দিয়েছে। জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাবও চা শিল্পের জন্য নতুন চ্যালেঞ্জ হয়ে উঠছে বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।
সবচেয়ে বড় উদ্বেগের বিষয় হলো, এনটিসির ১২টি চা বাগানে প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষভাবে ১০ হাজারেরও বেশি শ্রমিক ও কর্মচারী জীবিকা নির্বাহ করেন। প্রতিষ্ঠানটি দীর্ঘমেয়াদি আর্থিক সংকটে পড়ে কার্যক্রম সংকুচিত বা বন্ধ হয়ে গেলে হাজারো শ্রমিক পরিবার অনিশ্চয়তার মুখে পড়বে। চা বাগানকেন্দ্রিক স্থানীয় অর্থনীতিতেও এর নেতিবাচক প্রভাব পড়বে।
বিশ্লেষকদের মতে, ঋণ পুনঃতফসিল, উৎপাদন ব্যয় নিয়ন্ত্রণ, বিপণন সম্প্রসারণ, রপ্তানি বাজার বৃদ্ধি এবং প্রশাসনিক স্বচ্ছতা নিশ্চিত করা গেলে প্রতিষ্ঠানটি ঘুরে দাঁড়াতে পারে। একই সঙ্গে সরকার সহজ শর্তে ঋণ সুবিধা ও নীতিগত সহায়তা দিলে চা বাগানগুলো পুনরায় লাভজনক হওয়ার সুযোগ সৃষ্টি হবে।
এনটিসির ব্যবস্থাপনা পরিচালক জিয়াউল হাসান বলেন, “সব বাগানে উৎপাদন বৃদ্ধি এবং চায়ের গুণগত মান উন্নয়নে আমরা নিরলসভাবে কাজ করছি। ব্যয় নিয়ন্ত্রণ ও বাজার সম্প্রসারণের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। আমরা আশাবাদী, ধীরে ধীরে লোকসান কমিয়ে এনটিসির বাগানগুলোকে আবারও সোনালি সময়ে ফিরিয়ে নিতে সক্ষম হব”।