মো. সাইদুজ্জামান সাঈদ, রামু (কক্সবাজার)
প্রকাশ : ৬ ঘণ্টা আগে
আপডেট : ৫ ঘণ্টা আগে
বান্দরবানের নাইক্ষ্যংছড়ির গর্জনিয়া উত্তর বড়বিল-দক্ষিণ বাইশারী সংযোগ সেতুটি ২০১২ সালে পাহাড়ি ছড়ার বন্যার পানির তোড়ে ধসে পড়ে। ছবি: প্রতিদিনের বাংলাদেশ
বান্দরবানের নাইক্ষ্যংছড়ি উপজেলায় একটি সেতু ধসে পড়ার ১৪ বছরেও সংস্কার কিংবা পুনর্নির্মাণ করা হয়নি বলে অভিযোগ উঠেছে।
উপজেলার বাইশারী ইউনিয়নে অবস্থিত গর্জনিয়া উত্তর বড়বিল-দক্ষিণ বাইশারী সংযোগ সেতুটি ২০১২ সালে পাহাড়ি বন্যার পানির তোড়ে ধসে পড়ে।
এতে দুই ইউনিয়নের হাজারো মানুষ কাঠ ও বাঁশের তৈরি ঝুঁকিপূর্ণ অস্থায়ী সাঁকোর ওপর নির্ভর করে চলাচল করছে।
এই সেতুটি শুধু একটি যোগাযোগ অবকাঠামো নয়; এটি রামু উপজেলার গর্জনিয়া ইউনিয়ন ও নাইক্ষ্যংছড়ির বাইশারী ইউনিয়নের মানুষের শিক্ষা, স্বাস্থ্যসেবা, কৃষি ও দৈনন্দিন জীবনের প্রধান সংযোগপথ।
স্থানীয়দের অভিযোগ, অস্থায়ী সাঁকোটি অত্যন্ত নড়বড়ে। সামান্য বৃষ্টি বা পাহাড়ি ঢল নামলেই তা বিপজ্জনক হয়ে ওঠে। প্রতিদিন শিক্ষার্থী, রোগী, কৃষক ও ব্যবসায়ীরা জীবনের ঝুঁকি নিয়ে এই পথ ব্যবহার করছেন।
২০২৩ সালে সাঁকো থেকে পড়ে এক স্কুলছাত্র আহত হওয়ার ঘটনাও ঘটে। এরপরও স্থায়ী সমাধান হয়নি বলেও অভিযোগ করেন তারা।
বাইশারী ইউনিয়নের ৭ নম্বর ওয়ার্ডের বাসিন্দা মো. আনোয়ার হোসেন ক্ষোভ প্রকাশ করে বলেন, এত বছর ধরে একটি সেতু এভাবে পড়ে থাকা অবিশ্বাস্য। মানুষের জীবনের নিরাপত্তা নিয়ে কারও কোনো উদ্যোগ নেই।
কৃষক আবুল কালাম বলেন, যোগাযোগ সমস্যার কারণে কৃষিপণ্য বাজারজাত করতে সময় ও খরচ দুটোই বাড়ছে।
স্থানীয় বাসিন্দা মো. সাইফুল ইসলাম বলেন, “বারবার বলেছি, লিখেছি, কিন্তু কোনো ফল হয়নি। সেতু না থাকায় কৃষিপণ্য বাজারে নিতে বড় সমস্যা হচ্ছে।”
গর্জনিয়া ইউনিয়নের ১ নম্বর ওয়ার্ডের বাসিন্দা মাহাবুল আলম বলেন, গর্জনিয়া থেকে উৎপাদিত শাকসবজি ও কৃষিপণ্য বাইশারী বাজারে নিতে এই ঝুঁকিপূর্ণ সাঁকোই একমাত্র পথ। অনেক সময় সাঁকো ভেঙে গেলে কয়েক দিন যোগাযোগ বিচ্ছিন্ন থাকে।
স্থানীয়দের দাবি, প্রতিদিন কয়েক টন শাকসবজি, পান, কলা, মরিচ, আদা, হলুদসহ বিভিন্ন কৃষিপণ্য এই পথে পরিবহন হয়। সেতু না থাকায় কৃষকেরা ন্যায্যমূল্য থেকেও বঞ্চিত হচ্ছেন।
এলাকার কয়েকটি প্রাথমিক বিদ্যালয়, মাধ্যমিক বিদ্যালয় ও মাদ্রাসার শিক্ষার্থীরাও প্রতিদিন এই ঝুঁকিপূর্ণ সাঁকো পার হয়ে যাতায়াত করে। অভিভাবকদের আশঙ্কা, বর্ষায় যেকোনো সময় বড় দুর্ঘটনা ঘটতে পারে।
বাইশারী ইউনিয়নের ৭ নম্বর ওয়ার্ডের ইউপি সদস্য মো. নুরুল কবির বলেন, “এই সাঁকোর ওপর হাজারো মানুষের জীবন ঝুঁকির মধ্যে রয়েছে। শিক্ষার্থীরাই সবচেয়ে বেশি বিপদে পড়ে।” তিনি দ্রুত সেতুটি পুনর্নির্মাণের দাবি জানান।
স্থানীয় সূত্রে জানা যায়, ১৯৯৬ সালে নির্মিত সেতুটি দীর্ঘদিন ব্যবহারের পর ২০১২ সালে পাহাড়ি বন্যায় ধসে যায়। এরপর একাধিকবার সংশ্লিষ্ট দপ্তরে আবেদন করা হলেও কার্যকর কোনো উদ্যোগ নেওয়া হয়নি।
স্থানীয়দের অভিযোগ, এটি দুই জেলার সীমান্তবর্তী এলাকায় হওয়ায় দায়িত্ব নির্ধারণ নিয়ে দীর্ঘদিন ধরে টানাপোড়েন চলছে। ফলে স্থানীয় সরকার প্রকৌশল অধিদপ্তর, জেলা পরিষদ বা পার্বত্য চট্টগ্রাম উন্নয়ন বোর্ড—কেউই কার্যকর পদক্ষেপ নেয়নি।
গর্জনিয়া ইউনিয়নের ১ নম্বর ওয়ার্ডের ইউপি সদস্য মো. ফিরোজ আহমদ বলেন, বারবার কর্মকর্তারা এসে দেখে গেছেন, গণমাধ্যমেও খবর হয়েছে, কিন্তু বাস্তবে কোনো পরিবর্তন হয়নি।
বাইশারী ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান মো. আলম বলেন, সেতুটি পুনর্নির্মাণের জন্য জেলা পরিষদে আবেদন করা হয়েছে, কিন্তু এখনও অগ্রগতি হয়নি।
নাইক্ষ্যংছড়ি উপজেলা প্রকৌশলী মো. নজরুল ইসলাম বলেন, সেতুটি কোন উপজেলার আওতাধীন তা নিশ্চিত নয়। যে উপজেলার অধীনে পড়বে, তারাই কাজটি করবে।
যদি এটি আমাদের এলাকায় পড়ে, তাহলে আমরা প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেব, বলেন তিনি।
স্থানীয়দের প্রশ্ন, একটি গুরুত্বপূর্ণ সেতু এত বছর ধরে ভাঙা অবস্থায় পড়ে থাকলেও প্রশাসন কেন এখনও দায়িত্ব নির্ধারণ করতে পারেনি।
তারা বলেন, বর্ষা মৌসুমে পাহাড়ি ঢলে পরিস্থিতি আরও ভয়াবহ হয়, তখন সাঁকো ভেঙে পুরো এলাকা কয়েক দিন বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়ে।
এতে জরুরি রোগী পরিবহন, প্রসূতি মাকে হাসপাতালে নেওয়া এবং শিক্ষার্থীদের যাতায়াত প্রায় অসম্ভব হয়ে পড়ে বলেও জানান তারা।
স্থানীয়রা আশঙ্কা করছেন, দ্রুত ব্যবস্থা না নিলে যেকোনো সময় বড় ধরনের প্রাণহানির ঘটনা ঘটতে পারে।
তারা দাবি করেন, রামু উপজেলা ও নাইক্ষ্যংছড়ি উপজেলা প্রশাসনকে যৌথভাবে উদ্যোগ নিতে হবে। পাশাপাশি স্থানীয় সরকার প্রকৌশল অধিদপ্তর, জেলা পরিষদ ও পার্বত্য চট্টগ্রাম উন্নয়ন বোর্ডকে সমন্বিতভাবে সেতুটি পুনর্নির্মাণ করতে হবে।
দীর্ঘ ১৩–১৪ বছরের অবহেলায় পড়ে থাকা এই সেতু এখন শুধু একটি ভাঙা অবকাঠামো নয়; এটি উন্নয়ন ব্যবস্থার সমন্বয়হীনতার প্রতীক হয়ে দাঁড়িয়েছে। আর এর সবচেয়ে বড় মূল্য দিচ্ছে দুই উপজেলার হাজারো মানুষ।