কিশোরগঞ্জের হাওরাঞ্চলে মানুষকে পাড়াপাড়ের জন্য রাখা নৌকা। ছবি: প্রতিদিনের বাংলাদেশ
কিশোরগঞ্জের হাওরাঞ্চলে সাম্প্রতিক সময়ে নৌ ডাকাতির ঘটনা বেড়ে যাওয়ায় যাত্রীদের নিরাপত্তার স্বার্থে সন্ধ্যা ৬টার পর যাত্রীবাহী নৌকা চলাচল বন্ধের নির্দেশ দিয়েছে উপজেলা প্রশাসন।
তবে প্রশাসনের এ সিদ্ধান্তকে ঘিরে স্থানীয় বাসিন্দা, রাজনৈতিক নেতৃবৃন্দ ও বিভিন্ন শ্রেণি-পেশার মানুষের মধ্যে ব্যাপক আলোচনা ও সমালোচনার সৃষ্টি হয়েছে।
অনেকেই বলছেন, নিরাপত্তা নিশ্চিত করার পরিবর্তে যাতায়াত বন্ধ করে দেওয়া সমস্যার স্থায়ী সমাধান হতে পারে না।
সম্প্রতি কিশোরগঞ্জের মিঠামইন উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) ও উপজেলা পর্যটন ব্যবস্থাপনা ও উন্নয়ন কমিটির সভাপতি এস. এম. আব্দুল্লাহ-বিন-শফিক স্বাক্ষরিত এক বিশেষ বিজ্ঞপ্তিতে এ নির্দেশনা জারি করা হয়।
বিজ্ঞপ্তিতে বলা হয়, “সন্ধ্যা ৬টার পর কোনো যাত্রীবাহী নৌকা মিঠামইন ঘাট থেকে ছেড়ে যেতে পারবে না।
“পরবর্তী নির্দেশ না দেওয়া পর্যন্ত সবাইকে এ আদেশ মেনে চলার জন্য বিশেষভাবে অনুরোধ করা হলো। নির্দেশনা অমান্যকারীদের বিরুদ্ধে আইনানুগ ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে।”
জানা যায়, গত ৭ জুন রাতে মিঠামইন ও করিমগঞ্জ উপজেলার সীমান্তবর্তী হাসানপুর ব্রিজ এলাকায় একটি পর্যটকবাহী ট্রলারে সংঘবদ্ধ ডাকাতির ঘটনা ঘটে।
দেশের বিভিন্ন এলাকা থেকে আসা প্রায় ৪০ জন পর্যটক হাওর ভ্রমণ শেষে রাতে মিঠামইন থেকে ট্রলারে করে বালিখোলা ঘাটের উদ্দেশ্যে রওনা দেন।
ট্রলারটি হাসানপুর ব্রিজ এলাকায় পৌঁছালে দেশীয় অস্ত্রে সজ্জিত একদল ডাকাত ট্রলারে উঠে যাত্রীদের জিম্মি করে।
পরে তারা যাত্রীদের মারধর করে মোবাইল ফোন, নগদ টাকা, স্বর্ণালংকারসহ মূল্যবান মালামাল লুট করে নেয়।
এ ঘটনায় পুরো হাওরাঞ্চলে আতঙ্ক ছড়িয়ে পড়ে এবং প্রশাসন নিরাপত্তা ব্যবস্থা জোরদারের বিষয়ে আলোচনা শুরু করে।
প্রশাসনের দাবি, যাত্রীদের জীবন ও সম্পদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতেই এ পদক্ষেপ নেওয়া হয়েছে।
প্রশাসনের নির্দেশনা নিয়ে উদ্বিগ্ন স্থানীয়রা
স্থানীয়দের মতে, হাওরাঞ্চলের মানুষের একমাত্র যোগাযোগ মাধ্যম নৌপথ। ফলে সন্ধ্যার পর নৌ চলাচল বন্ধ হয়ে গেলে চিকিৎসা, শিক্ষা, ব্যবসা-বাণিজ্যসহ দৈনন্দিন জীবনযাত্রা মারাত্মকভাবে ব্যাহত হবে।
তাদের দাবি, যাত্রীবাহী নৌকা বন্ধ না করে নৌ পুলিশ ও আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর টহল বৃদ্ধি, ঝুঁকিপূর্ণ এলাকাগুলোতে স্থায়ী নিরাপত্তা চৌকি স্থাপন এবং দ্রুত ডাকাতদের গ্রেপ্তারের মাধ্যমে হাওরে নিরাপদ যাতায়াত নিশ্চিত করতে হবে।
এতে একদিকে যেমন ডাকাতি রোধ হবে, অন্যদিকে হাওরবাসীকেও ভোগান্তিতে পড়তে হবে না, বলেন তারা।
প্রশাসনের নতুন নির্দেশনা নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন স্থানীয় বাসিন্দারা।
মিঠামইনের বাসিন্দা জহিরুল ইসলাম প্রশ্ন তোলেন, বর্ষাকালে যদি রাত ১০টায় আমার বৃদ্ধ বাবা অসুস্থ হয়ে পড়েন কিংবা আমার বোনের প্রসব ব্যথা শুরু হয়, তাহলে আমরা চিকিৎসার জন্য কোথায় যাব।
তিনি বলেন, হাওরের মানুষের নৌকাই ভরসা। আমরা চাই নৌ চলাচল বন্ধ না করে হাওরে পুলিশের টহল বৃদ্ধি করা হোক এবং নিরাপদ যাতায়াত নিশ্চিত করা হোক।
মিঠামইন উপজেলা বিএনপির সাংগঠনিক সম্পাদক অ্যাডভোকেট জসিম উদ্দিন রুবেল বলেন, “আমি প্রশাসনকে বলেছি, যাত্রীবাহী নৌকা বন্ধ না করে হাওরে নৌ পুলিশের টহল বাড়ানো হোক।
“কাটা গাঙ্গের মুখ এলেংজুড়ি ও হাসানপুর ব্রিজ—এই দুটি স্পটকে ঝুঁকিপূর্ণ এলাকা হিসেবে চিহ্নিত করে সেখানে নিয়মিত টহল জোরদার করলেই পরিস্থিতি অনেকটা নিয়ন্ত্রণে আসবে।”
তিনি আরও বলেন, “হাতে অসুখ হলে কি চিকিৎসা না করে হাত কেটে ফেলবেন? অবশ্যই না। একইভাবে ডাকাতির সমাধান নৌকা বন্ধ করে দেওয়া হতে পারে না “
তিনি আরও প্রশ্ন তোলেন, “কিন্তু নৌ পুলিশ জানিয়েছে, তাদের বরাদ্দকৃত জ্বালানি দিয়ে এক ঘণ্টাও নিয়মিত টহল দেওয়া সম্ভব নয়। তাহলে বাকি সময় কীভাবে নিরাপত্তা নিশ্চিত হবে”
এ বিষয়ে এনসিপির কেন্দ্রীয় নেতা আকরাম হোসেন রাজ বলেন, “এই নির্দেশনার মাধ্যমে প্রশাসনের চরম ব্যর্থতা প্রকাশ পেয়েছে। তারা নিরাপত্তা দিতে পারছে না বলেই সন্ধ্যার পর নৌকা চলাচল বন্ধ করে দিয়েছে।”
“এমনকি যারা চলাচল করবে তাদের বিরুদ্ধে আইনগত ব্যবস্থা নেওয়ার কথাও বলা হয়েছে। এর অর্থ হলো তারা নিজেদের অক্ষমতা লিখিতভাবে স্বীকার করেছে”, দাবি করেছেন এই নেতা।
এনসিপি নেতা বলেন, “হাওরের মানুষের চিকিৎসা, জরুরি যাতায়াত কিংবা মরদেহ বাড়িতে নেওয়ার মতো বিষয়গুলোও বিবেচনায় রাখতে হবে।”
তিনি আরও বলেন, কিছুদিন আগে আমার পাশের ইউনিয়নের এক যুবক তার দাদির মরদেহ নিয়ে বাড়ি ফিরছিল। সেই নৌকাতেও ডাকাতরা হামলা করেছে।”
এই নেতা প্রশ্ন তোলেন, কেউ যদি হাসপাতালে মারা যান, তাহলে কি পরিবারের সদস্যরা সারারাত মরদেহ নিয়ে অপেক্ষা করবেন?
আমরা চাই হাওরের চিকিৎসা ব্যবস্থা উন্নত হোক এবং একইসঙ্গে নিরাপদ যাতায়াত নিশ্চিত করা হোক দাবি করেন তিনি।
এ বিষয়ে মিঠামইন থানার অফিসার ইনচার্জ মো. লিয়াকত আলী বলেন, “উপজেলা প্রশাসন, পুলিশ প্রশাসন, স্থানীয় বাসিন্দা এবং নৌকার মাঝিদের সঙ্গে আলোচনা করেই এ সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে।
তিনি দাবি করেন, এমন সিদ্ধান্ত আগেও কার্যকর ছিল। সন্ধ্যা ৬টাকে শেষ ট্রিপ হিসেবে নির্ধারণ করা হয়েছে।
মিঠামইন উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা এস. এম. আব্দুল্লাহ-বিন-শফিক বলেন, “সন্ধ্যার পর হাওরের নৌপথ নিরাপদ থাকে না। হাওর একটি বিশাল এলাকা। অনেক সময় বিভিন্ন স্থানে ডাকাতির ঘটনা ঘটে।
“সম্প্রতি সংঘটিত ডাকাতির ঘটনাও আমাদের উদ্বিগ্ন করেছে। তাই যাত্রীদের নিরাপত্তার বিষয়টি বিবেচনা করেই সাময়িকভাবে এই সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে।”