মীর শাহে আলম। ফাইল ছবি
বগুড়ার প্রশাসনিক মানচিত্রে একসঙ্গে কয়েকটি নতুন ইউনিয়নের আত্মপ্রকাশ ঘটেছে। এরই সঙ্গে প্রকাশিত হয়েছে এক প্রতিমন্ত্রীর শাহেনশার মতো নামজারির ঘটনা।
এ ঘটনায় শুধু বগুড়া নয়, সামাজিক মাধ্যমেও শুরু হয়েছে আলোচনা-সমালোচনা। নবগঠিত মোকামতলা উপজেলায় তিনটি নতুন ইউনিয়ন ও শিবগঞ্জ উপজেলায় একটি নতুন ইউনিয়ন গঠনের সরকারি গেজেট প্রকাশের পর উন্নয়ন ও প্রশাসনিক পুনর্গঠনের চেয়ে এখন বেশি আলোচিত হচ্ছে ইউনিয়নগুলোর নাম। এসব নামের সঙ্গে স্থানীয় সরকার প্রতিমন্ত্রী মীর শাহে আলমের নামও ব্যাপক আলোচিত হচ্ছে। কেউ কেউ তাকে বগুড়ার ‘নতুন জমিদার’ নামেও আখ্যা দিচ্ছেন।
মোকামতলা
উপজেলায় গঠিত নতুন ইউনিয়ন দুটি হলোÑ‘সীমান্ত’ ও ‘দিগন্ত’। এ দুটি নাম স্থানীয় সরকার
প্রতিমন্ত্রী মীর শাহে আলমের দুই ছেলে মীর শাকরুল আলম সীমান্ত ও মীর সাকলাইন আলম দিগন্তের
নামের শেষাংশের সঙ্গে হুবহু মিলে গেছে!
অন্যদিকে
শিবগঞ্জ উপজেলায় নতুন গঠিত ইউনিয়নের নাম রাখা হয়েছে ‘মীরবাড়ী’, যা প্রতিমন্ত্রীর পারিবারিক
ও আদি নিবাস হিসেবে পরিচিত। গত রবিবার বগুড়া জেলা প্রশাসক তৌফিকুর রহমান স্বাক্ষরিত
গেজেটে এসব ইউনিয়ন গঠন ও পুনর্গঠনের তথ্য প্রকাশিত হওয়ার পর থেকেই বিষয়টি নিয়ে সামাজিক
মাধ্যম, রাজনৈতিক অঙ্গন ও স্থানীয়দের মধ্যে শুরু হয়েছে আলোচনা-সমালোচনা। অনেকেই প্রশ্ন
তুলেছেন, প্রশাসনিক ইউনিটের নামকরণে একজন ক্ষমতাসীন রাজনৈতিক ব্যক্তি ও তার পরিবারের
প্রভাব কতটা গ্রহণযোগ্য।
সরকারি
গেজেট অনুযায়ী নবগঠিত মোকামতলা উপজেলায় ময়দানহাট্টা ইউনিয়ন ভেঙে ‘স্বর্ণগ্রাম’ ইউনিয়ন,
সৈয়দপুর ইউনিয়ন ভেঙে ‘সীমান্ত’ ইউনিয়ন ও দেউলী ইউনিয়ন ভেঙে ‘দিগন্ত’ ইউনিয়ন গঠন করা
হয়েছে।
নতুন
গঠিত সীমান্ত ইউনিয়নের জনসংখ্যা ১৬ হাজার ২৬৭ জন এবং দিগন্ত ইউনিয়নের জনসংখ্যা ১৭ হাজার
৭৫৯ জন। একই সঙ্গে পুরনো ইউনিয়নগুলোকেও নতুন করে পুনর্গঠন করা হয়েছে।
অন্যদিকে
শিবগঞ্জ উপজেলায় বিহার, রায়নগর ও বুড়িগঞ্জ ইউনিয়নের বিভিন্ন মৌজা নিয়ে গঠন করা হয়েছে
‘মীরবাড়ী’। নতুন এ ইউনিয়নটির জনসংখ্যা ১৮ হাজার ৯২৪ জন।
এ ছাড়া
শিবগঞ্জ পৌরসভার সীমানা সম্প্রসারণের অংশ হিসেবে বিহার, রায়নগর, বুড়িগঞ্জ, কিচক ও আটমুল
ইউনিয়নও পুনর্গঠন করা হয়েছে।
প্রশাসনিক
পুনর্গঠনের ক্ষেত্রে নতুন ইউনিয়ন বা পৌরসভার নাম সাধারণত এলাকার ঐতিহাসিক পরিচিতি,
ভৌগোলিক বৈশিষ্ট্য, সাংস্কৃতিক ঐতিহ্য কিংবা জনমতের ভিত্তিতে নির্ধারণ করা হয়। কিন্তু
মোকামতলার দুটি ইউনিয়নের নাম সরাসরি প্রতিমন্ত্রীর দুই সন্তানের নামের সঙ্গে মিলে যাওয়ায়
শুরু হয়েছে বিতর্ক।
স্থানীয়দের
একটি অংশ বলছেন, নতুন ইউনিয়নগুলোর নামকরণে এলাকার ইতিহাস বা ভৌগোলিক বৈশিষ্ট্যের প্রতিফলন
খুব একটা দেখা যাচ্ছে না। বরং নামগুলো ব্যক্তিকেন্দ্রিক।
সামাজিক
মাধ্যমে অনেকে প্রশ্ন তুলেছেন, দেশের প্রশাসনিক কাঠামোর অংশ হিসেবে থাকা ইউনিয়নের নাম
কোনো রাজনৈতিক নেতার পরিবারের সদস্যদের নামে হওয়া উচিত কি না। কেউ কেউ বিষয়টিকে ব্যক্তিপূজার
সংস্কৃতির সঙ্গে তুলনা করেছেন। বগুড়ার একজন শিক্ষক বলেন, নতুন ইউনিয়ন গঠন অবশ্যই ভালো
উদ্যোগ। কিন্তু নামকরণ এমন হওয়া উচিত, যা এলাকার পরিচয় বহন করবে। একজন মন্ত্রীর ছেলেদের
নামের সঙ্গে মিলে যায় এমন নাম দেওয়া হলে মানুষের মধ্যে প্রশ্ন তো উঠবেই।
একজন
অবসরপ্রাপ্ত সরকারি কর্মকর্তা বলেন, ‘যদি নামগুলো কাকতালীয়ও হয়, তবুও জনমনে সন্দেহ
তৈরি হওয়ার মতো পরিস্থিতি সৃষ্টি হয়েছে। প্রশাসনিক সিদ্ধান্তে এমন বিতর্ক এড়ানো উচিত
ছিল।’
মোকামতলার
সীমান্ত ও দিগন্ত ইউনিয়নের পাশাপাশি সবচেয়ে বেশি আলোচনায় এসেছে শিবগঞ্জ উপজেলার নতুন
‘মীরবাড়ী’ ইউনিয়ন।
স্থানীয়
সূত্রগুলো বলছে, মীর শাহে আলমের পারিবারিক শেকড় শিবগঞ্জের যে এলাকায়, সেটি দীর্ঘদিন
ধরে ‘মীরবাড়ী’ নামে পরিচিত। ফলে ইউনিয়নের নাম হিসেবে ‘মীরবাড়ী’ অনুমোদন পাওয়ার পর অনেকে
এটিকে প্রতিমন্ত্রীর পারিবারিক পরিচয়ের প্রশাসনিক স্বীকৃতি হিসেবে দেখছেন। সমালোচকদের
ভাষ্য, একই সময়ে একজন প্রতিমন্ত্রীর দুই ছেলের নামে দুটি ইউনিয়ন ও তার গ্রামের নামে
আরেকটি ইউনিয়ন গঠন হওয়া নিছক কাকতালীয় হিসেবে দেখার সুযোগ নেই। মীর শাহে আলমের রাজনৈতিক
ও পারিবারিক পরিচয় পর্যালোচনা করলে দেখা যায়, তার পরিবারের সদস্যরা দীর্ঘদিন ধরেই বিএনপির
রাজনীতির সঙ্গে সম্পৃক্ত।
তার
বড় ছেলে মীর শাকরুল আলম সীমান্ত বর্তমানে শিবগঞ্জ উপজেলা বিএনপির ছাত্রবিষয়ক সম্পাদক।
ছোট ছেলে মীর সাকলাইন আলম দিগন্তও রাজনৈতিক ও সামাজিক কর্মকাণ্ডের সঙ্গে যুক্ত বলে
স্থানীয়রা জানিয়েছেন।
পরিবারের
অন্য সদস্যরাও স্থানীয় রাজনীতিতে সক্রিয়। এ কারণে নতুন ইউনিয়নের নামগুলোকে অনেকেই পরিবারের
রাজনৈতিক প্রভাবের সম্প্রসারণ হিসেবে ব্যাখ্যা করছেন। অনেক পোস্টে মীর শাহে আলমকে
‘বগুড়ার নতুন জমিদার’ হিসেবে উল্লেখ করেছেন।
এ বিষয়ে
স্থানীয় সরকার প্রতিমন্ত্রী মীর শাহে আলমের ব্যক্তিগত নম্বরে ফোন করা হলেও তিনি কল
রিসিভ করেননি। মেসেজ করেও কোনো উত্তর পাওয়া যায়নি। একই বিষয়ে স্থানীয় সরকার মন্ত্রণালয়ের
কেউ আনুষ্ঠানিকভাবে কথা বলতে চাননি।
প্রশাসনিক
এলাকাগুলোর নামকরণ স্থানীয় সরকার প্রতিমন্ত্রীর পরিবারের নামে হওয়ায় এর নৈতিকতা নিয়ে
তীব্র সমালোচনা হচ্ছে। সুশাসনের জন্য নাগরিকের (সুজন) সম্পাদক বদিউল আলম মজুমদার এই
ঘটনাকে ব্যক্তিগত রুচিহীনতা হিসেবে অভিহিত করেছেন। তিনি প্রতিদিনের বাংলাদেশকে
বলেন, পরিবারের নামে ব্যক্তির নামে এগুলো কোনোভাবেই কাঙ্ক্ষিত নয়। হ্যাঁ; কোনো গুরুত্বপূর্ণ
ব্যক্তি যদি হয়, যিনি সর্বজন শ্রদ্ধেয়, যাকে সবাই স্মরণ রাখতে চায়। এ রকম হলে হতে পারে।
বগুড়ায় যেটা হয়েছে, সেটা না হওয়াই ভালো ছিল। এটা অগ্রহণযোগ্য চর্চা। রাষ্ট্রীয় কার্যক্রমে
এ ধরনের পারিবারিক প্রভাব বিস্তার করা মোটেও কাম্য নয়।