শাহ্ আলম শাহী, দিনাজপুর, সাইফুল হক মোল্লা দুলু, মধ্যাঞ্চল ও খোকন বিকাশ ত্রিপুরা জ্যাক, খাগড়াছড়ি
প্রকাশ : ২ ঘণ্টা আগে
আপডেট : ২ ঘণ্টা আগে
কিশোরগঞ্জের পাকুন্দিয়ায় এক বাগানে ঝুলছে টসটসে রসালো লিচু। প্রবা ফটো
মধুমাস জ্যৈষ্ঠ মানেই রসালো ফলের সমারোহ। আর এই ফলের বাজারে এখন রাজত্ব করছে সুমিষ্ট লিচু। দেশের উত্তরের জেলা দিনাজপুর থেকে শুwরু করে পাহাড়ের খাগড়াছড়ি এবং হাওরঘেঁষা কিশোরগঞ্জের পাকুন্দিয়ায় লিচু ঘিরে তৈরি হয়েছে এক বিশাল অর্থনৈতিক কর্মযজ্ঞ। ফলন ও দামে এবার চাষি, বাগানমালিক থেকে শুরু করে ব্যবসায়ীদের মুখে ফুটেছে তৃপ্তির হাসি। তিন অঞ্চলের লিচুর অর্থনীতি ও সম্ভাবনা নিয়ে প্রতিদিনের বাংলাদেশ-এর বিশেষ এই আয়োজন।
লিচুর রাজধানী দিনাজপুর : লিচুর রাজধানী খ্যাত দিনাজপুরে এখন প্রতিদিন প্রায় ১২ থেকে ১৫ কোটি টাকার লিচু বেচাকেনা হচ্ছে। কালীতলা নিউমার্কেটসহ জেলার বাজারগুলোতে ভোর থেকে গভীর রাত পর্যন্ত চলছে ক্রেতা-বিক্রেতাদের হাঁকডাক। জিআই স্বীকৃতি পাওয়া বেদানা লিচুর পাশাপাশি বোম্বাই, চায়না-থ্রি, মোজাফফরি ও মাদ্রাজি জাতের লিচুর ব্যাপক কদর রয়েছে। প্রতিদিন শত শত ট্রাকে করে এসব লিচু ছড়িয়ে পড়ছে সারা দেশে।
অতিরিক্ত বৃষ্টি ও কালবৈশাখীর কারণে এবার ফলন কিছুটা কম হলেও দাম ভালো পাওয়ায় ক্ষতি পুষিয়ে নিচ্ছেন চাষিরা। বিরল উপজেলার চাষি মতিউর রহমান বলেন, ‘ফলন কম হলেও এবার বাজারে লিচুর দাম বেশ ভালো, আশা করছি লাভবান হব।’
কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের উপপরিচালক মো. আফজাল হোসেন প্রতিদিনের বাংলাদেশকে বলেন, ‘এ বছর প্রাকৃতিক দুর্যোগে লিচুর উৎপাদন ১০-১৫ শতাংশ কম হলেও আকার ও মান বেশ ভালো হয়েছে। এবার উৎপাদন লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করা হয়েছে ৩১ হাজার ৭৯০ মেট্রিক টন। বাজারদর ভালো থাকায় মোট বাজারমূল্য ৯০০ থেকে ১ হাজার কোটি টাকায় পৌঁছতে পারে।’
দিনাজপুর হর্টিকালচার সেন্টারের উপপরিচালক কৃষিবিদ ড. এজামুল হক প্রতিদিনের বাংলাদেশকে বলেন, ‘আবহাওয়াজনিত কারণে পরাগায়নে সমস্যা ও ঝড়ে কিছু ক্ষতি হলেও দিনাজপুরের লিচুর স্বাদ ও গন্ধ আলাদা হওয়ায় এ লিচু দেশ-বিদেশে সমাদৃত।’
ইতোমধ্যে গত বছর স্কয়ার ফুড অ্যান্ড বেভারেজের মাধ্যমে ফ্রান্স, কানাডা ও অস্ট্রেলিয়ায় বেদানা লিচু রপ্তানি হয়েছে। কৃষি বিভাগ জানিয়েছে, এ বছর গতবারের চেয়েও বেশি লিচু রপ্তানির সম্ভাবনা রয়েছে।
পাহাড়ে রেকর্ড ফলনে আশার আলো : উত্তরের পর পাহাড়ের সবুজ ঢালেও এখন লাল রঙের উৎসব। বিগত কয়েক বছরের ফলন-বিপর্যয়ের হতাশা কাটিয়ে খাগড়াছড়িতে এবার চায়না-টু ও চায়না-থ্রি জাতের লিচুর বাম্পার ফলন হয়েছে। রাসায়নিকের ব্যবহার কম হওয়ায় পাহাড়ের এই লিচু ‘অর্গানিক’ হিসেবে দেশজুড়ে খ্যাতি পেয়েছে। ঢাকা, চট্টগ্রামসহ দেশের বিভিন্ন অঞ্চলে এই লিচুর ব্যাপক চাহিদা রয়েছে। লিচু ঘিরে পাহাড়ের অর্থনীতিতে ফিরেছে নতুন প্রাণ; কর্মসংস্থান হয়েছে বহু নারী ও পুরুষ শ্রমিকের।
জেলা সদরের চাষি কল্যাণী ত্রিপুরা উচ্ছ্বাস প্রকাশ করে বলেন, ‘গত কয়েক বছর খরচই ওঠেনি। তবে এবার গাছে এত লিচু ধরেছে যে, আমরা নিজেরাই অবাক। ইতোমধ্যে দেড় লাখ টাকার লিচু বিক্রি করেছি।’
খাগড়াছড়ি কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের উপপরিচালক মো. নাসির উদ্দিন চৌধুরী বলেন, ‘চলতি অর্থবছরে জেলায় প্রায় ২ হাজার হেক্টর জমিতে লিচুর আবাদ হয়েছে। আবহাওয়া অত্যন্ত অনুকূল থাকায় বিগত দুই-তিন বছরের তুলনায় এবার ফলন উল্লেখযোগ্যভাবে বেশি। অনেক কৃষক নতুন করে লিচু চাষে আগ্রহী হচ্ছেন এবং আমরা তাদের প্রয়োজনীয় কারিগরি সহায়তা দিচ্ছি।’
জিআই স্বীকৃতির অপেক্ষায় ২২৫ বছরের ঐতিহ্য : উত্তরের সমতল ও পাহাড়ের পাশাপাশি নজর কেড়েছে কিশোরগঞ্জের পাকুন্দিয়া উপজেলার ঐতিহ্যবাহী মঙ্গলবাড়িয়ার লিচু। টসটসে রসালো শাঁস, ছোট বিচি এবং মধুর মতো মিষ্টি স্বাদের এই লিচু বিক্রি করে এক মৌসুমেই প্রায় সাড়ে ১২ কোটি টাকার বাণিজ্য হয়েছে। ১৮০২ সালে চীন থেকে আনা দুটি চারা থেকেই এই লিচুর বিস্তার, যা আজ পুরো এলাকার অর্থনীতির অন্যতম চালিকাশক্তি। বর্তমানে শুধু মঙ্গলবাড়িয়া গ্রামেই প্রায় ২০০টি পরিবার বাণিজ্যিকভাবে লিচু চাষ করছে। স্থানীয় লিচুচাষি আবদুল মান্নান বলেন, ‘এ বছর ফলন খুব ভালো হয়েছে। সরকারিভাবে জিআই স্বীকৃতি পাওয়া গেলে আমাদের এই লিচুর সম্মান ও দামÑ দুই-ই বাড়বে।’
পাকুন্দিয়া উপজেলা কৃষি কর্মকর্তা নূর-ই-আলম প্রতিদিনের বাংলাদেশকে বলেন, ‘মঙ্গলবাড়িয়ার লিচুর ঐতিহ্য ও স্বকীয়তা বিবেচনায় এর জিআই বা ভৌগোলিক নির্দেশক পণ্যের স্বীকৃতির আবেদন প্রক্রিয়া শুরু করার উদ্যোগ নেওয়া হচ্ছে। জিআই স্বীকৃতি পেলে এ অঞ্চলের লিচুর ব্র্যান্ড ভ্যালু আরও বাড়বে।’
পাকুন্দিয়া উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) রূপম দাস প্রতিদিনের বাংলাদেশকে বলেন, ‘মঙ্গলবাড়িয়ার লিচু এখন একটি শক্তিশালী স্থানীয় ব্র্যান্ড। দেশের বিভিন্ন অঞ্চলে এর পরিচিতি আরও ছড়িয়ে দিতে প্রশাসন কাজ করছে। চাষিদের ন্যায্যমূল্য নিশ্চিত করা এবং বাজার ব্যবস্থাপনা উন্নত করার বিষয়েও গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে।’
সব মিলিয়ে স্থানীয় পর্যায়ের এই কৃষিপণ্যটি শুধু নির্দিষ্ট অঞ্চলের গণ্ডিতে আটকে নেই; গুণগত মান ও স্বাদের জোরে এটি এখন দেশের অর্থনীতিতে বড় ধরনের অবদান রাখার পাশাপাশি আন্তর্জাতিক অঙ্গনেও বাংলাদেশের নতুন সম্ভাবনা তৈরি করছে।