খুলনা অফিস
প্রকাশ : ২ ঘণ্টা আগে
আপডেট : ২ ঘণ্টা আগে
খুলনা নগরীর মুজগুনি মহাসড়কে টানা বৃষ্টিতে পানিতে সিএনজি বিকল হয়ে পড়ে থাকতে দেখা যায়। প্রবা ফটো
খুলনা নগরীতে যেন এখন আর নৌবন্দর বানানোর আলাদা কোনো প্রকল্পের দরকার নেই। প্রকৃতি নিজেই দায়িত্ব নিয়ে শহরের ভেতর খাল-বিল তৈরি করে দিচ্ছে! তিন ঘণ্টার টানা বৃষ্টিতেই শহরের প্রধান সড়ক থেকে অলিগলি পর্যন্ত পানিতে তলিয়ে যায়। কোথাও হাঁটু, কোথাও কোমরসমান পানি জমে নগরবাসীর দৈনন্দিন জীবনকে প্রায় স্থবির করে দেয়।
গত বুধবার বিকাল ৫টা ৪৫ মিনিট থেকে রাত ৯টা পর্যন্ত খুলনায় ৭৫ মিলিমিটার বৃষ্টিপাত রেকর্ড করা হয় বলে জানিয়েছেন খুলনা আবহাওয়া কার্যালয়ের সহকারী আবহাওয়াবিদ মিজানুর রহমান। এই স্বল্প সময়ের বৃষ্টিতেই পুরো নগরী জলাবদ্ধ হয়ে পড়ে।
প্রত্যক্ষদর্শী জানায়, নগরীর রয়্যাল মোড়, বাইতিপাড়া, শিববাড়ি মোড়, ময়লাপোতা, ডাকবাংলা, রূপসা ফেরিঘাট, বয়রা বাজার, খানজাহান আলী, বাগমারা, মিস্ত্রিপাড়া, টুটপাড়া, বসুপাড়া, মুজগুন্নী সড়ক, নতুন রাস্তা মোড়, বাস্তুহারা ও কলোনি এলাকায় ভয়াবহ জলাবদ্ধতা সৃষ্টি হয়। অনেক জায়গায় সড়কই আর দৃশ্যমান নেই শুধু পানি আর পানি।
স্থানীয়দের অভিযোগ, বছরের পর বছর কোটি কোটি টাকা ব্যয়ে ড্রেন নির্মাণ ও রাস্তা উন্নয়ন করা হলেও সামান্য বৃষ্টিতেই শহর পানিতে ডুবে যায়। তাদের দাবি, ড্রেনগুলোর অধিকাংশই ময়লা-আবর্জনায় বন্ধ বা অকার্যকর অবস্থায় রয়েছে। অনেক জায়গায় ড্রেনের স্ল্যাব ভেঙে পড়েছে, আবার কোথাও পানিপ্রবাহের স্বাভাবিক পথই নেই।
এছাড়া ময়ূর নদসহ নগরীর ২২টি খাল দখল ও ভরাট হয়ে যাওয়ায় পানি নিষ্কাশনের স্বাভাবিক ব্যবস্থা ভেঙে পড়েছে বলে অভিযোগ স্থানীয়দের।
নগরীর মুজগুনি মহাসড়কে দেখা যায়, টানা বৃষ্টিতে পুরো সড়ক পানির নিচে তলিয়ে গেছে। কোথাও হাঁটুসমান, কোথাও কোমরসমান পানি জমে যানবাহন চলাচল প্রায় বন্ধ হয়ে যায়। একাধিক ইজিবাইক ও অটোরিকশা পানিতে বিকল হয়ে পড়ে থাকতে দেখা যায়।
চালকরা জানান, ব্যাটারি ও ইঞ্জিনে পানি ঢুকে যাওয়ায় গাড়ি বন্ধ হয়ে যাচ্ছে। ফলে প্রতিবারই বড় ধরনের ক্ষতির মুখে পড়তে হচ্ছে তাদের।
মুজগুনি মহাসড়কের ড্রেনগুলোতেও দেখা যায় বিপরীত চিত্র পানি নামার বদলে ড্রেন উপচে সড়কে উঠে আসছে। স্থানীয়দের ভাষ্য, অপরিকল্পিত ড্রেনেজ ব্যবস্থাই এই জলাবদ্ধতার প্রধান কারণ।
মিস্ত্রিপাড়া বাসিন্দা হাফিজ ক্ষোভ প্রকাশ করে বলেন, প্রতি বছর একই নাটক। কোটি কোটি টাকা খরচ হয়, কিন্তু বৃষ্টি নামলেই শহর ডুবে যায়।
দৌলতপুরের ব্যবসায়ী হাফিজুর বলেন, খাল খননের কথা বারবার শোনা গেলেও বাস্তবে পানি চলাচলের মতো পরিস্থিতি তৈরি হয়নি।
খুলনা সিটি করপোরেশনের তথ্য অনুযায়ী, গত পাঁচ বছরে শুধু খাল খনন ও সংস্কারে প্রায় ৪৮ কোটি টাকা ব্যয় হয়েছে। তবে পরিবেশবিদদের প্রশ্নÑ এত অর্থ ব্যয়ের পরও কেন জলাবদ্ধতা কমছে না?
বাংলাদেশ পরিবেশ আন্দোলন (বাপা) খুলনার জেলা সমন্বয়কারী অ্যাডভোকেট বাবুল হাওলাদার বলেন, খাল পুনরুদ্ধারে বিচ্ছিন্ন উদ্যোগ নয়, প্রয়োজন সমন্বিত ও দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা। দখল ও দূষণের বিরুদ্ধে কার্যকর ব্যবস্থা না নিলে ভবিষ্যতে জলাবদ্ধতা আরও ভয়াবহ হবে।
খুলনা সিটি করপোরেশনের প্রশাসক নজরুল ইসলাম মঞ্জু বলেন, আগে নগরীর পানি রূপসা নদীতে নেমে যেত। কিন্তু অপরিকল্পিত ড্রেনেজ ব্যবস্থা, রূপসার পাম্প হাউস বন্ধ থাকা, অকেজো স্লুইসগেট এবং অসম্পূর্ণ ড্রেন কাজের কারণে পানি নিষ্কাশন ব্যাহত হচ্ছে।
তিনি বলেন, ড্রেনের বেড উঁচু করে ফেলায় অনেক বাড়ি নিচু হয়ে গেছে। ফলে সামান্য বৃষ্টিতেই পানি ঘরে ঢুকে পড়ছে।
কেসিসি প্রশাসক নজরুল ইসলাম মঞ্জু ইতোমধ্যে জলাবদ্ধতাপ্রবণ এলাকা ও খাল পরিদর্শন করে দ্রুত পদক্ষেপ নেওয়ার নির্দেশ দিয়েছেন। গত বৃহস্পতিবার লবণচরা, মুজগুন্নী-খানজাহান আলী, দৌলতপুরসহ বিভিন্ন এলাকায় রাস্তা, বর্জ্য ব্যবস্থাপনা ও ড্রেনেজ পরিস্থিতি পরিদর্শন করেছেন।