সাইদ সাজু, তানোর (রাজশাহী)
প্রকাশ : ৩ ঘণ্টা আগে
আপডেট : ৩ ঘণ্টা আগে
তানোর উপজেলার বাধাইড় ইউপির ভান্ডাইল আশ্রয়ণ গুচ্ছ গ্রামে আশ্রয়ণ প্রকল্প। প্রবা ফটো
রাজশাহীর তানোর উপজেলায় ৫০ ভূমিহীন পেয়েছিলেন আশ্রয়ণ প্রকল্পের ৫০টি টিনের ঘর। সরকার জমির দলিলসহ ঘরগুলো তাদের বুঝিয়ে দেয়। কিন্তু পরবর্তী সময়ে ওই টিনের ঘরগুলো ভেঙে, সেখানে ৪৩টি পাকা ঘর বানানো হয়। তবে এই পাকা ঘরের বরাদ্দ নিয়ে সীমাহীন দুর্নীতি করা হয়েছে।
পাকা ঘর বানানোর পর যাদের বরাদ্দ দেওয়া হয়েছে, তাদের বেশিরভাগ প্রথম পর্যায়ে বরাদ্দ পাননি। এই অনিয়ম, দুর্নীতি ও স্বজনপ্রীতির ঘটনায় ভুক্তভোগীরা সরকারের কাছে দাবি তুলেছেন তদন্ত করে সঠিক ব্যবস্থা নেওয়ার।
উপজেলার বাধাইড় ইউপির ভান্ডাইল আশ্রয়ণ গুচ্ছ গ্রামে আশ্রয়ণ প্রকল্প এলাকায় গিয়ে ভুক্তভোগীদের সঙ্গে কথা হয়। এখানে ৪ দশমিক ১১ একর আয়তনের একটি পুকুর পাড়ে প্রায় ৩৮ বিঘা সরকারি খাস জমিতে ২০০৭ সালে আশ্রায়ণ প্রকল্পটি গড়ে তোলা হয়। প্রকল্পের ৫০টি টিনের ঘর তৈরি করে তা স্থানীয় ভূমিহীনদের মধ্যে দলিল করে বরাদ্দ দেওয়া হয়।
ঘর পাওয়ার তাতে ভূমিহীন ৫০টি পরিবার বসবাস শুরু করে এবং তারা মিলে গঠন করে একটি সমিতি। এই পরিবারগুলোকে আয়ের উৎস হিসেবে ওই পুকুরটিও সরকার বুঝিয়ে দেয়। কিন্তু ২০২২ সালে আশ্রয়ণের ৫০টি টিনের ঘরে ভেঙে সেখানে ৪৩টি পাকা ঘর বানানো হয়। এগুলোর মধ্যে ৩৯টি বরাদ্দ দেওয়া হলেও ৪টি ঘর বরাদ্দ দেওয়া হয়নি।
৩৯টি ঘর বরাদ্দ নিয়ে নিয়ম-কানুনকে বৃদ্ধাঙুলি দেখানো হয়েছে। এ ব্যাপারে স্থানীয় প্রশাসনও নীরব ছিল বলেও অভিযোগ উঠেছে। প্রথম ধাপে আশ্রায়ণের ৫০টি টিনের ঘর যারা দলিলসহ বুঝে পেয়েছিলেন, তাদের অনেকে দ্বিতীয় ধাপে বানানো ৪৩টি পাকা ঘর থেকে বাদ পড়েছেন। এতে ভুক্তভোগীরা ন্যায়বিচার চেয়ে ক্ষোভ জানিয়েছেন। তারা বলেন, যারা আশ্রায়ণের টিনের ঘরে বাস করেছেন, তাদের বেশিরভাগকে বাদ দিয়ে নতুনভাবে তালিকা করে পাকা ঘর বরাদ্দ দেওয়া হয়েছে। এই বরাদ্দে আশ্রায়ণের ভূমিহীনদের নিয়ে যে সমিতি আছে, তার সভাপতি আতিকুল ইসলামের আত্মীয়-স্বজনের নামে অনেকগুলো পাকা ঘর বরাদ্দ দেওয়া হয়েছে।
আশ্রয়ণের টিনের ঘরে প্রায় ১৫ বছর ধরে বসবাস করেও পাকা ঘর বরাদ্দ পাননি সোনাভান। ক্ষোভ জানিয়ে বলেন, আশ্রয়ণ প্রকল্পের সভাপতি আতিকুল ইসলামের নিজের বাড়ি থাকার পরও তার স্ত্রী, ছেলে হৃদয়, দুই ভাই শফিকুল ও জহুরুল ইসালাম এবং বউয়ের দুই ভাই, মামাতো ভাই ও খালাতো ভাই মিলে তার প্রায় ২০ জন আত্মীয়ের নামে পাকা ঘর বরাদ্দ দেওয়া হয়েছে। কিন্তু আমাকে ঘর দেওয়া হয়নি। পুরনো ঘর ভেঙে নতুন ঘর নির্মাণ হওয়ায় তিনি অন্যের জমিতে ঝুপড়ি ঘর বানিয়ে বাস করছেন।
মৃত জিল্লুর রহমানের স্ত্রী মরিজান বেওয়া বলেন, আমার নামেও আশ্রয়ণের ঘরের দলিল আছে। কিন্তু পাকা ঘরের বরাদ্দ পাইনি। অতি কষ্টে আমিও ঝুপড়ি ঘরে বাস করছি। টিনের ঘরে বসবাস করা মেছের আলী বলেন, আমি পাকা ঘর পাইনি। তাই রাস্তার ধারে ঝুপড়ি ঘরে বাস করছি। নতুন ঘর বরাদ্দে ব্যাপক অনিয়ম হয়েছে।
এদিকে ভুক্তভোগীরা জানানÑ আশ্রয়ণের বিশাল পুকুরটি নিয়ন্ত্রণ করতেই আতিকুল ইসলাম সভাপতি হয়েছেন। তিনি পুকুরের আয় নিয়ে নয়ছয় করছেন। আয়ের পুরো টাকাই তিনি মেরে দিচ্ছেন। পুকুরের আয়-ব্যয়ের হিসাব চাওয়ায় তাদের বাদ দিয়েছেন। ভুক্তভোগীরা বলেন, এসব অনিয়ম দূর করার জন্য আমরা প্রশাসনের দ্বারে দ্বারে ঘুরেছি। কিন্তু কোনো সুরাহা পাইনি। সুষ্ঠু তদন্ত করে আইনি ব্যবস্থা নেওয়া হোক।
এ ব্যাপারে আতিকুল ইসলাম বলেন, আমার বাড়ি আছে সত্যি। তবে সেটা সরকারি খাস জমিতে। সরকার যদি সেটি ভেঙে দেয়, তাহলে কোথায় যাব? তাই তিনি পাকা ঘর নিয়েছেন। তিনি আরও জানান, আশ্রায়ণের ৩৯টি পরিবার মিলে পুকুরে মাছ চাষ করছেন। তেমন কোনো লাভ হয় না। পাকা ঘর তার অনেক আত্মীয়-স্বজন বরাদ্দ পেয়েছে। এ ব্যাপারে তিনি বলেন, আশ্রায়ণ প্রকল্পের শুরু থেকেই, টিনের ঘর থাকা অবস্থা থেকেই আমি সমিতির সভাপতি। পাকা ঘর বানানোর সময় আমি নামের তালিকা দিয়েছি। বরাদ্দ দিয়েছে প্রশাসন। এখানে আমার কী করার আছে।
এ ব্যাপারে তানোর ইউএনও নাঈমা খান বলেন, যাদের আগে ঘরসহ দলিল আছে, তাদের নতুন পাকা ঘর পাওয়ার কথা। না পেলে তাদের সঙ্গে বেআইনি কাজ করা হয়েছে। এ ব্যাপারে সঠিক তদন্ত করে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেব।