মধ্যাঞ্চলীয় অফিস
প্রকাশ : ২ ঘণ্টা আগে
ভৈরবে দুই পক্ষের সংঘর্ষে মহাসড়ক অচল । প্রবা ফটো
কিশোরগঞ্জের ভৈরব উপজেলায় একটি মাইক্রোবাসের ভাড়া নিয়ে সৃষ্ট তুচ্ছ বিরোধ শেষ পর্যন্ত ভয়াবহ সংঘর্ষে রূপ নিয়েছে। দুই পক্ষের শত শত যুবক দেশীয় অস্ত্র নিয়ে মুখোমুখি সংঘর্ষে জড়িয়ে পড়লে পুরো এলাকা রণক্ষেত্রে পরিণত হয়।
সংঘর্ষের জেরে দেশের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ সড়কপথ ঢাকা-সিলেট মহাসড়ক প্রায় সাড়ে চার ঘণ্টা সম্পূর্ণ অচল হয়ে পড়ে। এতে হাজারো যাত্রী চরম দুর্ভোগে পড়েন।
ভৈরব পৌর শহরের কমলপুর ও দুর্জয়মোড় এলাকার যুবকদের মধ্যে গত বুধবার
(১০ জুন) রাত সাড়ে ৭টার দিকে এ সংঘর্ষ শুরু হয়। রাত গভীর হওয়া পর্যন্ত চলা এ সংঘর্ষে
ভৈরব থানার অফিসার ইনচার্জ (ওসি) আতাউর রহমান আকন্দ, এক পুলিশ সদস্যসহ অন্তত অর্ধশতাধিক
আহত হয়েছেন। আহতদের মধ্যে কয়েকজনের অবস্থা গুরুতর হওয়ায় উন্নত চিকিৎসার জন্য ঢাকায়
পাঠানো হয়েছে।
পুলিশ, প্রত্যক্ষদর্শী ও স্থানীয় সূত্র জানায়, গত ৭ জুন ভৈরব বাসস্ট্যান্ড
এলাকার কমলপুর মাইক্রোস্ট্যান্ডে ভাড়া নিয়ে কমলপুর এলাকার মাইক্রোচালক আরমানের সঙ্গে
দুর্জয়মোড় এলাকার কয়েকজন যুবকের মধ্যে বাকবিতণ্ডা হয়। একপর্যায়ে তা হাতাহাতিতে গড়ায়।
পরে স্থানীয়ভাবে বিষয়টি মীমাংসার চেষ্টা করা হলেও উভয়পক্ষের মধ্যে ক্ষোভ ও উত্তেজনা
থেকেই যায়।
স্থানীয়রা জানান, ঘটনার পর কয়েকদিন ধরে দুই পক্ষের মধ্যে চাপা উত্তেজনা
বিরাজ করছিল। সালিস বৈঠকেও উভয়পক্ষের মধ্যে উত্তপ্ত বাক্যবিনিময় হয়। এর জের ধরে বুধবার
বিকাল থেকে আবারও উত্তেজনা বাড়তে থাকে।
অভিযোগ রয়েছে, বিকেলের দিকে দুর্জয়মোড় এলাকার একদল যুবক কমলপুর
মাইক্রোস্ট্যান্ড ও আশপাশের কয়েকটি দোকানে হামলা চালায়। এতে ব্যবসায়ীদের মধ্যে আতঙ্ক
ছড়িয়ে পড়ে। অনেক দোকানদার দোকানপাট বন্ধ করে নিরাপদ স্থানে আশ্রয় নেন।
পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনতে স্থানীয় জনপ্রতিনিধি ও গণ্যমান্য ব্যক্তিরা
কয়েক দফা বৈঠক করলেও কোনো সমাধান হয়নি। বরং রাত বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে উত্তেজনা আরও বৃদ্ধি
পায়। রাত সাড়ে ৭টার দিকে দুই পক্ষ দা, বল্লম, রামদা, লোহার রড, লাঠিসোঁটা ও ইটপাটকেল
নিয়ে মুখোমুখি সংঘর্ষে জড়িয়ে পড়ে। সংঘর্ষের সময় একাধিকবার ধাওয়া-পাল্টা ধাওয়া হয়। মুহূর্তেই
পুরো এলাকা আতঙ্কে স্তব্ধ হয়ে যায়। সংঘর্ষ চলাকালে কমলপুর, দুর্জয়মোড় ও বাসস্ট্যান্ড
এলাকার বিভিন্ন ব্যবসা প্রতিষ্ঠানে ভাঙচুর চালানো হয়। কয়েকটি দোকানে লুটপাটের অভিযোগও
পাওয়া গেছে। ব্যবসায়ীরা জানান, জীবন বাঁচাতে তারা দোকান ছেড়ে পালিয়ে যান। পরে ফিরে
এসে ভাঙচুর ও ক্ষয়ক্ষতির চিত্র দেখতে পান।
দোকান মালিক শাহ আলম মিয়া বলেন, আমরা ব্যবসা করি, কোনো পক্ষের সঙ্গে
আমাদের সম্পর্ক নেই। তারপরও আমাদের দোকান ভাঙচুর করা হয়েছে। আমরা এর সুষ্ঠু বিচার চাই।
সংঘর্ষের একপর্যায়ে উভয়পক্ষ ঢাকা-সিলেট মহাসড়কে অবস্থান নেয়। ফলে দেশের ব্যস্ততম এ
মহাসড়কে যান চলাচল সম্পূর্ণ বন্ধ হয়ে যায়। মহাসড়কের দুই পাশে কয়েক কিলোমিটার দীর্ঘ
যানজটের সৃষ্টি হয়। শত শত বাস, ট্রাক, কাভার্ড ভ্যান ও ব্যক্তিগত গাড়ি আটকা পড়ে।
বাসচালক রবিন মিয়া বলেন, কাপড়ের হাট শেষে ব্যবসায়ীদের নিয়ে ফিরছিলাম।
সংঘর্ষকারীরা আমার বাসে হামলা চালিয়ে ভাঙচুর করে এবং আগুন ধরিয়ে দেয়। স্থানীয়দের সহায়তায়
আগুন নিয়ন্ত্রণে আনতে পেরেছি।
পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনতে প্রথমে ভৈরব থানা পুলিশ চেষ্টা চালালেও
ব্যর্থ হয়। পরে অতিরিক্ত পুলিশ, জেলা পুলিশের বিশেষ টিম ও ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তারা ঘটনাস্থলে
পৌঁছান। সংঘর্ষ থামাতে পুলিশকে ১৫ রাউন্ড টিয়ারশেল নিক্ষেপ করতে হয়। এ সময় টিয়ারশেলের
আঘাতে পৌর শ্রমিক দলের সভাপতি মো. সিয়াম মিয়া আহত হন। পরে তাকে ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে
পাঠানো হয়।সংঘর্ষে আহতদের মধ্যে তানভির ও নাইম নামে দুইজনকে গুরুতর অবস্থায় ঢাকা মেডিকেল
কলেজ হাসপাতালে পাঠানো হয়েছে। উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে অন্তত ১৫ জন চিকিৎসা নিয়েছেন।
এছাড়া অনেকেই স্থানীয় বিভিন্ন ক্লিনিক ও হাসপাতালে চিকিৎসা নিয়েছেন।
পুলিশ জানায়, বর্তমানে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে থাকলেও এলাকায় থমথমে
অবস্থা বিরাজ করছে। নতুন করে সংঘর্ষ এড়াতে অতিরিক্ত পুলিশ মোতায়েন করা হয়েছে এবং গুরুত্বপূর্ণ
স্থানে টহল জোরদার করা হয়েছে।
ঘটনার খবর পেয়ে কিশোরগঞ্জ জেলা পুলিশ সুপার মোহাম্মদ মিজানুর রহমান
শেলী ঘটনাস্থলে উপস্থিত হয়ে সার্বিক পরিস্থিতি তদারকি করেন। পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনতে
গিয়ে ভৈরব থানার ওসি ও এক পুলিশ সদস্য আহত হয়েছেন। এখন পর্যন্ত কাউকে গ্রেপ্তার করা
হয়নি। তবে জড়িতদের শনাক্ত করে দ্রুত আইনের আওতায় আনা হবে।