অরিত্র কুণ্ডু, ঝিনাইদহ
প্রকাশ : ২ ঘণ্টা আগে
আপডেট : ২ ঘণ্টা আগে
প্রতীকী ছবি/ ছবিটি এআই দিয়ে তৈরি
দেশের দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলের জেলা ঝিনাইদহে মাদকবিরোধী অভিযান জোরদার হলেও থামছে না কারবারিদের তৎপরতা। বরং সময়ের সঙ্গে সঙ্গে তারা নিজেদের কৌশল বদল করে আরো সক্রিয় হয়ে উঠছে। নিত্যনতুন কৌশলে সীমান্তের মাদক সারা দেশে ছড়িয়ে দিচ্ছে কারবারিরা। নতুন নতুন কৌশলে মাদক সরবরাহ ও বিক্রির কারণে অনেক সময় অসহায় হয়ে পড়ছে প্রশাসন।
স্থানীয়রা জানায়, ঝিনাইদহের মহেশপুর উপজেলায় ৭৬ কিলোমিটার ভারতীয় সীমান্ত রয়েছে, যার মধ্যে ১২ কিলোমিটারে কাঁটাতারের বেড়া নেই। অধিকাংশ এলাকায় কাঁটাতারের বেড়া থাকলেও চোরাচালান থেমে নেই। বিভিন্ন কৌশলে কাঁটাতারের বেড়া ভেদ করে রাতের আঁধারে ভারত থেকে পাচার হয়ে আসছে ফেনসিডিল, উইনকেরেক্স, গাঁজা, ইয়াবা, ট্যাপেন্টাডালসহ বিভিন্ন ধরনের মাদক। ভারত থেকে আনা মাদক প্রথমে সীমান্তঘেঁষা গ্রামের আস্তানায় রাখা হয়। এরপর সুযোগ বুঝে ছড়িয়ে দেওয়া সারা দেশে। সন্ধ্যা হলে সীমান্তের গ্রামগুলোতে বহিরাগত মাদকসেবীদের আনাগোনা বেড়ে যায়। চায়ের দোকানে, বিভিন্ন সড়কের মোড়ে মোড়ে ছদ্মবেশে বিক্রি হচ্ছে মাদক। এসব কারবার নিয়ন্ত্রণ করেন চিহ্নিত কিছু কারবারি । তাদের সঙ্গে স্থানীয় জনপ্রতিনিধি ও রাজনৈতিক দলের নেতা-কর্মীদেরও ঘনিষ্ঠতা রয়েছে বলে অভিযোগ আছে।
স্থানীয়রা আরো জানায়, মহেশপুর উপজেলার বেশ কিছু পয়েন্ট হয়ে উঠেছে মাদক পাচারের নিরাপদ রুট, যেখান দিয়ে ভারতীয় মাদক ঢুকে পড়ে বাংলাদেশে। সম্প্রতি সীমান্ত এলাকায় বিজিবি অভিযান বাড়লেও বন্ধ হয়নি মাদক আনা-নেওয়া। প্রশাসনের কঠোর অবস্থানের পরেও টিকে আছে শক্তিশালী মাদক নেটওয়ার্ক।
অনুসন্ধানে দেখা গেছে, ভারতীয় সীমান্তবর্তী কুসুমপুর এলাকায় মনসুর আলী, পেপুলবাড়িয়া এলাকায় সুমন মিয়া ও রতন মিয়া, শ্যামকুড় এলাকায় কালা বশির ও মমিনুর, লড়াইঘাট এলাকায় শাহজাহান আলী, শ্রীনাথপুর এলাকায় হুকুম আলী এবং বাঘাডাঙ্গা এলাকায় মাজেদুল ইসলাম বর্তমানে মাদক চোরাচালান করছেন। তারা বিজিবির কিছু অসাধু সদস্যের যোগসাজশে সীমান্তের ওপার থেকে মাদক এনে মজুত করেন। পরে সড়কপথে দেশের বিভিন্ন প্রান্তে পাঠিয়ে দেন।
এসব বিষয়ে জানতে অভিযুক্তদের সঙ্গে যোগাযোগ করলে তারা কোনো মন্তব্য করতে রাজি হননি।
সংশ্লিষ্ট সূত্র জানিয়েছে, ঝিনাইদহের মহেশপুর সীমান্তে দফায় দফায় বিজিবির অভিযান, মালিকবিহীন বিভিন্ন ধরনের মাদক জব্দ, একের পর এক মামলা করেও কমছে না মাদকের বিস্তার। প্রশাসনের কঠোর পদক্ষেপ, আইনশৃঙ্খলা রক্ষা বাহিনীর রাতভর অভিযান; সবই ব্যর্থ হয়ে পড়ছে প্রভাবশালী মাদক চক্রের কাছে। মহেশপুর উপজেলার সীমান্তঘেঁষা গ্রামগুলো যেন এক অদৃশ্য অন্ধকারে আটকে গেছে। প্রতিনিয়ত কৌশল বদলে বিক্রি হচ্ছে মাদক, কখনো সবজির গাড়ি, আবার কখনো জরুরি সেবায় নিয়োজিত গাড়িতে সড়কপথে মাদক পৌঁছে দিচ্ছে বিভিন্ন এলাকায়।
জেলা সচেতন নাগরকি সমাজের প্রতিনিধি আনোয়ারুজ্জামান আজাদ বলেন, “অনেককে দেখেছি, মাদক ব্যবসা ছেড়ে ভালো হতে প্রশাসনের হাতে ফুল দিয়ে শপথ করেছেন। তারা কিছু দিন ভালো থাকলেও পরে আবারও আগের পেশায় ফিরে গেছেন। আবার অনেকে মাদকের মামলায় কারাগার থেকে বেড়িয়ে পুনরায় দ্বিগুণ গতিতে মাদক কারবারে ঝুঁকে পড়ছেন। কারণ মামলা হলে তার খরচ রয়েছে, যার অর্থ জোগান দিতেও অনেকেই পেশা বদল করছেন না। যারা মাদক মামলায় গ্রেপ্তার হচ্ছেন, তারা যেন সাজাভোগ ছাড়া কোনোভাবে আইনের ফাঁকফোকর দিয়ে বেড়িয়ে না যায়, সেটাও নিশ্চিত করতে হবে। তাই মাদক নিয়ন্ত্রণ করতে আইনের যথার্থ প্রয়োগ করতে হবে”।
মহেশপুর ৫৮ বিজিবির অধিনায়ক লেফটেন্যান্ট কর্নেল রফিকুল ইসলাম বলেন, “সীমান্তে প্রতিনিয়ত অভিযান চালিয়ে বিভিন্ন ধরনের মাদকদ্রব্য উদ্ধার করা হচ্ছে। এ ছাড়া গোয়েন্দা তৎপরতা বাড়ানো হয়েছে”।
জেলা মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ অধিদপ্তরের উপপরিচালক শেখ মো. হাশেম আলী বলেন, “আমরা নিয়মিত অভিযান চালাচ্ছি। তবে কারবারিরা যেভাবে কৌশল পরিবর্তন করছে, তাতে প্রতিনিয়ত আমাদের নতুনভাবে প্রস্তুতি নিতে হচ্ছে। সীমান্তবর্তী জেলা হিসেবে মাদকের প্রাদুর্ভাব কিছুটা বাড়লেও আমরা নতুন কৌশলে দফায় দফায় অভিযান পরিচালনা করছি। ফলে মাদকের কারবার কিছুটা কমতে শুরু করেছে”।
তিনি বলেন, “মাদকের সঙ্গে কোনো আপস নয়। মাদক নির্মূল করার লক্ষ্য নিয়ে দিন-রাত আমাদের অভিযান অব্যাহত রয়েছে”।