এক হাজার লিচু পেড়ে একশ করে বোঝা বেঁধে কার্টুনে ভরে ট্রাকে তুলে দেওয়া পর্যন্ত মজুরি পাওয়া যায় জনপ্রতি ২৫০ টাকা। ছবি: প্রতিদিনের বাংলাদেশ
দিনাজপুরের ফুলবাড়ীতে মৌসুমি লিচু শ্রমিক হিসেবে কাজ করে নিজেদের লেখাপড়ার খরচ জোগান দিচ্ছেন অর্ধশতাধিক শিক্ষার্থী। লিচু মৌসুম এলেই তারা বই-খাতা সাময়িকভাবে সরিয়ে রেখে বাগানে লিচু পাড়া, গণনা করা, থোকা বাঁধা এবং কার্টনে ভরে ট্রাকে তুলে দেওয়ার কাজে ব্যস্ত হয়ে পড়ে।
উপজেলার বিভিন্ন লিচু বাগানে সরেজমিনে দেখা যায়, শিক্ষার্থীরা দলবদ্ধভাবে লিচু সংগ্রহ ও বাজারজাতকরণের কাজে অংশ নিচ্ছেন। উপজেলার কয়রাকোল গ্রামের এইচএসসি শিক্ষার্থী সুকদেব চন্দ্র রায়, ভদ্র চন্দ্র রায়, সৌরভ চন্দ্র, দীপ্ত রায় ও গণেশ চন্দ্র রায়সহ প্রায় ২৫ জন শিক্ষার্থী একটি দলে কাজ করছেন।
তারা জানান, অষ্টম শ্রেণি থেকেই তারা লিচু মৌসুমে এ কাজে যুক্ত। প্রতি বছর প্রায় ১৫ দিন ফুলবাড়ী, চিরিরবন্দর, হাকিমপুর হিলি ও পার্শ্ববর্তী এলাকার লিচু বাগানে কাজ করেন। সাধারণত ২০ থেকে ২৫ জনের দল গঠন করে তারা শ্রম দেন। এক হাজার লিচু পেড়ে, ১০০টি করে থোকা বেঁধে কার্টনে ভরে ট্রাকে তুলে দেওয়া পর্যন্ত মজুরি পাওয়া যায় ২৫০ টাকা। এতে একজন শ্রমিক প্রতিদিন ৫০০ থেকে ৭০০ টাকা পর্যন্ত আয় করেন। মৌসুম শেষে জনপ্রতি আয় দাঁড়ায় প্রায় ১৫ থেকে ১৭ হাজার টাকা।
সুকদেব চন্দ্র রায় ও ভদ্র চন্দ্র রায় জানান, তারা যখন অষ্টম শ্রেণিতে লেখাপড়া করতেন, সে সময় থেকে গ্রামের অন্যদের সঙ্গে উপজেলার বিভিন্ন বাগানের লিচু পাড়ার কাজ করছেন। তখন থেকেই প্রতি বছর লিচু মৌসুমে তারা ১৫ দিন তাদের লেখাপড়ার কাজ বন্ধ রেখে ফুলবাড়ী, চিরিরবন্দর, হাকিমপুর হিলি, পাবনাসহ বিভিন্ন এলাকার বাগানের লিচু পাড়ার কাজ করেন।
২০ থেকে ২৫ জন মিলে এক-একটি দল। দল হিসেবে গাছ থেকে এক হাজার লিচু পেড়ে একশ করে বোঝা বেঁধে কার্টুনে ভরে ট্রাকে তুলে দেওয়া পর্যন্ত মজুরি পাওয়া যায় জনপ্রতি ২৫০ টাকা। এতে করে দিনে ৫০০ থেকে ৭০০ টাকা আয় হয় একেক জনের। মৌসুমে জনপ্রতি সর্বসাকুল্যে ১৫ থেকে ১৭ হাজার টাকা আয় হয় তাদের।
সেই আয়ের টাকা দিয়ে তারা তাদের নিজেদের লেখাপড়া ও পোশাকের খরচ জোগান দেওয়াসহ মা-বাবাকেও সাহায্য করেন তারা।
একই দলের অনুপ চন্দ্র রায় ও তপন কুমার জানান, আর্থিক সংকটের কারণে তারা লেখাপড়া চালিয়ে যেতে পারেননি। তাই লিচু মৌসুমে লিচু পাড়া এবং পরে আমের মৌসুমে আম সংগ্রহের কাজে যুক্ত হন। বছরের অন্যান্য সময়ে দিনমজুর হিসেবে কাজ করে জীবিকা নির্বাহ করেন।
লিচু বাগান মালিক সুবাস চন্দ্র রায় বলেন, “তার চারটি বাগানে প্রায় ৪০০টি বেদানা, চায়না-১, চায়না-২, চায়না-৩ ও বোম্বাই জাতের লিচুগাছ রয়েছে। অনুকূল আবহাওয়ার কারণে এ বছর ফলন ভালো হয়েছে এবং বাজারদরও সন্তোষজনক। বাগান থেকেই ঢাকাসহ দেশের বিভিন্ন অঞ্চলের পাইকাররা লিচু কিনে নিয়ে যাচ্ছেন। বিক্রির চাপ বাড়ায় শ্রমিকদের সকাল থেকে সন্ধ্যা পর্যন্ত কাজ করতে হচ্ছে”।
অন্য বাগান মালিকরাও জানান, বর্তমানে ফুলবাড়ীতে উৎপাদিত লিচু স্থানীয় চাহিদা মিটিয়ে রাজধানী ঢাকাসহ দেশের বিভিন্ন স্থানে সরবরাহ করা হচ্ছে। তরুণ শ্রমিকদের কর্মদক্ষতার কারণে দ্রুত লিচু সংগ্রহ ও সরবরাহ সম্ভব হচ্ছে।
উপজেলা কৃষি কর্মকর্তা কৃষিবিদ সাইফ আব্দুল্লাহ মোস্তাফিন জানান, পৌর এলাকাসহ উপজেলার সাত ইউনিয়নে মোট ৬৮ হেক্টর জমিতে লিচুর বাগান রয়েছে। প্রতি হেক্টরে সাড়ে ৪ দশমিক ৭১ মেট্রিক টন উৎপাদনের লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করা হলেও চলতি মৌসুমে লক্ষ্যমাত্রার চেয়েও বেশি লিচু উৎপাদিত হয়েছে।