মো. পলাশ ইসলাম, ধনবাড়ী (টাঙ্গাইল)
প্রকাশ : ২ ঘণ্টা আগে
আপডেট : ২ ঘণ্টা আগে
টাঙ্গাইলের বৈরান নদীর ওপর সেতুটি অচল হয়ে যাওয়ায় বাঁশের সাঁকো দিয়েই পাড় হতে হচ্ছে শিক্ষার্থীসহ স্থানীয়েদের। ছবি: প্রতিদিনের বাংলাদেশ
টাঙ্গাইলের ধনবাড়ী উপজেলার পাইস্কা ইউনিয়নের ভাতকুড়া গ্রামের বৈরান নদীর ওপর নির্মিত একটি সেতু প্রায় ছয় বছর পূর্বে নদীতে ধসে পড়ে।
ফলে উপজেলার পশ্চিমাঞ্চলের প্রায় ২০ থেকে ২৫টি গ্রামের মানুষের সঙ্গে উপজেলা সদরের সরাসরি যোগাযোগ কার্যত বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়েছে।
সেতুটি অচল হয়ে যাওয়ায় প্রতিদিন শিক্ষার্থী, কৃষক, ব্যবসায়ী, চাকরিজীবীসহ হাজারো মানুষকে অতিরিক্ত পথ ঘুরে যাতায়াত করতে হচ্ছে। এতে যেমন সময় ও অর্থের অপচয় হচ্ছে, তেমনি বাড়ছে নিত্যদিনের ভোগান্তিও।
স্থানীয়দের অভিযোগ, নির্মাণকাজে নিম্নমানের সামগ্রী ব্যবহারের পাশাপাশি সেতুর গোড়ালি থেকে অবৈধভাবে বালু উত্তোলনের কারণেই অল্প সময়ের মধ্যেই এটি ধসে পড়ে। বিষয়টি নিয়ে বারবার সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ ও জনপ্রতিনিধিদের অবহিত করা হলেও কার্যকর কোনো উদ্যোগ নেওয়া হয়নি। ফলে বছরের পর বছর ধরে চরম দুর্ভোগ পোহাতে হচ্ছে এলাকাবাসীকে।
জানা গেছে, ২০১৩-১৪ অর্থবছরে এশীয় উন্নয়ন ব্যাংকের (এডিবি) অর্থায়নে বৈরান নদীর ওপর সেতুটি নির্মাণ করে স্থানীয় সরকার প্রকৌশল অধিদপ্তর (এলজিইডি)। ২০১৮ সালে নির্মাণকাজ শেষ হয়। তবে সেতু চালুর মাত্র দেড় থেকে দুই বছরের মধ্যেই এর সংযোগ সড়ক ও গাইড বাঁধে ক্ষয় দেখা দিতে শুরু করে।
স্থানীয়দের দাবি, নির্মাণে অনিয়ম ও নিম্নমানের সামগ্রী ব্যবহারের পাশাপাশি প্রভাবশালী একটি মহল অবৈধ ড্রেজিংয়ের মাধ্যমে সেতুর গোড়ালি থেকে বালু উত্তোলন করায় এর ভিত্তি দুর্বল হয়ে পড়ে। পরবর্তীতে বন্যার তীব্র স্রোতে মাঝখানের পিলার সরে যায় এবং একপর্যায়ে পুরো সেতুটি ধসে নদীতে পড়ে যায়।
সরেজমিনে বুধবার দেখা যায়, ভাতকুড়া গ্রামের মাঝ দিয়ে প্রবাহিত বৈরান নদীর বুকে এখনও পড়ে আছে ভাঙা সেতুর ধ্বংসাবশেষ। নদীতে কচুরিপানা জমে রয়েছে। কোথাও কোথাও কোমরসমান পানি থাকলেও নদী পারাপারের জন্য কোনো বিকল্প ব্যবস্থা নেই। স্থায়ী সেতুর অভাবে জীবনের ঝুঁকি নিয়ে বাঁশের সাঁকো, নৌকা কিংবা অস্থায়ী উপায়ে পারাপার করতে হচ্ছে সাধারণ মানুষকে। বর্ষা মৌসুমে এ দুর্ভোগ আরও ভয়াবহ রূপ নেয়।
এলাকাবাসী জানান, ভাতকুড়া, মুশুদ্দি, চরপাড়া, বেলতলা, দ্ররিচনবাড়ী, বুধপাড়া, ডয়ালের রব, ববানীপুর, সরিষাবাড়ী, কাশবনসহ আশপাশের ২৫ গ্রামের মানুষ একসময় এই সেতুর ওপর নির্ভরশীল ছিল।
তারা বলেন, সেতুটি সচল থাকাকালে মাত্র ১০ মিনিটে উপজেলা সদরে পৌঁছানো যেত। বর্তমানে বিকল্প সড়ক ব্যবহার করে প্রায় পাঁচ কিলোমিটার অতিরিক্ত পথ পাড়ি দিতে হচ্ছে। এতে কৃষিপণ্য বাজারজাতকরণ, শিক্ষার্থীদের বিদ্যালয়ে যাতায়াত এবং জরুরি রোগী পরিবহনে ব্যাপক সমস্যা সৃষ্টি হচ্ছে।
স্থানীয় কৃষক মো. বাদশা মিয়া বলেন, “সেতুটি আমাদের জীবনের অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ যোগাযোগ মাধ্যম ছিল। এটি ভেঙে যাওয়ার পর থেকে আমরা চরম কষ্টে আছি। উপজেলা সদরে যেতে এখন অনেক দূর ঘুরতে হয়। এতে সময় ও অর্থ দুটোই বেশি ব্যয় হয়। শিক্ষার্থী ও বয়স্ক মানুষ সবচেয়ে বেশি দুর্ভোগে পড়েছেন।”
স্থানীয় বাসিন্দা রমজান আলী বলেন, “সেতু নির্মাণের পর থেকেই এর বিভিন্ন অংশে ফাটল দেখা দিয়েছিল। পরে অবৈধ বালু উত্তোলনের কারণে পরিস্থিতি আরও খারাপ হয়। আমরা বহুবার অভিযোগ করেছি, কিন্তু কেউ গুরুত্ব দেয়নি।”
আরেক বাসিন্দা গেন্দা মিয়া অভিযোগ করে বলেন, “অবৈধ বালু উত্তোলনের কারণে শুধু সেতুই নয়, নদীর দুই তীরের অনেক কৃষিজমি ও বসতভিটাও নদীগর্ভে বিলীন হয়ে গেছে।
“এতে বহু পরিবার ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। আমরা অবিলম্বে নদী রক্ষা এবং নতুন সেতু নির্মাণের দাবি জানাচ্ছি।”
এ বিষয়ে স্থানীয় জনপ্রতিনিধিরা জানান, বিষয়টি একাধিকবার সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের নজরে আনা হয়েছে। নতুন সেতু নির্মাণের জন্য প্রস্তাবও পাঠানো হয়েছে। তবে এখন পর্যন্ত কোনো দৃশ্যমান অগ্রগতি হয়নি।
দীর্ঘ ছয় বছরের ভোগান্তির অবসান ঘটিয়ে দ্রুত সময়ের মধ্যে বৈরান নদীর ওপর একটি টেকসই ও মানসম্মত নতুন সেতু নির্মাণের দাবি জানিয়েছেন এলাকাবাসী।
তাদের প্রত্যাশা, নতুন সেতু নির্মিত হলে উপজেলার পশ্চিমাঞ্চলের হাজারো মানুষের যোগাযোগ ব্যবস্থা স্বাভাবিক হবে এবং শিক্ষা, কৃষি ও অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডে নতুন গতি সঞ্চার হবে।