ঋণের টাকায় আর্জেন্টিনার জার্সির আদলে লুঙ্গি বানিয়েছেন সুমন গৌড়। ছবি: প্রতিদিনের বাংলাদেশ
এখনো মাঠে গড়ায়নি ফুটবল বিশ্বকাপ। কিন্তু উৎসবের আমেজ ইতোমধ্যে ছড়িয়ে পড়েছে শহর থেকে গ্রামে। বাড়ির ছাদ, গাছের মগডাল, বাজারের মোড়, পাড়ার ক্লাবঘর এমনকি কৃষকের ক্ষেতের পাশেও উড়ছে নানা দেশের রঙিন পতাকা। মোড়ে মোড়ে চলছে খেলা দেখার নানা আয়োজন।
এসবের মধ্যেও ব্যতিক্রম ময়মনসিংহের ঈশ্বরগঞ্জ পৌর শহরের দত্তপাড়া গ্রামের (এক নম্বর মোড়) এলাকার আশ্রয়ণ প্রকল্পের ঘরে বসবাসরত ভ্যানচালক সুমন গৌড় ওরফে মেসি সুমন (৩৫)।
একটি এনজিও থেকে ঋণ নিয়ে আর্জেন্টিনার পতাকার আদলে সাজিয়েছেন তার উপার্জনের একমাত্র বাহন ভ্যান গাড়িটি। সেই টাকায় কিনেছেন আর্জেন্টিনার জার্সি। জার্সির সাথে ম্যাচিং করে বানিয়েছেন লুঙ্গি। তার প্রিয় দল আর্জেন্টিনাকে ভালোবেসে এলাকায় টানিয়েছেন বড় আকারের ২০ থেকে ২৫টি আর্জেন্টিনার পতাকা।
শুধু এ বছর নয়, বহু বছর আগে থেকে আর্জেন্টিনার প্রতি তার এমন পাগলামির কারণে এলাকাবাসী তার নাম রেখেছেন মেসি। এখন তিনি মেসি নামেই পরিচিত। পাশেপাশের কয়েক এলাকার মানুষ তাকে মেসি নামে ডাকেন। মেসি নামে ডাকলে বেশ স্বাচ্ছন্দ্যবোধ করেন সুমন গৌড়।
সুমন গৌড়ওই এলাকার ভোট্ট চন্দ্রের ছেলে। আর্জেন্টিনার ফুটবল দলের প্রতি তার এমন কান্ডে এলাকায় বেশ আলোচিত তিনি। তবে এমন কাণ্ডে বিব্রত সুমনের হতদরিদ্র পরিবার।
পরিবার ও স্থানীয়রা জানান, ভ্যান চালিয়ে উপার্জিত অর্থে সংসার চলে সুমনের। কিন্তু বিশ্বকাপ এলেই শুরু হয় তার পাগলামি। শুনেন না কারও বারণ।
সুমনের স্ত্রী আড়তী গৌড় বলেন, “খেলা এলেই তিনি এমন পাগলামি শুরু করেন। শত বুঝিয়েও কোনও লাভ হয়নি। অভাবের সংসারে নুন আনতে পান্তা ফুরালেও তিনি এসব ঋণের টাকায় করেছেন। এতে আমি পড়েছি বেকায়দায়, অনেক রাগও করেছি তার সাথে। কিন্তু কে শুনে কার কথা! আমার কপাল মন্দ, তাই এখন আর কিছু বলি না তাকে।”
এ ব্যাপারে জানতে চাইলে সুমন গৌড় বলেন, “ছোটবেলা থেকেই আমি আর্জেন্টিনা দলকে ভালোবাসি। আর্জেন্টিনা ও মেসির আমার আবেগ, আমার ভালোবাসা। আর্জেন্টিনার প্রতি সেই ভালোবাসার জায়গা থেকেই নিজের ভ্যান গাড়িটি আর্জেন্টিনার পতাকার রঙে সাজিয়েছি। আমার এলাকায় এক নম্বর মোড়ে ২০ থেকে ২৫টির মতো বড় পতাকাও টানিয়েছি।”
কীভাবে এসব করেছেন এবং কত টাকা খরচ হয়েছে- এমন প্রশ্নের জবাবে মেসি বলেন, “একটি এনজিও থেকে লোন নিয়ে এসব করেছি। এতে আমার পঞ্চাশ হাজার টাকা খরচ হয়েছে।”
ঈশ্বরগঞ্জ বিভিন্ন এলাকায় উড়তে থাকা রঙিন পতাগুলো যেন একটি বার্তাই দেয়, ফুটবল কেবল একটি খেলা নয়; এটি মানুষের অনুভূতি, ভালোবাসা এবং সাংস্কৃতিক চর্চারও অংশ। মাঠের খেলা হাজার মাইল দূরে হলেও তার আবেগ ছুঁয়ে যাচ্ছে এখানকার প্রত্যন্ত জনপদকে। বাতাসে দোল খাওয়া এসব পতাকা তাই শুধু কাপড়ের টুকরো নয়, এগুলো ফুটবলপ্রেমীদের স্বপ্ন, আবেগ ও নান্দনিক প্রকাশের প্রতীক।
শালিখার আকাশে উড়তে থাকা রঙিন পতাকাগুলো যেন জানান দিচ্ছে, খেলা শুরু হওয়ার আগেই বেজে উঠেছে বিশ্বকাপের সাইরেন আর তাই বাহারি রঙের পতাকায় ফুটছে ফুটবলপ্রেমীদের ভালোবাসার ক্যানভাস।