কক্সবাজার বায়ুবিদ্যুৎ কেন্দ্র। ছবি: প্রতিদিনের বাংলাদেশ
বায়ুবিদ্যুৎ উৎপাদন প্রক্রিয়ায় ক্ষতিকর কার্বন ডাই-অক্সাইড নির্গমন হয় না। তাই একে ‘সবুজ শক্তি’ বা ‘গ্রিন এনার্জি’ বলা হয়। সম্পূর্ণ প্রাকৃতিক ও পুনর্নবীকরণযোগ্য উৎস থেকে তৈরি এই সবুজ শক্তির ‘বিপ্লব’ দেখিয়েছে সমুদ্রপাড়ের হাওয়া।
বলছিলাম সমুদ্র শহর কক্সবাজারের উপকূলে স্থাপিত বায়ুবিদ্যুৎ কেন্দ্রের কথা। ২০২৩ সালের মে মাসে পরীক্ষামূলক উৎপাদন শুরুর পর ২০২৪ সালের মার্চে পুরোদমে বাণিজ্যিক উৎপাদন শুরু করে বিদ্যুৎকেন্দ্র। গত দুই বছরে (৮ জুন পর্যন্ত) যা জাতীয় গ্রিডে যুক্ত করেছে ২ লাখ ৫১ হাজার ৫৫৯ দশমিক ২১৭ মেগাওয়াট বিদ্যুৎ। যেটিকে সবুজ শক্তির সাফল্য বলে মন্তব্য করেছেন কক্সবাজার বিদ্যুৎ উন্নয়ন বোর্ডের নির্বাহী প্রকৌশলী মো. আব্দুল কাদের গনি।
কক্সবাজার সদর উপজেলার খুরুশকুল, পোকখালী, পিএমখালী আর চৌফলদণ্ডীÑ এই চারটি ইউনিয়নে স্থাপন করা বিশাল বিশাল ২২টি বায়ুবিদ্যুৎ টারবাইন নিয়েই কক্সবাজার বায়ুবিদ্যুৎ কেন্দ্র। এর মধ্যে খুরুশকুলে ৮টি, পিএমখালীতে ২টি, চৌফলদণ্ডীতে ৭টি ও পোকখালীতে ৫টি টারবাইন রয়েছে। প্রতিটি টারবাইনের জন্য ব্যবহার করা হয় ২০ শতক জমি। আর এই বিদ্যুৎকেন্দ্রটির উৎপাদন ক্ষমতা ৬০ মেগাওয়াট।
প্রকৌশলী মো. আব্দুল কাদের গনি জানান, বাতাসের গতিবেগ প্রতি সেকেন্ডে ৩ মিটার ছাড়ালেই শুরু হয় বিদ্যুৎ উৎপাদন। এটি সর্বোচ্চ উৎপাদনে যেতে বাতাসের গতিবেগ প্রতি সেকেন্ডে ৯ মিটারের বেশি হওয়া প্রয়োজন। কক্সবাজারের উপকূলে সমুদ্র কিনারে এই বায়ুবিদ্যুৎ কেন্দ্র, যেখানে কম-বেশি বাতাস থাকেই। ফলে ১৫ মেগাওয়াট থেকে শুরু করে কখনও কখনও ৬০ মেগাওয়াট বিদ্যুৎ জাতীয় গ্রিডে যুক্ত হচ্ছে।
কক্সবাজার বায়ুবিদ্যুৎ কেন্দ্রের শিফ্ট ইনচার্জ মানিক আহমেদ বলেন, কক্সবাজার বায়ুবিদ্যুৎ কেন্দ্রের প্রতিটি টারবাইনের উচ্চতা প্রায় ৯০ মিটার এবং প্রতিটি ব্লেডের দৈর্ঘ্য ৬০ মিটার। এসব টারবাইন চীনে নির্মিত হয়ে জাহাজে করে প্রথমে চট্টগ্রাম বন্দরে আনা হয় এবং পরে বার্জের মাধ্যমে কক্সবাজারে পরিবহন করে স্থাপন করা হয়েছে।
তিনি আরও বলেন, এটি একটি নবায়নযোগ্য জ্বালানি প্রকল্প, যেখানে গ্যাস, তেল বা কয়লার কোনো ব্যবহার নেই। শুধুমাত্র প্রাকৃতিক বাতাসের শক্তি ব্যবহার করেই বিদ্যুৎ উৎপাদন করা হয়। বর্তমানে বৈশ্বিক জ্বালানি সংকট ও বিদ্যুতের ক্রমবর্ধমান চাহিদার প্রেক্ষাপটে এই প্রকল্প নিয়মিতভাবে জাতীয় গ্রিডে গুরুত্বপূর্ণ অবদান রাখছে। বর্তমানে গড়ে প্রতি ঘণ্টায় প্রায় ৩০ মেগাওয়াট বিদ্যুৎ সরবরাহ করা সম্ভব হচ্ছে।
কক্সবাজার বায়ুবিদ্যুৎ কেন্দ্রের প্রকল্প সমন্বয়কারী কর্মকর্তা এনামুল হক বলেন, গ্রীষ্মকালীন মৌসুমে বায়ুর গতিবিধির ওপর নির্ভর করে এখানে বিদ্যুৎ উৎপাদন ওঠানামা করছে। গড়ে ৩০ থেকে ৪০ মেগাওয়াট এবং সর্বোচ্চ প্রায় ৬৬ মেগাওয়াট পর্যন্ত বিদ্যুৎ জাতীয় গ্রিডে সরবরাহ করা সম্ভব হচ্ছে।
তিনি আরও জানান, উৎপাদিত এই বিদ্যুৎ কক্সবাজারের খুরুশকুল সাবস্টেশনের মাধ্যমে প্রায় ৪০টি গ্রিড টাওয়ার হয়ে ঝিলংজা গ্রিড উপকেন্দ্রে সংযুক্ত হচ্ছে। সেখান থেকে এটি দেশের জাতীয় গ্রিডে প্রবাহিত হয়ে সারা দেশে বিদ্যুৎ সরবরাহে অবদান রাখছে।
কক্সবাজার চেম্বার অব কমার্স অ্যান্ড ইন্ডাস্ট্রির মুখপাত্র আবিদ আহসান সাগর বলেন, বিদ্যুৎ উৎপাদনের ক্ষেত্রে বহুমুখী উদ্যোগ না থাকলে সংকটকালীন সময়ে বিভিন্ন ধরনের চ্যালেঞ্জ দেখা দিতে পারে। তাই বিকল্প ও নবায়নযোগ্য জ্বালানির উৎসগুলো কাজে লাগানো অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। কক্সবাজারের কুতুবদিয়া, টেকনাফ, মহেশখালীসহ বিভিন্ন এলাকায় উত্তর ও দক্ষিণদিকের বাতাসের প্রবাহ অনেকটাই স্থিতিশীল। এসব এলাকার বায়ুর গতিবেগ সঠিকভাবে মূল্যায়ন করে যদি কার্যকরভাবে বায়ুবিদ্যুৎ প্রকল্প সম্প্রসারণ করা যায়, তাহলে দেশের বিদ্যুৎ সংকট অনেকাংশে কমিয়ে আনা সম্ভব হবে।