টেকসই বেড়িবাঁধ নির্মাণ এবং সুপেয় পানি নিশ্চয়তাই দিতে পারে উপকূলের বিপন্ন জনপদের মানুষকে নতুন করে বাঁচার আশা। প্রবা ফটো
জলবায়ু পরিবর্তনে খুলনার সুন্দরবন সংলগ্ন কয়রা উপজেলার সাতটি ইউনিয়নের জনজীবন আজ সংকটের মুখে। ঘূর্ণিঝড়, নদীভাঙন, জলোচ্ছ্বাস, লবণাক্ততা ও দীর্ঘস্থায়ী জলাবদ্ধতার কারণে শিক্ষা, স্বাস্থ্যসেবা ও সামাজিক নিরাপত্তা ব্যবস্থা বিপর্যস্ত হয়ে পড়েছে।
স্থানীয়দের দাবি, কপোতাক্ষ ও শাকবাড়িয়া নদীর ভাঙন রোধে কার্যকর ব্যবস্থা, টেকসই বেড়িবাঁধ নির্মাণ এবং সুপেয় পানির নিশ্চয়তাই পারে উপকূলের এই বিপন্ন জনপদের মানুষকে নতুন করে বাঁচার আশা দিতে।
উপজেলার আমাদী, বাগালী, মহেশ্বরীপুর, মহারাজপুর, কয়রা ইউনিয়ন, উত্তর বেদকাশী ও দক্ষিণ বেদকাশীÑ এই সাতটি ইউনিয়নেই সিডর, আইলা, আম্পান, সিত্রাং ও মোখার মতো প্রলয়ঙ্করী ঘূর্ণিঝড় ঘন ঘন আঘাত হানছে। এর সঙ্গে প্রতিনিয়ত যুক্ত রয়েছে কপোতাক্ষ ও শাকবাড়িয়া নদীর তীব্র ভাঙন, জলোচ্ছ্বাস, দীর্ঘস্থায়ী জলাবদ্ধতা ও অতিবৃষ্টির প্রকোপ। এই বহুমুখী দুর্যোগের ফলে এখানকার দরিদ্র পরিবারগুলো বারবার নিঃস্ব হচ্ছে। জীবনসংগ্রামের তাগিদে পুরুষদের পাশাপাশি নারীদেরও দিনরাত হাড়ভাঙা খাটুনি খাটতে হচ্ছে শুধু দুমুঠো অন্ন জোগাড়ের জন্য। কিন্তু এই লড়াইয়ের আড়ালে হারিয়ে যাচ্ছে শিশুদের শিক্ষা আর নারীদের ন্যূনতম স্বাস্থ্যসুরক্ষা।
স্থানীয়রা জানান, সুন্দরবনের কোলঘেঁষে প্রকৃতির সঙ্গে প্রতিনিয়ত লড়াই করা এই সাতটি ইউনিয়নের মানুষের জীবনমান উন্নয়ন, শিক্ষার আলো নিশ্চিতকরণ এবং স্বাস্থ্যঝুঁকি কমাতে কপোতাক্ষ নদ ও শাকবাড়িয়া নদীর ভাঙন রোধে দ্রুত কার্যকর পদক্ষেপ ও টেকসই বেড়িবাঁধ নির্মাণ এখন কয়রার সবচেয়ে বড় দাবি।
কয়রার দক্ষিণ বেদকাশী ইউনিয়নের বাসিন্দা মারুফা খাতুন গতকাল বিকালে কপোতাক্ষের পাড়ে দাঁড়িয়ে চোখ মুছতে মুছতে বলেন, ‘আমাগো জমিতে এখন আর ধান হয় না। এক কলস মিষ্টি পানির লাইগা আমাগো মাইলের পর মাইল হাঁইটে যাইতে হয়। এই লোনা পানির মধ্যে থাইকে আমাগো শরীরের চামড়ায় ঘা হয়ে গেছে, ঘরের মা-বোনদের নানা রোগব্যাধি লেগে থাকে। আমাগো ত্রাণ চাই না, আমাগো একটু শান্তিতে বাঁচার মতো টেকসই বেড়িবাঁধ আর একটু সুপেয় পানি চাই।’
বাংলাদেশ মানবাধিকার ব্যুরো কয়রা উপজেলা শাখার সভাপতি তরিকুল ইসলাম বলেন, জলবায়ু পরিবর্তনের কারণে সৃষ্ট দুর্যোগে কয়রার ৭টি ইউনিয়নেই নারী ও শিশুরা চরম মানবাধিকার লঙ্ঘনের শিকার হচ্ছে। মৌলিক অধিকার থেকে বঞ্চিত এই মানুষগুলোকে অধিকার সুরক্ষায় এখনই রাষ্ট্রীয় ও সামাজিক পর্যায়ে সমন্বিত উদ্যোগ নেওয়া প্রয়োজন।
খুলনা জেলা বিএনপির সদস্য এমএ হাসান বলেন, কয়রার মানুষ প্রতিনিয়ত প্রকৃতির সঙ্গে যুদ্ধ করে বেঁচে আছে। বিশেষ করে নারী ও শিশুদের জীবন আজ সবচেয়ে বেশি অরক্ষিত। এই অঞ্চলের মানুষের জন্য টেকসই বেড়িবাঁধ নির্মাণ, সুপেয় পানির ব্যবস্থা এবং কর্মসংস্থানের সুযোগ সৃষ্টি না করলে এই মানবিক বিপর্যয় আরও ভয়াবহ রূপ নেবে।
কয়রা উপজেলা স্বাস্থ্য ও পরিবার পরিকল্পনা কর্মকর্তা ডা. রেজাউল করিম বলেন, উপকূলীয় এলাকায় অতিরিক্ত গরম, তীব্র লবণাক্ততা ও অন্যান্য জলবায়ু সংক্রান্ত সমস্যায় রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা কম হওয়ায় তারা ডায়রিয়া, পুষ্টিহীনতা ও অন্যান্য প্রাণঘাতী রোগে আক্রান্ত হওয়ার ঝুঁকিতে সবচেয়ে বেশি থাকে। জলবায়ুর এই পরিবর্তনের ফলে দিন দিন এখানে স্বাস্থ্যঝুঁকি আরও তীব্র হচ্ছে।