× ই-পেপার প্রচ্ছদ সর্বশেষ বাংলাদেশ রাজনীতি দেশজুড়ে বিশ্বজুড়ে বাণিজ্য খেলা বিনোদন মতামত চাকরি শিক্ষা আজকের কার্টুন ফিচার সকল বিভাগ ছবি ভিডিও লেখক আর্কাইভ কনভার্টার

পানির জন্য হাহাকার

রাজু আহমেদ, রাজশাহী

প্রকাশ : ১৪ ঘণ্টা আগে

আপডেট : ১৪ ঘণ্টা আগে

দূর-দূরান্ত থেকে খাবার পানি আনার এমন দৃশ্য চোখে পড়ে বরেন্দ্র অঞ্চলের প্রায় সর্বত্র। রাজশাহীর তানোর উপজেলার কোন্দাইল গ্রাম থেকে তোলা। ছবি: প্রতিদিনের বাংলাদেশ

দূর-দূরান্ত থেকে খাবার পানি আনার এমন দৃশ্য চোখে পড়ে বরেন্দ্র অঞ্চলের প্রায় সর্বত্র। রাজশাহীর তানোর উপজেলার কোন্দাইল গ্রাম থেকে তোলা। ছবি: প্রতিদিনের বাংলাদেশ

রাজশাহীর অর্থনীতি কৃষিনির্ভর। আর কৃষিজমি সেচে এই অঞ্চলের মানুষ আজও ভূগর্ভস্থ পানির ওপর নির্ভরশীলÑ যা পানিশূন্য করে তুলছে এই অঞ্চলকে।

রাজশাহীর বরেন্দ্র অঞ্চলে পানি সংকটের কারণে সেচব্যবস্থা ভেঙে পড়ছে, বাড়ছে ধান চাষের খরচ, অনাবাদি হয়ে পড়ছে বিস্তীর্ণ কৃষিজমি। এমনকি খাওয়ার পানি সংগ্রহেও মানুষকে সংগ্রাম করতে হচ্ছে। 

এই পানি সংকটের কারণে বরেন্দ্র এলাকার কৃষিব্যবস্থায় পরিবর্তন এসেছে। বেশি পানির প্রয়োজন হয়Ñ এমন ফসল থেকে সরে আসতে বাধ্য হচ্ছেন কৃষক। এমনকি পানি বেশি প্রয়োজন হয় এমন ফসল যেমন ধান ও আলুর মতো ফসল উৎপাদনের কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরসহ বরেন্দ্র উন্নয়ন কর্তৃপক্ষ (বিএমডিএ) কৃষকদের নিরুৎসাহিত করছে। পরিসংখ্যান ব্যুরোর তথ্যে দেখা গেছে, রাজশাহী, নওগাঁ ও চাঁপাইনবাবগঞ্জ জেলায় পানি সংকটাপন্ন ঘোষিত এলাকার আয়তন ২ হাজার ৭৮৭ বর্গকিলোমিটার; যেখানে প্রায় ২১ লাখ ৫ হাজার মানুষ পানি সংকটে ভুগছেন।

এরই মধ্যে দেশের উত্তর-পশ্চিমাঞ্চলের একটি অংশকে পানি সংকটাপন্ন অঞ্চল হিসেবে ঘোষণা করেছে সরকার। ভূগর্ভস্থ পানির স্তর রক্ষা ও টেকসই পানি ব্যবস্থাপনা নিশ্চিত করতে পানিসম্পদ মন্ত্রণালয়ের অধীনে পানিসম্পদ পরিকল্পনা সংস্থা ওয়ারপো পরিচালিত অনুসন্ধান ও জরিপের ভিত্তিতে ২০২৫ সালের ২৮ অক্টোবর এ সংক্রান্ত প্রজ্ঞাপন জারি করা হয়। প্রজ্ঞাপন অনুযায়ী, উত্তর-পশ্চিম হাইড্রোলজিক্যাল অঞ্চলের রাজশাহী, চাঁপাইনবাবগঞ্জ ও নওগাঁ জেলার মোট ২৫টি উপজেলাকে পানি সংকটাপন্ন এলাকা হিসেবে চিহ্নিত করা হয়েছে। এর মধ্যে ৪৭টি ইউনিয়নকে ‘অতি উচ্চ পানি সংকটাপন্ন’, ৪০টি ইউনিয়নকে ‘উচ্চ পানি সংকটাপন্ন’ এবং ৬৬টি ইউনিয়নকে ‘মধ্যম পানি সংকটাপন্ন’ হিসেবে শ্রেণিবদ্ধ করা হয়েছে। 

পরিস্থিতি উত্তরণে সরকারি নির্দেশনায় বলা হয়েছে, এসব এলাকায় পানিসম্পদের সুষম ব্যবহার ও সংরক্ষণ নিশ্চিত করতে হবে। খাবার পানি ছাড়া অন্য কোনো কাজে নতুন নলকূপ স্থাপন বা ভূগর্ভস্থ পানি উত্তোলন সম্পূর্ণ নিষিদ্ধ। বিদ্যমান নলকূপ থেকেও পানীয় জলের বাইরে কৃষি, শিল্প কিংবা অন্য কোনো উদ্দেশ্যে পানি তোলা যাবে না। গত ২২ জানুয়ারি এ বিষয়ে গেজেট প্রকাশিত হয়েছে। এরপর থেকে আগামী ১০ বছরের জন্য এ এলাকাকে ‘পানি সংকটাপন্ন’ এলাকা হিসেবে ঘোষণা করা হয়। খাওয়ার জন্য ছাড়া অন্য কোনো কাজে এসব এলাকায় ভূগর্ভস্থ পানি তোলা আগামী দুই বছরের মধ্যে বন্ধ ঘোষণা করার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে।

পানি আইন অনুযায়ী, সংকটাপন্ন এলাকায় খাওয়ার পানি ছাড়া অন্য কোনো কারণে নতুন করে নলকূপ স্থাপন ও ভূগর্ভস্থ পানি তোলা বন্ধ থাকবে। যেকোনো এলাকার ভূগর্ভস্থ পানিধারক স্তরের সর্বনিম্ন নিরাপদ আহরণসীমা নির্ধারণ করতে পারবে। ভূগর্ভস্থ পানি-নির্ভর শিল্প বা প্রতিষ্ঠান স্থাপন করা যাবে না। খাল, বিল, পুকুর, নদী তথা কোনো জলাধারের শ্রেণি পরিবর্তন করা যাবে না এবং জলাশয়গুলো জনগণের ব্যবহারের জন্য উন্মুক্ত রাখতে হবে। জনগণের ব্যবহারযোগ্য খাস জলাশয় ও জলমহালগুলো ইজারা দেওয়া নিরুৎসাহিত করতে হবে; কোনো জলাধারের সব পানি আহরণ করা যাবে না। এ রকম ১১টি বিধিনিষেধ প্রতিপালন করা বাধ্যতামূলক। বিধিনিষেধের লঙ্ঘন দণ্ডনীয় অপরাধ বলে গণ্য হবে।

সরকারি প্রজ্ঞাপন জারির আগে করা গবেষণায় দেখা যায়, জলবায়ু পরিবতর্নের প্রভাব, কম বৃষ্টিপাত, দীর্ঘস্থায়ী খরাসহ অপরিকল্পিতভাবে ভূগর্ভস্থ পানি উত্তোলনের ফলে বরেন্দ্র অঞ্চলে পানির স্তর নেমেছে ১২০ থেকে ১৫০ ফুট পর্যন্ত। বরেন্দ্র বহুমুখী উন্নয়ন কর্তৃপক্ষের ১৩ হাজার গভীর নলকূপের পাশাপাশি ব্যক্তিগত পর্যায়ে আরও ২০ হাজারের বেশি গভীর নলকূপ রয়েছেÑ যা খরা প্রবণ বরেন্দ্র অঞ্চলের বিস্তীর্ণ জমির সেচসহ গৃহস্থালি কাজে ব্যবহৃত হচ্ছে। 

স্থানীয় রাজনীতিতে ডিপ মেশিন অপারেটররা গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করছে। রাজনৈতিক সভায় কর্মীদের অংশগ্রহণ নিশ্চিত করতে ডিপ অপারেটররা কাজ করে। তারা কৃষকদের এসব কর্মসূচিতে অংশ নিতে বাধ্য করে। এই অঞ্চলের বিপুলসংখ্যক কৃষক তাদের জমিতে সেচের জন্য ভূগর্ভস্থ পানির ওপর নির্ভরশীল। বিএমডিএ-সহ ব্যক্তি পর্যায়ে যেসব ডিপ মেশিন রয়েছে সেগুলোর অপারেটরদের কাছে জিম্মি এসব কৃষক। রাজনৈতিক নানা কর্মসূচিতে অংশ না নিলে তাদের জমিতে সময়মতো সেচের পানি সরবরাহ করা হয় না বলে অভিযোগ রয়েছে। এ ছাড়া কোনো কৃষক যদি তাদের জমি লিজ দিতে চায় তবে ওই ডিপ অপারেটরদের তুলনামূলক কম মূলে লিজ না দিয়ে অন্য কাউকে দিলে সেই জমিতে সেচের পানি পেতে সমস্যায় পড়তে হয়। 

তানোরের মাহালী পাড়ার বাসিন্দা রিনা টুডু বলেন, আমাদের এলাকায় টিউবঅয়েল বা ডিপ মেশিন দিয়েও পানি ওঠে না। বাড়ি থেকে এক মাইল দূর থেকে (গোসল, খাবার ও রান্নার) পানি নিয়ে আনতে হয়। পুকুরের পানি ব্যবহারের অনুপযোগী। পুকুরে মাছ চাষ করা হয়। ওই পানিতে গোসল করলে গায়ে চুলকানি হয়। গোদাগাড়ী উপজেলার কৃষক হেকমত আলী বলেন, টাকা দিয়েও অনেক সময় জমিতে পানি পাওয়া যায় না। ডিপ অপারেটররা বলে, পানি উঠছে না বা মেশিন নষ্ট। কৃষি বিভাগ থেকে বলা হচ্ছে ধানসহ যেসব ফসলে পানি বেশি লাগে ওইসব ফসল চাষ করা যাবে না।

গোদাগাড়ী উপজেলার বাসিন্দা ওয়াসের আলী বলেন, এক বিঘা জমি পানি দিতে চার ঘণ্টা সময় লাগবে। সব মিলিয়ে এক বিঘা জমিতে বোরো চাষ করতে ৫ হাজার ২০০ টাকা পর্যন্ত শুধু পানির পেছনে খরচ হচ্ছে।

বরেন্দ্র এলাকার পানির সংকট ও সমাধান নিয়ে দুই যুগের বেশি সময় ধরে গবেষণা করছেন রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের ভূতত্ত্ব ও খনিবিদ্যা বিভাগের অধ্যাপক চৌধুরী সারওয়ার জাহান সজল। তিনি বলেন, খাবার পানি না পাওয়া গেলে মাহাবিপর্যয় ঘটবে। ওই এলাকায় কেউ থাকতে পারবে না।’ তানোর ও গোদাগাড়ী উপজেলায় আদিবাসীদের সংখ্যা বেশি। তারা এই চ্যালেঞ্জ মোকাবিলা করতে না পেরে এলাকা ছাড়তে বাধ্য হচ্ছে এবং নতুন এলাকায় গিয়ে তাদের সংস্কৃতিও তারা হারাতে বসেছে।

অধ্যাপক সজল আরও বলেন, ১২০-১৬০ ফিট নিচেও পানি নেই। আইন-কানুন থাকার পরেও সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ তা বাস্তাবায়ন করতে পারেনি। মূল্যবান খাবার পানি দিয়ে গবাদিপশুর গোসল ও গৃহস্থালির কাজ করা হচ্ছে, সেচ দেওয়া হচ্ছে। সরকারের প্রজেক্ট আসে। তা শেষ হলে তা নিয়ে আর কার্যকর কোনো পদক্ষেপ থাকে না। পানি সংকট নিয়ে যদি এমন পরিস্থিতি চলতে থাকে তবে তা হবে ক্ষতিকর।

বিএমডিএর অতিরিক্ত প্রধান প্রকৌশলী আবুল কাশেম বলেন, বিএমডিএ ভূগর্ভস্থ পানি উত্তোলন করে মাত্র ২৭ শতাংশ। বাকি পানি ব্যক্তিমালিকানাধীন পাম্প থেকে তোলা হচ্ছে। এগুলো নিয়ন্ত্রণের বাইরে। বিএমডিএ এখন সেচকাজে ২২ শতাংশ ভূ-উপরিস্থ পানি ব্যবহার করছে। ২০৩০ সালে যা ৩০ শতাংশ এবং ২০৫০ সালে ৫০ শতাংশে বৃদ্ধি করা হবে। আগামী দুই বছরের মধ্যে হাতে নেওয়া একটি প্রকল্প থেকে ১০ হাজার ২৫০ হেক্টর জমিকে ভূ-উপরিস্থ পানি দিয়ে সেচ দেওয়া যাবে। তিনি জানান, বরেন্দ্র এলাকায় ৫ হাজার ৫৫৩টি খাসপুকুর ও জলাশয় আছে। এগুলো উপজেলা প্রশাসন ইজারা দিচ্ছে। বিএমডিএকে দিলে তারা জনগণের জন্য উন্মুক্ত করে দিতে পারে।

শেয়ার করুন-

মন্তব্য করুন

Protidiner Bangladesh

সম্পাদক : মারুফ কামাল খান

প্রকাশক : কাউসার আহমেদ অপু

রংধনু কর্পোরেট, ক- ২৭১ (১০ম তলা) ব্লক-সি, প্রগতি সরণি, কুড়িল (বিশ্বরোড) ঢাকা -১২২৯

যোগাযোগ

প্রধান কার্যালয়: +৮৮০৯৬১১৬৭৭৬৯৬ । ই-মেইল: [email protected]

বিজ্ঞাপন (প্রিন্ট): +৮৮০৯৬১১৬৭৭৮১০, +৮৮০১৮৮০৭৪৪৫৮০ | ই-মেইল: [email protected]

বিজ্ঞাপন (অনলাইন): +৮৮০১৮৮০৭৪৪৫৮০, +৮৮০১৭৯৯৪৪৯৫৫৯ । ই-মেইল: [email protected]

সার্কুলেশন: +৮৮০৯৬১১৬৭৭৮০৭, +৮৮০১৮৮০৭৪৪৩৩২ । ই-মেইল: [email protected]

বিজ্ঞাপন মূল্য তালিকা