মাদারীপুর সংবাদদাতা
প্রকাশ : ৩০ ডিসেম্বর ২০২২ ১৭:৪২ পিএম
আপডেট : ০৩ জানুয়ারি ২০২৩ ১৯:০৯ পিএম
রাজস্ব কর্মকর্তা রফিকুল ইসলামের ঘুষ নেওয়ার চিত্র (বাঁয়ে, ভিডিও থেকে নেওয়া ছবি), আরেক রাজস্ব কর্মকর্তা ইমরান কবীর (ডানে)।
কাস্টমস, এক্সাইজ ও ভ্যাট বিভাগ মাদারীপুর সার্কেল কার্যালয়ের দুই রাজস্ব কর্মকর্তার ঘুষ নেওয়ার একটি ভিডিও সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে ছড়িয়ে পড়েছে। ২৭ ডিসেম্বর রাতে ফাঁস হওয়া ১০ মিনিট ১৩ সেকেন্ডের ভিডিওতে দেখা যায়, দুই রাজস্ব কর্মকর্তা এক ব্যবসায়ীর সঙ্গে দর-কষাকষি করছেন। এমনকি চাহিদামতো নির্ধারিত সময়ের মধ্যে মাসোহারা চাইছেন।
ভিডিওতে আরও দেখা যায়, কাস্টমস ও এক্সাইজ ও ভ্যাট বিভাগ মাদারীপুর সার্কেল কার্যালয়ের রাজস্ব কর্মকর্তা (সার্কেল-২) রফিকুল ইসলাম ও (সার্কেল-১) মো. ইমরান কবীর অফিস কক্ষে বসে ঘুষের টাকা নিচ্ছেন।
ফাঁস হওয়া ভিডিওর শুরুতে এক ব্যবসীয়কে উদ্দেশ করে রফিকুল ইসলাম বলেন, ‘এইডা কী আনছেন?’ পরে ৫০০ টাকার কয়েকটি নোট হাতে গুনে পকেটে ভরেন রফিকুল। এরপর রাজস্ব কর্মকর্তা রফিকুল ওই ব্যবসায়ীকে বলেন, ‘কী যে করেন আপনারা? মানে... মাদারীপুরের লোক এত ধনী, দেশের মধ্যে তৃতীয় ধনী জেলা। আপনারা কেন এমন করেন?’
একপর্যায়ে ব্যবসায়ীর ওপর ক্ষুব্ধ হয়ে রফিকুল ইসলাম বলেন, ‘যা দিছেন আমি এটা নিতে পারব না। এটা ইমরান সাহেবকে কী দেব? আমি কীভাবে বুঝাব? স্যারে তো বকব! আমি এটা নিতে পারব না। এই ৩ (তিন হাজার) আমি নিতে পারব না। বাকিটা কখন দেবেন? আপনারা স্যারকে বলে যান, দেখা করে যান। কারণ তিনি (ইমরান কবীর) আপনার অরজিনাল স্যার। সেই আপনাকে বাঁচাতে পারব, মারতে পারব। বুঝচ্ছেন!’
শেষ কথায় রফিকুল ইসলাম ওই ব্যবসায়ীকে বলেন, ‘প্রতি মাসে অফিস খরচ ১ হাজার টাকা দিয়ে যাবেন। এটা যেন আর না বলা লাগে। কথা যেন নড়চড় না হয়। মাসের ১০ তারিখের মধ্যে টাকা আমার কাছে দিয়ে যাবেন।’
ভিডিওর ৮ মিনিট ৩৫ সেকেন্ড পর দেখা যায় রাজস্ব কর্মকর্তা (সার্কেল-১) মো. ইমরান কবীরকে। তিনি ওই ব্যবসায়ীকে উদ্দেশ করে বলেন, ‘আপনার দোকানের আশপাশে যারা দিচ্ছে ওয়েল অ্যান্ড গুড। আর যারা দিচ্ছেন না, তাদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেব। আপনার নম্বর দিয়ে যান।’
পরে ওই ব্যবসায়ী ১ হাজার টাকা ইমরান কবীরের টেবিলে রাখলে তিনি টাকাটা নেন।
খোঁজ নিয়ে জানা যায়, ভিডিওতে থাকা ওই ব্যবসায়ীর নাম অমিত হাসান। তিনি মাদারীপুর পুরান বাজারের পোশাক ব্যবসায়ী। জানতে চাইলে ব্যবসায়ী অমিত হাসান প্রতিদিনের বাংলাদেশকে বলেন, ‘আমার ছোট পোশাকের দোকান। প্রতি মাসে ১০ হাজার টাকা করে ভ্যাট দিতে বলেন স্যারেরা। পরে অফিসে গেলে তারা ১ হাজার টাকা করে ভ্যাট দেওয়ার ব্যবস্থা করে দেন। কিন্তু শর্ত হলো, প্রতি মাসে অফিসে ৩ হাজার করে টাকা দিতে হবে।’
ছড়িয়ে পড়া ভিডিও এবং সেখানকার কথোপকথনের বিষয় অস্বীকার করেছেন রাজস্ব কর্মকর্তা (সার্কেল-১) মো. ইমরান কবীর।
তিনি প্রতিদিনের বাংলাদেশের কাছে দাবি করেন, ‘ভিডিওটি আমার নয়, এটি সাজানো। এ বিষয়ে আমার আর কোনো মন্তব্য নেই।’
তবে ওই ব্যবসায়ীর কাছ থেকে কাজের জন্য টাকা নেওয়া হয়েছে বলে দাবি আরেক রাজস্ব কর্মকর্তা (সার্কেল-২) রফিকুল ইসলামের।
তিনি বলেন, ‘ওই ব্যবসায়ী আমার কাছে আসার পর তাকে ট্রেজারি চালানের মাধ্যমে টাকা জমা দিতে বলেছিলাম। তার কাছে কোনো অনৈতিক দাবি করা হয়নি। ঘুষ দাবির ভিডিও প্রসঙ্গে তিনি বলেন, ‘কথোপকথনগুলো ভুলভাবে উপস্থাপন করা হয়েছে। এসব ভিত্তিহীন অভিযোগ।’
জানতে চাইলে ক্ষুব্ধ হন কাস্টমস, এক্সাইজ ও ভ্যাট বিভাগ মাদারীপুর সার্কেল কার্যালয়ের বিভাগীয় কর্মকর্তা ও ডেপুটি কমিশনার মো. এনামুল হক।
তিনি মোবাইল ফোনে প্রতিদিনের বাংলাদেশকে বলেন, ‘আপনারা তো আসছিলেন, নিউজ করে দেন। অসুবিধা নেই।’ একথা বলেই মোবাইল ফোনের সংযোগ বিচ্ছিন্ন করে দেন।
বিষয়টি সম্পর্কে অবগত আছেন মাদারীপুর জেলা প্রশাসক ড. রহিমা খাতুন। তিনি বলেন, ‘দুই রাজস্ব কর্মকর্তার ঘুষ গ্রহণের ভিডিওটি আমি দেখেছি। পুরো ঘটনাটি যাচাই-বাছাই করা হচ্ছে। অনৈতিক কার্যক্রমের সঙ্গে জড়িত এসব কর্মকর্তার বিরুদ্ধে দ্রুতই ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে।’