মেঘনায় তেলবাহী জাহাজ ডুবি
ভোলা সংবাদদাতা
প্রকাশ : ২৭ ডিসেম্বর ২০২২ ১৮:৪৮ পিএম
আপডেট : ২৭ ডিসেম্বর ২০২২ ১৯:৩৯ পিএম
তিন দিন পরেও উদ্ধার হয়নি মেঘনায় ডুবে যাওয়া জাহাজ সাগরনন্দিনী-২। মঙ্গলবার তুলাতুলি এলাকা থেকে তোলা ছবি।
তিন দিন পার হলেও ভোলার মেঘনায় ডুবে যাওয়া কার্গো জাহাজ সাগরনন্দিনী ২-কে উদ্ধার করা যায়নি। মঙ্গলবার (২৭ ডিসেম্বর) সন্ধ্যা পর্যন্ত ঘটনাস্থলে এসে পৌঁছায়নি উদ্ধারকারী জাহাজ (বার্জ) হুমায়ারা। মঙ্গলবার (২৭ ডিসেম্বর) গিয়ে দেখা গেছে, ঘটনাস্থলে এখনও জাহাজটি অর্ধ-নিমজ্জিত অবস্থায় রয়েছে। জাহাজের তেল ভাসছে নদীর বিভিন্ন পয়েন্টে। এতে ভয়াবহ পরিবেশ বিপর্যয়ের আশঙ্কা করছেন স্থানীয়রা। এ ছাড়া জাহাজডুবির পর থেকে নদীতে ইলিশ মাছের দেখা মিলছে না বলেও জানিয়েছেন কয়েকজন জেলে। পরিবেশের ওপর ক্ষতির ধরন বুঝতে ইতোমধ্যে নমুনা পরীক্ষা শুরু করেছে পরিবেশ অধিদপ্তর।
মঙ্গলবার ইব্রাহিম নামে এক জেলে বলেন, ‘নদীতে তেল ভাসছে এবং চারদিকে দুর্গন্ধ ছড়িয়ে পড়ছে। আমরা ঠিকমতো মাছ শিকার করতে পারছি না। কোনো কোনো পয়েন্টে আবার মাছ ভাসছে।’
ভোলা সদরের তুলাতলীর মৎস্য আড়তদার মনজুর আলম বলেন, ‘নদীর পানি জেলেরা বিভিন্ন সময় রান্না ও গোসলের কাজে ব্যবহার করছে। কিন্তু তেল ভাসার কারণে তাদের সমস্যা হচ্ছে। এ ছাড়া ইলিশের দেখা মিলছে না। ভেসে উঠছে পোয়া ও টেংরা মাছ। এমন অবস্থা থাকলে নদীতে মাছের সংকট দেখা দেবে।’
নদীতে তেল ভাসার কারণে মাছের প্রজনন ও ডিম উৎপাদনে ভবিষ্যতে সংকট দেখা দেবে বলে মনে করছে মৎস্য বিভাগ।
জেলা মৎস্য কর্মকর্তা মোল্লা ওবায়দুল্লা বলেন, ‘তেলের কারণে মৎস্যে বড় ধরনের প্রভাব পড়বে।’
পরিবেশের ওপর জাহাজ থেকে ছড়ানো তেলের প্রভাব বুঝতে নমুনা সংগ্রহ করেছে পরিবেশ অধিদপ্তর।
এ বিষয়ে পরিবেশ অধিদপ্তরের সহকারী পরিচালক তোতা মিয়া বলেন, ‘দূষণের বিষয়টি নিশ্চিত হতে আমরা নদীর পানির নমুনা সংগ্রহ করেছি। দুয়েক দিনের মধ্যে বিষয়টি আমরা জানতে পারব। তবে জলজ উদ্ভিদে ক্ষতির প্রভাব পড়তে পারে।’

এদিকে উদ্ধার অভিযানে দেরি হওয়ায় অর্ধেক ডুবে থাকা জাহাজটি নদীতে পুরোপুরি ডুবে যাওয়ার শঙ্কা তৈরি হয়েছে।
বাংলাদেশ অভ্যন্তরীণ নৌ পরিবহন কর্তৃপক্ষের (বিআইডব্লিউটিএ) ডুবুরি দলের সদস্য ইমাম হোসেন বলেন, ‘জাহাজটি বর্তমানে পানির ৫৫ ফুট নিচে রয়েছে। এটি ধীরে ধীরে নদীর তলদেশের দিকে যাচ্ছে। সময় যত বাড়বে, ততই এটি তলিয়ে যাওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে।’
তবে জাহাজটির সার্বিক নিরাপত্তায় ঘটনাস্থলে কোস্টগার্ড দক্ষিণ জোনের একটি টিম অবস্থান করছে।
এদিকে জাহাজডুবির ঘটনার দুদিন পর নতুন করে আরও দুটি তদন্ত কমিটি গঠন করা হয়েছে। মঙ্গলবার (২৭ ডিসেম্বর) দুপুরে আলাদা দুটি তদন্ত কমিটি করা হয়। এর মধ্যে বিআইডব্লিটিএ থেকে তিন সদস্যের এবং পরিবেশ অধিদপ্তর থেকে ১০ সদস্যের কমিটি গঠন করা হয়। এ নিয়ে গত দুদিনে চারটি আলাদা তদন্ত কমিটি গঠন করা হলো। এর আগে বাংলাদেশ পেট্রোলিয়াম করপোরেশন (বিপিসি) থেকে চার সদস্যের এবং পদ্মা অয়েল কোম্পানি থেকে আলাদা দুটি তদন্ত কমিটি গঠন করা হয়েছে। আগামী সাত কর্মদিবসের মধ্যে এই কমিটিগুলোকে তদন্ত প্রতিবেদন জমা দিতে বলা হয়েছে।
বিপিসির গঠিত কমিটির তদন্ত কর্মকর্তা ও সংস্থাটির ডিজিএম মোরশেদ হোসাইন আলম বলেন, ‘কীভাবে দুর্ঘটনা ঘটল, দুর্ঘটনার কারণ এবং ক্ষতির পরিমাণ নিরূপণ করতে আমরা ইতোমধ্যে কাজ শুরু করে দিয়েছি। যত দ্রুত সম্ভব আমরা প্রতিবেদন দাখিল করব।’
শনিবার (২৪ ডিসেম্বর) সাড়ে ১১ লাখ লিটার তেল নিয়ে চাঁদপুর থেকে চট্টগ্রামের উদ্দেশে ছেড়ে আসে জাহাজ এমভি সাগরনন্দিনী-২। রবিবার ভোরে ভোলা সদরের ধনিয়া ইউনিয়নের তুলাতুলি-সংলগ্ন মেঘনা নদীতে ঘন কুয়াশার কারণে সেটি অন্য এক জাহাজের সঙ্গে ধাক্কা খায়। এতে জাহাজের তলা ফেটে মুহূর্তেই মেঘনায় তেল ছড়িয়ে পড়তে শুরু করে।
মৎস্য ও পরিবেশ বিশেষজ্ঞদের মতে, মেঘনায় জাহাজটি ডুবে যাওয়ার পর ছড়ানো তেল পরিবেশের ক্ষতি যা করার করে ফেলেছে। নদীর তেল ছড়িয়ে পড়বে সাগরে। এ ক্ষতির প্রভাব হয়তো আরও কিছুদিন পর বোঝা যাবে। ইলিশসহ অন্যান্য মাছের উৎপাদনে এটি প্রভাব ফেলতে পারে। প্রভাব ফেলবে নদীর জীববৈচিত্র্যেও। এ ছাড়া সাগরে যাওয়ার পর সেটি আরও বিস্তৃতভাবে ছড়িয়ে পড়বে। এর ফলে নদী ও সাগরের বাস্তুসংস্থানে মারাত্মক নেতিবাচক প্রভাব পড়বে।
মৎস্য গবেষণা ইনস্টিটিউটের মহাপরিচালক ড. ইয়াহিয়া মাহমুদ বলেন, ‘নদীতে ছড়িয়ে পড়া তেল সাগরে গিয়ে পড়বে। এর ফলে সামনের মৌসুমে ইলিশসহ অন্যান্য মাছের প্রজননে প্রভাব পড়বে। একই সঙ্গে নদী ও সাগরের বাস্তুসংস্থানে প্রভাব ফেলবে। তা ছাড়া জেলেদের স্বাস্থ্যেও নেতিবাচক প্রভাব পড়ার তীব্র আশঙ্কা রয়েছে।
তিনি বলেন, ‘এর আগেও বঙ্গোপসাগরে তেলবাহী জাহাজডুবির ঘটনা ঘটেছে। এর ফলে ব্যাপক ক্ষতি হয়েছে জলজ পরিবেশের। সরকারের উচিত জাহাজ কর্তৃপক্ষের বিরুদ্ধে আইন অনুযায়ী ব্যবস্থা নেওয়া। একই সঙ্গে জাহাজডুবির কারণগুলো অনুসন্ধান করে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়া। বহির্বিশ্বেও এ ঘটনাটা প্রচার হবে। এতে দেশের ভাবমূর্তিতে প্রভাব পড়বে।’