মো. শামীম মিয়া, নরসিংদী
প্রকাশ : ২৮ ফেব্রুয়ারি ২০২৬ ০৮:৫২ এএম
আপডেট : ২৮ ফেব্রুয়ারি ২০২৬ ১১:০৮ এএম
ধর্ষণ ও হত্যাকাণ্ডের মূল হোতা নূর মোহাম্মদ ওরফে নূরা। গ্রাফিক্স: প্রতিদিনের বাংলাদেশ
বরিশালের শান্ত গ্রাম ছেড়ে মা-বাবার হাত ধরে নরসিংদী এসেছিল ১৫ বছরের কিশোরী আমেনা। চোখে স্বপ্ন। নতুন শহর, নতুন কাজ, পরিবারের পাশে দাঁড়ানোর ইচ্ছা, নিজেদের একটি ঘর, এখন সব স্বপ্নের ঊর্ধ্বে আমেনা। এখন কিশোরী আমেনা কেবলই ছবি।
বরিশাল থেকে এসে তারা উঠেছিল নরসিংদীর মাধবদী থানার বিলপাড় এলাকার একটি ভাড়া বাসায়। বাবা-মা দুজনেই কারখানায় কাজ শুরু করেন। অল্প কিছুদিন হয়েছে আমেনাও একটি টেক্সটাইল মিলে কাজ শুরু করে।
কারখানার ব্যস্ততার মাঝেই নূর মোহাম্মদ ওরফে নূরা নামে এক যুবকের সঙ্গে পরিচয়। আমেনার মনে বিশ্বাস জন্মায়, ভবিষ্যতের স্বপ্ন বোনা শুরু হয়। কিন্তু সেই বিশ্বাসই কাল হলো। জীবনে বিশ্বাসের মূল্য চুকাতে হলো আমেনাকে।
বিশ্বাসভঙ্গের সেই কালরাত ১০ ফ্রেব্রুয়ারি। প্রতারক প্রেমিক নূরার পাকে সাড়া দিয়ে মাধবদীর মহিষাসুরা ইউনিয়নের কোতোয়ালিরচর হোসেন বাজারে চৈতি টেক্সটাইল মিলের পেছনে নির্জন স্থানে যায় আমেনা। এরপর যা হয় এককথায় তা লোমহর্ষক। একদল হায়েনা সংঘবদ্ধভাবে ধর্ষণ করে আমেনাকে। এখানেই শেষ নয়। ধর্ষণের বিষয়টি কাউকে না জানানোর জন্য বিভিন্ন ধরনের হুমকি দেয় নরপশুরা। প্রথম অবস্থায় না জানালেও মেয়েটি মায়ের কাছে ঘটনাটি স্বীকার করে।
ঘটনা ধামাচাপা দিতে চাপ প্রয়োগ করা হয়। আমেনার পরিবারকে এলাকা ছেড়ে চলে যাওয়ারও হুমকি দেওয়া হয়। পরবর্তীতে বিষয়টি থানা পুলিশকে জানানোর সিদ্ধান্ত নিলে আসামিরা এলাকার ইউনিয়ন বিএনপির সহসভাপতি ও সাবেক মেম্বার আহম্মদ আলী দেওয়ানকে জানায়। বিষয়টি জানাজানি হলে মহিষাশুরা ইউনিয়নের ৯নং ওয়ার্ডের সাবেক মেম্বার আহম্মদ আলী দেওয়ান বিচার করার দায়িত্ব নেন। পরিবারটি স্থানীয় না হওয়ায় উল্টো দোষ দেওয়া হয় মেয়েটিকে। ধর্ষকদের কাছ থেকে অর্থের বিনিময়ে বিচারকার্য প্রভাবিত করার অভিযোগ ওঠে মেম্বারের বিরুদ্ধে। সেই সঙ্গে ভিকটিমের পরিবারকে এলাকা ছাড়ার হুমকি দেওয়া হয়। তারা এলাকা না ছেড়ে মেয়ের নিরাপত্তার কথা চিন্তা করে রাতে বাবা আশরাফ হোসেন তার কাজ শেষে মেয়েকে নিয়ে খালার বাড়িতে রেখে আসতে যাচ্ছিলেন। পথিমধ্যে কোতোয়ালীরচর বরইতলার তিন রাস্তার মোড় এলাকায় পৌঁছলে আসামিরা তাদের পথরোধ করে নূর মোহাম্মদ নূরার নেতৃত্বে আরও পাঁচজন মিলে বাবার কাছ থেকে আমেনাকে জোরপূর্বক তুলে নিয়ে যায়।
পরদিন বৃহস্পতিবার সকালে স্থানীয়রা মহিষাশুরা ইউনিয়নের কোতোয়ালীরচর দড়িকান্দি এলাকার একটি সরিষা ক্ষেত থেকে গলায় ওড়না পেঁচানো অবস্থায় মৃত মেয়েটিকে দেখে স্থানীয়রা থানায় খবর দেন। পুলিশ ঘটনাস্থলে এসে মরদেহটি উদ্ধার করে। লাশ ময়নাতদন্তের জন্য নরসিংদী সদর হাসপাতালের মর্গে প্রেরণ করে।
এদিকে ধর্ষণের ঘটনা ধামাচাপা দিতে কিশোরীকে পরিকল্পিত হত্যার ঘটনায় র্যাব ও পুলিশের যৌথ অভিযানে ধর্ষণ ও হত্যাকাণ্ডের মূল হোতা নূর মোহাম্মদ ওরফে নূরাসহ ছয়জনকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে। অন্য গ্রেপ্তারা হলেন, মহিষাশুরা ইউনিয়ন বিএনপির সহসভাপতি ও সাবেক মেম্বার আহম্মদ আলী দেওয়ান, তার ছেলে ইমরান দেওয়ান, ধর্ষক নূরার চাচাত ভাই বিলপাড়ের আজগর আলীর ছেলে মোহাম্মদ আইয়ুব এবং কোতোয়ালীরচরের মৃত শাহাবুদ্দিনের ছেলে এবায়দুল্লাহ, হোসেন বাজার এলাকার গাফফার।
এর আগে নূর মোহাম্মদ ওরফে নূরাকে প্রধান আসামি করে নয়জনের নাম উল্লেখ করে নিহতের মা ফাহিমা বেগম বাদী হয়ে মাধবদী থানায় মামলা দায়ের করেছেন।
শুক্রবার সকালে ঘটনাস্থল পরিদর্শন করেন ঢাকা রেঞ্জের ডিআইজি রেজাউল করিম মল্লিক এবং বিএনপির যুগ্ম মহাসচিব ও নরসিংদী-১ সদর আসনের সংসদ সদস্য খায়রুল কবির খোকন। পরিদর্শন শেষে আসামিদের দ্রুত গ্রেপ্তার করে আইনের আওতায় আনার নির্দেশ দিয়েছেন ঢাকা রেঞ্জের ডিআইজি ও স্থানীয় সংসদ সদস্য।
ঘটনাস্থল পরিদর্শন শেষে মাধবদী থানায় প্রেস ব্রিফিংয়ে ঢাকা রেঞ্জের ডিআইজি রেজাউল করিম মল্লিক জানান, এ ঘটনায় নয়জনের নাম উল্লেখ করে নিহতের মা ফাহিমা বেগম বাদী হয়ে মাধবদী থানায় মামলা দায়ের করেছেন। ইতোমধ্যেই ছয়জনকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে। বাকিদের গ্রেপ্তারেও অভিযান অব্যাহত রয়েছে।
ঘটনা নিয়ে বিএনপির যুগ্ম মহাসচিব ও নরসিংদী-১ সদর আসনের সংসদ সদস্য খায়রুল কবির খোকন বলেন, কিশোরীকে নৃশংস ও নিষ্ঠুরভাবে ধর্ষণের পর হত্যার ঘটনাটি সামাজিক মাধ্যমে জানার পরপরই নরসিংদীর পুলিশ সুপারসহ সংশ্লিষ্টদের সঙ্গে যোগাযোগ করে হত্যায় জড়িতদের দ্রুত গ্রেপ্তারের নির্দেশ দিয়েছি। যে ঘটনাটি ঘটেছে, সেটা অত্যন্ত নিন্দনীয়। অপরাধীদের দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি হওয়া উচিত।
তিনি আরও বলেন, আমাদের সবাইকে সচেতন হতে হবে। যারা সমাজে মাদক, সন্ত্রাস, চাঁদাবাজ এবং অবৈধ কর্মকাণ্ডে সম্পৃক্ত হবে, অবশ্যই তাদেরকে আইনের আওতায় আনতে হবে। কে কোন দল করে সেটা দেখার বিষয় না। অপরাধীদের কোনো দল নেই, তাদেরকে অপরাধী হিসেবেই চিহ্নিত করে ব্যবস্থা নিতে হবে।
এদিকে নিহত আমেনার লাশের ময়নাতদন্ত নরসিংদী সদর হাসপাতাল মর্গে সম্পন্ন হয়েছে। নরসিংদী সদর হাসপাতালের আবাসিক মেডিকেল অফিসার ডা. ফরিদা গুলশানারা কবিরের নেতৃত্বে চার সদস্যের মেডিকেল বোর্ড ময়নাতদন্ত সম্পন্ন করে।
এ ব্যাপারে নিহত মেয়ের বাবা মো. আশরাফ জানান, নূরার নেতৃত্বে ৫-৬ জন লোক আমার সামনে থেকে মেয়েকে জোরপূর্বক তুলে নিয়ে যায়। পরে আমরা অনেক খোঁজাখুঁজি করে রাতে আর পাইনি। সকালে আমরা জানতে পারি আমেনার লাশ পড়ে আছে। আমার সন্তানকে যারা হত্যা করেছে তাদের দৃষ্টান্তমূলক শাস্তির দাবি করছি।
নরসিংদী পুলিশ সুপার মো. আবদুল্লাহ আল-ফারুক জানান, এই চাঞ্চল্যকর হত্যার ঘটনায় নিহতের মা বাদী হয়ে ৯ জনের নাম উল্লেখ করে বৃহস্পতিবার রাতে মামলা করেছেন। এখন পর্যন্ত ছয়জনকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে এবং বাকিদের গ্রেপ্তারে অভিযান অব্যাহত রয়েছে।