খোকন বিকাশ ত্রিপুরা জ্যাক, খাগড়াছড়ি
প্রকাশ : ২০ ফেব্রুয়ারি ২০২৬ ১৬:৪০ পিএম
পাহাড়ি শিশুদের হাতে বই থাকলেও নেই সে ভাষায় পড়ানোর শিক্ষক। ছবি: প্রতিদিনের বাংলাদেশ
মায়ের ভাষায় প্রথম অক্ষর শেখার আনন্দ—এই স্বপ্ন নিয়েই ২০১৭ সালে পার্বত্য চট্টগ্রামে শুরু হয়েছিল মাতৃভাষাভিত্তিক শিক্ষার নতুন অধ্যায়। চাকমা, মারমা ও ত্রিপুরা জনগোষ্ঠীর শিশুদের জন্য জাতীয় শিক্ষাক্রম ও পাঠ্যপুস্তক বোর্ড বিশেষ বই ছাপায়। সরকারের উদ্যোগে প্রাথমিক বিদ্যালয়ে সপ্তাহে দুই দিন বুধবার ও বৃহস্পতিবার স্ব স্ব মাতৃভাষায় পাঠদানও চালু হয়।
কিন্তু নয় বছর পর বাস্তব চিত্র ভিন্ন। বই পৌঁছেছে শিক্ষার্থীদের হাতে, কিন্তু পৌঁছায়নি পর্যাপ্ত প্রশিক্ষিত শিক্ষক। নেই আলাদা শ্রেণিকক্ষ, গড়ে ওঠেনি মাস্টার ট্রেইনারের কাঠামো। ফলে ব্যাহত হচ্ছে পাঠদান, কমছে শিক্ষার্থীদের আগ্রহ।
৩২ হাজার বই, কিন্তু শেখাবে কে?
খাগড়াছড়ি জেলার ৯টি উপজেলায় রয়েছে ৫৯৩টি সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়। ত্রিপুরা, চাকমা ও মারমা শিক্ষার্থীদের চাহিদা অনুযায়ী এসব বিদ্যালয়ে মোট ৩২ হাজার মাতৃভাষার বই বিতরণ করা হয়েছে।
প্রাক-প্রাথমিক শ্রেণিতে দেওয়া হয়েছে ‘আমার বই’ ও ‘এসো লিখতে শিখি’। প্রথম ও দ্বিতীয় শ্রেণিতে মাতৃভাষায় রচিত বাংলা, গণিত ও ইংরেজি বই এবং তৃতীয় শ্রেণিতে রয়েছে মাতৃভাষায় রচিত বাংলা বই।
তবে বই প্রণয়নকারীরা মাতৃভাষায় দক্ষ হলেও অধিকাংশ বিদ্যালয়ের শিক্ষকরা সংশ্লিষ্ট ভাষায় প্রশিক্ষিত নন। ফলে বই থাকলেও কার্যকর পাঠদান সম্ভব হচ্ছে না।
শ্রেণিকক্ষ সংকটও বড় বাধা
খাগড়াছড়ি মডেল সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক দিলু আরা বেগম বলেন, “আমাদের স্কুলে ত্রিপুরা, চাকমা ও মারমাসহ বিভিন্ন সম্প্রদায়ের শিক্ষার্থী রয়েছে। মাতৃভাষায় পাঠদান একটি ভালো উদ্যোগ। কিন্তু আলাদা কক্ষ ও প্রশিক্ষিত শিক্ষক না থাকায় আমরা সমস্যায় পড়ছি। তিন সম্প্রদায়ের জন্য পৃথক শিক্ষক ও শ্রেণিকক্ষ প্রয়োজন”।
অনেক বিদ্যালয়ে একই কক্ষে একাধিক শ্রেণির পাঠদান চলছে। সেখানে আবার ভাষাভিত্তিক পৃথক ক্লাস নেওয়া প্রায় অসম্ভব হয়ে পড়ছে।
পরীক্ষায় মূল্যায়ন না থাকায় কমছে আগ্রহ
শিক্ষক সংকটের পাশাপাশি আরেকটি বড় সমস্যা হলো মাতৃভাষা বিষয়ে পরীক্ষায় মূল্যায়নের সুযোগ নেই। ফলে শিক্ষার্থীরা বিষয়টিকে গুরুত্ব দিচ্ছে না।
অভিভাবকরাও মনে করেন, পরীক্ষায় গুরুত্ব না থাকলে শিশুরা স্বাভাবিকভাবেই গুরুত্ব কম দেয়। এতে মাতৃভাষাভিত্তিক শিক্ষার মূল লক্ষ্য ব্যাহত হচ্ছে।
শিক্ষা বিভাগের স্বীকারোক্তি
খাগড়াছড়ি জেলা সহকারী প্রাথমিক শিক্ষা কর্মকর্তা মো. আরিফুল ইসলাম বলেন, “শিক্ষার্থীদের চাহিদা অনুযায়ী বই দেওয়া হয়েছে। কিন্তু শিক্ষকদের পর্যাপ্ত প্রশিক্ষণ নেই। মাস্টার ট্রেইনার তৈরি করে অন্য শিক্ষকদের প্রশিক্ষণ দেওয়ার বিষয়টি এখনো বাস্তবায়ন হয়নি। বিষয়টি জেলা পরিষদকে জানানো হয়েছে, কারণ প্রাথমিক শিক্ষা জেলা পরিষদের হস্তান্তরিত বিভাগ”।
জেলা পরিষদের আশ্বাস
খাগড়াছড়ি পার্বত্য জেলা পরিষদের চেয়ারম্যান শেফালিকা ত্রিপুরা বলেন, “মাতৃভাষা শিক্ষা আমাদের অগ্রাধিকারের বিষয়। যেখানে শিক্ষক নেই, সেখানে নিয়োগের চেষ্টা চলছে। প্রশিক্ষণ প্রকল্পও হাতে নেওয়া হয়েছে। দ্রুত সমস্যার সমাধান হবে বলে আমরা আশাবাদী”।
দীর্ঘদিনের দাবি, অপূর্ণ বাস্তবতা
পার্বত্য চট্টগ্রামে চাকমা, মারমা, ত্রিপুরাসহ বহু ক্ষুদ্র জাতিসত্তার বসবাস। এর মধ্যে আটটি জাতিগোষ্ঠীর নিজস্ব বর্ণমালা রয়েছে। দীর্ঘদিনের দাবির পর ২০১৭ সালে মাতৃভাষায় শিক্ষার সুযোগ তৈরি হয়। এই উদ্যোগের লক্ষ্য ছিল ক্ষুদ্র নৃ-গোষ্ঠীর শিক্ষার্থীদের ঝরে পড়া রোধ করা এবং তাদের সাংস্কৃতিক পরিচয় সংরক্ষণ। কিন্তু শিক্ষক সংকট ও কাঠামোগত দুর্বলতায় সেই উদ্যোগ বাস্তবায়নের পথে বাধাগ্রস্ত হচ্ছে।
প্রয়োজন সমন্বিত উদ্যোগ
বিশেষজ্ঞদের মতে, জরুরি ভিত্তিতে মাতৃভাষায় প্রশিক্ষিত শিক্ষক নিয়োগ, মাস্টার ট্রেইনার তৈরি, পর্যায়ক্রমিক প্রশিক্ষণ, পৃথক শ্রেণিকক্ষ নিশ্চিতকরণ, পরীক্ষায় মূল্যায়ন ব্যবস্থা চালু এবং স্থানীয় ভাষাবিদদের সম্পৃক্তকরণ—এসব পদক্ষেপ বাস্তবায়ন করা গেলে মাতৃভাষা শিক্ষা কার্যকর হবে।
মায়ের ভাষা শুধু শিক্ষার মাধ্যম নয়—এটি একটি জাতিসত্তার আত্মপরিচয়, সংস্কৃতি ও অস্তিত্বের প্রতীক। খাগড়াছড়ির পাহাড়ি শিশুদের হাতে বই পৌঁছেছে, এখন প্রয়োজন সেই ভাষা শেখানোর মতো দক্ষ শিক্ষক।
উদ্যোগটি সঠিকভাবে বাস্তবায়িত না হলে একটি প্রজন্মের ভাষাগত আত্মপরিচয়ের স্বপ্ন অপূর্ণই থেকে যেতে পারে।