ইসমাইল মাহমুদ, মৌলভীবাজার
প্রকাশ : ১৬ ফেব্রুয়ারি ২০২৬ ১১:৩৪ এএম
আপডেট : ১৬ ফেব্রুয়ারি ২০২৬ ১১:৩৫ এএম
বার্ড পার্ক অ্যান্ড ইকো ভিলেজে পাখিদের সাথে ছবি তুলতে ব্যস্ত এক শিশু। ছবি: প্রতিদিনের বাংলাদেশ
রয়েছে প্রায় ৭০ প্রজাতির বিদেশি পাখি। রয়েছে কিছু প্রাণীও। ইচ্ছে করলেই পাখিদের ছুঁয়ে দেখা যায় এবং কাঁধে নিয়ে ঘুরা যায় পার্কের নির্দিষ্ট এলাকা। পাখিময় এ রাজ্যটি দেখতে প্রতিদিনই ভিড় করছেন শত-শত দেশি-বিদেশি পর্যটক, ভ্রমণ ও সৌন্দর্যপিপাসু মানুষরা।
বলছি বাংলাদেশের প্রথম বার্ড পার্কের কথা। শহুরে জনপদ থেকে দূরে সুবিশাল হাওরের পাদদেশে ছয় একর জায়গায় নানা রঙের, নানা বর্ণের পাখিদের নিয়ে গড়ে উঠেছে এই পাখি পার্ক।
পর্যটন নগরী ও চায়ের রাজধানী হিসেবে খ্যাত মৌলভীবাজার জেলার সদর উপজেলার ১১ নম্বর মোস্তফাপুর ইউনিয়নের নিভৃত আজমেরু গ্রামে অবস্থান এই ‘বার্ড পার্ক অ্যান্ড ইকো ভিলেজ’এর।
মৌলভীবাজার সদর উপজেলার নিভৃত ও অবহেলিত হাওরের কাছাকাছি আজমেরু গ্রামটি আজ থেকে মাত্র এক দশক আগেও ছিল অনেকটা জনমানবহীন এক জনপদ। কিন্তু বর্তমানে এই গ্রামটিই প্রাণপ্রকৃতির রঙিন সৌন্দর্যের আভায় আচ্ছাদিত। প্রতিদিনই শত-শত মানুষের আনাগোনা ছায়াঘেরা গ্রামটিতে। এমনিতেই দেশিয় নানা প্রজাতির পাখি আর মানুষের যুগ-যুগ ধরে সখ্য নিভৃত এ গ্রামের বাসিন্দাদের। হাওরপাড়ের গ্রামটিতে খাল-বিলে, রাস্তার পাশে, ফসলের জমিতে, পুকুরে প্রতিদিন বিকালবেলা দেশিয় ও পরিযায়ী পাখির মেলা বসে। পাখির কলরবে ১২ মাসই মুখর থাকে গ্রামটি।
ওই গ্রামেই মৌলভীবাজারের কিছু স্বপ্নবান তরুণ ও প্রবাসী উদ্যোক্তা গড়ে তুলেছেন পরিবেশ ও প্রকৃতিবান্ধব মনোমুগ্ধকর পার্ক ‘বার্ড পার্ক অ্যান্ড ইকো ভিলেজ’।
মৌলভীবাজার শহর থেকে শ্রীমঙ্গল উপজেলামুখী সড়কে প্রায় পাঁচ কিলোমিটার অথবা শ্রীমঙ্গল থেকে মৌলভীবাজারমুখী সড়কে ১৫ কিলোমিটার গেলেই সদর উপজেলার মোকামবাজার। বাজার সংলগ্ন মসজিদের পাশ দিয়ে পশ্চিম দিকে অফিসবাজারগামী ছোট পীচঢালা আঁকাবাঁকা সড়কে প্রায় দেড় কিলোমিটার গেলেই আজমেরু গ্রামটির অবস্থান। এ গ্রামেই চারদিকে সবুজ ফসলের মাঠ, ধানের জমির মাঝখানে মনোমুগ্ধকর ‘বার্ড পার্ক অ্যান্ড ইকো ভিলেজ’। গ্রাম্য সড়ক লাগোয়া এ পার্কটির সামনের অংশে রয়েছে পাশ্চাত্য নকশায় অত্যন্ত আকর্ষনীয় এক মসজিদ। এরপরেই পার্কটির অবস্থান।
মূল গেট দিয়েপার্কটিতে প্রবেশ করলে প্রথমেই অভ্যর্থনা ও রেস্টুরেন্ট ভবন। এ ভবনের পেছনে পাখি ও প্রাণীদের রাজ্য। প্রায় সাত কোটি টাকা বিনিয়োগে গড়ে তোলা পরিকল্পিত, সাজানো-গোছানো এ পার্কটিতে রয়েছে হিজল, জারুল, সাদা ও হলুদ রঙের শিমুল, আমসহ নানা জাতের দেশিয় ফল ও ফুলের গাছ। স্থানে স্থানে রয়েছে বক, ধনেশ বা ইগল প্রভৃতি প্রাণীর দৃষ্টিনন্দন পাথুরে ভাস্কর্য।
এছাড়া রয়েছে রঙিন বাঁশের গোলকধাঁধা, ছোট ওয়াচ ভবন, ছবি কর্ণার, কৃত্রিমভাবে নির্মিত সুবিশাল ঝর্ণা, ঝর্ণার পাশেই রঙিন মাছের পুকুর, বার্ড লার্নিং জোন, ইল্যুশন মিউজিয়াম, ঈগল পয়েন্ট, টেম পাখির এভিয়ারি, বিশাল লেক, লেকে নৌকা চালানোর সুবিধা, হার্ট সেইফ, মাছ ধরার সুবিধা, কাঠের তৈরি ঝুলন্ত সেতু, কিডস জোন, বড়দের খেলার স্থান, ছোট পক্ষিশালা, স্যুভেনিয়ার শপ, কনফারেন্স হল, মাঠ, রেস্তোরাসহ নানা কিছু।
দেশের প্রথম বার্ড পার্কটিতে রয়েছে অত্যন্ত দামী পাখি গোল্ড ম্যাকাও, ব্ল্যাক সোয়ান (কালো রাজহাঁস), সালফার ক্রেস্টেড কাকাতুয়া, গ্রে প্যারট (ধূসর টিয়া), পিজেন্টসহ অসংখ্য প্রজাতির পাখি।
এছাড়া যেসব পাখি ও বৈধভাবে লালন-পালনের প্রাণী রয়েছে তার মধ্যে উল্লেখযোগ্য হলো- মেক্সিকোর অ্যামাজান তোঁতা, আফ্রিকার উটপাখি, লাভবার্ড বা প্রেমপাখি, ব্রাজিলের জেন্ডে কনিউর, দক্ষিণ আমেরিকার গিনিপিগ, পাইনঅ্যাপল কনিউর, লালপেট কনিউর, সান চিক কনিউর, সবুজ-গাল কনিউর, লাল কনিউর, খরগোশ, ফ্রান্সের ফেঞ্চ মন্ডেইন কবুতর, স্যাটিনেট কবুতর, অলঙ্কারিক কবুতর, উত্তর-পূর্ব দক্ষিণ আমেরিকার সান কনিউর বা সোনালী কনিউর, অস্ট্রেলিয়ার ইমু পাখি, ককাটিয়েল, হীরক ঘুঘু বা ডায়মন্ড ঘুঘু, অস্ট্রেলিয়ান রিংনেক ঘুঘু, অস্ট্রেলিয়া ও ইন্দোনেশিয়ার রেইনবো লরিকেট বা রংধনু তোতা, চীনের রেশমি মুরগী।
আরও রয়েছে, উজবেকিস্তানের বুখারা ট্রাম্পেটারম কবুতর, ভারতীয় উপমহাদেশের হলুদ টিয়া, বোম্বাই কবুতর, মুখি কবুতর, জ্যাকোবিন কবুতর, ভারত ও আফ্রিকার সাদা টিয়া, ভারত ও দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার নীল টিয়া, নেদারল্যান্ডের ফুলানো কবুতর, পাউটার কবুতর, যুক্তরাষ্ট্রের শোকিং কবুতর, প্রদর্শনী কবুতর, ইংল্যান্ডের ইংলিশ ফ্যানটেল কবুতর, আমেরিকান ঝুঁটি হাঁস, দেশিয় রাজহাঁস, চীনা হাঁস, টার্কি লালন-পালনের বৈধ পারমিট নিয়ে বাংলাদেশি ময়ুর, চিত্রা হরিণ প্রভৃতি।
‘বার্ড পার্ক অ্যান্ড ইকো ভিলেজ’-এর ব্যবস্থাপনা পরিচালক জাহেদ আহমেদ চৌধুরী বলেন, “আমার অত্যন্ত পছন্দের একটি কাজ হলো আমি দেশ-বিদেশে ট্রাভেলিং করা। আমি মালয়েশিয়া, থাইল্যান্ড, সৌদি আরবসহ কয়েকটি দেশে বার্ড পার্ক দেখেছিলাম। তখন আমি চিন্তা করলাম তারা যদি করতে পারে, তাহলে আমরা কেন পারব না? তখন আমি শখের বসে নানা জাতের কবুতর এবং ককাটিয়েল পাখি লালন-পালন করতাম। এর থেকেই আসলে আমার বার্ড পার্ক করার স্বপ্ন শুরু।”
তিনি বলেন, “এই স্বপ্ন থেকেই আজমেরু গ্রামে এ পার্ক নির্মাণ করি। আমাদের এ বার্ড পার্কে রয়েছে খুবই দামী প্রজাতির কিছু পাখিসহ প্রায় ৭০-এর অধিক প্রজাতির বিদেশি পাখি। কোনও দেশি পাখি আমরা লালন-পালন করি না। তবে প্রতিদিন বিকালে অসংখ্য দেশিয় ও পরিযায়ী পাখি পার্কের পুকুর ও লেকে দলবেধে আসে। জেলার পর্যটনকে সমৃদ্ধ করা এবং পরিবেশ ও প্রাণপ্রকৃতির প্রতি মানুষের ভালোবাসা তৈরি করা হলো আমাদের মূল উদ্দেশ্য। আমরা চাই মানুষ পাখি ও প্রাণীকে ভালোবাসুক, সংরক্ষণ করুক।”
তিনি আরও বলেন, “এই ব্যতিক্রমী বার্ড পার্কে প্রবেশ ফি জনপ্রতি ৩৫০ টাকা। প্রতিদিন সকাল ১০টা থেকে বিকাল ৫টা পর্যন্ত এটি দর্শনার্থীদের জন্য উন্মুক্ত থাকে। শিশুরা কিড জোনে খেলাধুলা করতে পারে। মূল ভবনের দ্বিতীয় তলায় রেস্তোরায় স্বাস্থ্যসম্মত খাবারের ব্যবস্থা রয়েছে। এখানে এসে পাখিদের সাথে পরিচিত হওয়ার জন্য আমি সবাইকে আমন্ত্রণ জানাচ্ছি।”