নোমান মুন্না জয়
প্রকাশ : ২৯ জানুয়ারি ২০২৬ ১৫:১৯ পিএম
আপডেট : ২৯ জানুয়ারি ২০২৬ ১৫:২৩ পিএম
মালখানা অফিসার এসআই সায়েদুল। ছবি: সংগৃহীত
শরিয়তপুরে ব্রিটিশ আমেরিকান টোবাকো (বিএটি) এর একটি ডিলার পয়েন্টে সংঘটিত ডাকাতির ঘটনায় উদ্ধার করা ৫২টি মোবাইলের খোঁজ মেলেনি এক বছরেও। পুলিশের মালখানায় জমা দেওয়ার পর এসব আলামত রহস্যজনকভাবে উধাও হয়ে যাওয়ায় গুরুতর অনিয়মের অভিযোগ উঠেছে। বিষয়টি নিয়ে পুলিশের দায়িত্বপ্রাপ্ত কর্মকর্তাদের বক্তব্যে দেখা দিয়েছে চরম অসঙ্গতি, যা তদন্তের স্বচ্ছতা নিয়েও প্রশ্ন তুলছে।
২০২৫ সালের ২৫ জানুয়ারি শরিয়তপুর জেলার পালং এলাকায় বিএটি ডিলার পয়েন্টে ডাকাতির ঘটনা ঘটে। ঘটনার পরপরই সিসিটিভি ফুটেজ বিশ্লেষণ, মোবাইল লোকেশন ট্র্যাকিং ও তথ্যপ্রযুক্তির সহায়তায় ডাকাত দলের তিন সহযোগীকে গ্রেপ্তার করে পুলিশ। অভিযানে তাদের কাছ থেকে উদ্ধার করা হয় প্রায় ১৮ লাখ ৫০ হাজার টাকা, একটি পিকআপ ভ্যান, ডাকাতিতে ব্যবহৃত বিভিন্ন সরঞ্জাম এবং ৫২টি নামি-দামি মোবাইল- যার বেশিরভাগই স্মার্টফোন।
মালখানায় জমা, এরপর উধাও
মামলার তৎকালীন তদন্ত কর্মকর্তা পালং মডেল থানার ওসি (তদন্ত) মো. মাসুদুর রহমানের নেতৃত্বে পরিচালিত অভিযানে গ্রেপ্তার হওয়া এক ডাকাতের বাসা থেকে মোবাইলগুলো উদ্ধার করা হয়। উদ্ধার শেষে পালং মডেল থানার তৎকালীন ওসি হেলাল উদ্দিন এবং নড়িয়া সার্কেলের অতিরিক্ত পুলিশ সুপার ড. আশিক মাহমুদের উপস্থিতিতে মোবাইলগুলো থানার মালখানা অফিসার সাব-ইন্সপেক্টর সায়েদুল ইসলামের কাছে জমা দেওয়া হয়।
পুলিশি বিধিমালা অনুযায়ী, উদ্ধারকৃত আলামত মালখানায় গ্রহণের পর তা রেজিস্টারভুক্ত, সিলগালা ও আদালতের নির্দেশ অনুযায়ী সংরক্ষণ ও হস্তান্তরের বাধ্যবাধকতা রয়েছে। তবে এই ঘটনায় সেই বিধি যথাযথভাবে অনুসরণ করা হয়েছে কি না- তা নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে।
সংখ্যার গরমিল, বক্তব্যে বিভ্রান্তি
দৈনিক প্রতিদিনের বাংলাদেশ–এর অনুসন্ধানে জানা গেছে, উদ্ধার করা ৫২টি মোবাইলের মধ্যে অন্তত ৩০টির বেশি নামি-দামি স্মার্টফোন আত্মসাৎ করা হয়েছে বলে অভিযোগ রয়েছে।
এ বিষয়ে জানতে চাইলে তৎকালীন ওসি (তদন্ত) মো. মাসুদুর রহমান বলেন, “আমি নিজ হাতে ৫২টি মোবাইল মালখানা অফিসারের কাছে জমা দিয়েছি। এখানে কোনও সন্দেহের সুযোগ নেই।” সাবেক ওসি হেলাল উদ্দিনও মোবাইল উদ্ধার ও মালখানায় জমা দেওয়ার বিষয়টি নিশ্চিত করেছেন।
তবে মালখানা অফিসার সাব-ইন্সপেক্টর সায়েদুল ইসলামের বক্তব্যে রয়েছে স্পষ্ট অসঙ্গতি। প্রথমে তিনি মোবাইল উদ্ধারের বিষয়টি অস্বীকার করেন। পরে বক্তব্য পরিবর্তন করে বলেন, ৪৫ থেকে ৪৮টি মোবাইল উদ্ধার হয়েছিল। অন্যদিকে মামলার পরবর্তী তদন্ত কর্মকর্তা সাব-ইন্সপেক্টর জব্বার হোসেন জানান, তিনি মালখানা থেকে মাত্র ১০ থেকে ১৫টি মোবাইল দেওয়ার প্রস্তাব পান, যা অন্যান্য কর্মকর্তাদের বক্তব্যের সঙ্গে সাংঘর্ষিক।
যুক্তি মানছেন না বিশেষজ্ঞরা
মোবাইল ফোনগুলোর বর্তমান অবস্থান জানতে চাইলে মালখানা অফিসার দাবি করেন, “মোবাইলগুলো এখনও মালখানায় আছে। মালিকানা নিশ্চিত না হওয়ায় এবং বেশিরভাগ নষ্ট থাকায় হস্তান্তর করা হয়নি।”
তবে আইন ও প্রযুক্তি বিশেষজ্ঞরা এই যুক্তিকে অগ্রহণযোগ্য বলে মনে করছেন। তাদের মতে, প্রতিটি মোবাইলের স্বতন্ত্র আইএমইআই নম্বর রয়েছে। বাংলাদেশ টেলিযোগাযোগ নিয়ন্ত্রণ কমিশন (বিটিআরসি) ও সংশ্লিষ্ট মোবাইল অপারেটরদের সহায়তায় খুব সহজেই প্রকৃত মালিক শনাক্ত করা সম্ভব।
অথচ এক বছরেও মালিক শনাক্ত বা মোবাইল হস্তান্তরের কোনও কার্যকর উদ্যোগ নেওয়া হয়নি। সাব-ইন্সপেক্টর জব্বার হোসেন জানান, তিনি মোবাইলগুলো যাচাই করে মালিকদের কাছে হস্তান্তরের উদ্যোগ নিলে মালখানা অফিসার গড়িমসি করেন। পরে মাত্র ১০–১৫টি মোবাইল দেওয়ার প্রস্তাব দেওয়া হয়। তিনি আরও বলেন, মোবাইলগুলো মামলার জব্দ তালিকায় অন্তর্ভুক্ত না থাকায় তিনি সেগুলো গ্রহণ করেননি। এতে প্রশ্ন উঠেছে- যদি মোবাইলগুলো জব্দ তালিকাভুক্ত না হয়ে থাকে, তবে সেগুলো মালখানায় গেল কীভাবে, আর পরে গেলই বা কোথায়?
ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষের নীরবতা
এ ঘটনায় দায়িত্বপ্রাপ্ত ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তাদের ভূমিকা নিয়েও প্রশ্ন উঠেছে। নড়িয়া সার্কেলের অতিরিক্ত পুলিশ সুপার ড. আশিক মাহমুদের সঙ্গে একাধিকবার যোগাযোগের চেষ্টা করা হলেও তার কোনো বক্তব্য পাওয়া যায়নি।
পুলিশি মালখানায় যদি উদ্ধারকৃত আলামতই নিরাপদ না থাকে, তবে সাধারণ মানুষ আইন ও বিচার ব্যবস্থার ওপর কতটা আস্থা রাখবে- এই প্রশ্ন এখন জনমনে ঘুরপাক খাচ্ছে।